behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

বন্ধুদের কী উত্তর দেব, তাই ঠিক করি যুদ্ধে যাবই

চৌধুরী আকবর হোসেন১৯:২৮, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৫

মুক্তিযোদ্ধা মোকাব্বের

১৯৭১ সালে নবম শ্রেণির ছাত্র মোকাব্বের হোসেন। নিজের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ হলেও লেখা পড়ার জন্য থাকতে টাঙ্গাইলে। সেখানে এক বাড়িতে গৃহশিক্ষক হিসেবে থেকে পড়াশোনা করতেন আনুহলা উচ্চ বিদ্যালয়ে।

 

যুদ্ধে যাওয়ার গল্পটা বলুন

টাঙ্গাইলে স্কুলে পড়তাম, খেলাধূলা করতাম। সময় পেলেই রেডিওতে খবর শুনতাম। পরিষ্কার হয়েছিলাম আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে যাচ্ছি। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেছি। মার্চের শেষের দিকে একদিন বিকেলে স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলছিলাম। একদল লোক ছুটে আসছিল স্কুলের দিকে। তাদের কাছ থেকে জানলাম দেশে যুদ্ধ লেগে গেছে। দূর থেকে গুলির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। সেদিন রাতেই বিভিন্ন এলাকার মানুষ আশ্রয় নিতে স্কুলের মাঠে জড়ো হয়। আমরা ছাত্ররা সবাই স্কুলের রুম খুলে তাদের থাকার ব্যবস্থা করি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে যা পেয়েছি তা জোগাড় করে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করি। ভাত না পেয়ে ভাতের মাড় জোগাড় করেছি। এরপর পরদিন টাঙ্গাইল থেকে সিরাজগঞ্জে নিজের বাড়িতে চলে আসি।

বাবা বললেন, কোথাও যাওয়া লাগবে না, বাড়িতে থাকো, লেখাপড়া করো। আমি চিন্তা করলাম, দেশ তো একদিন স্বাধীন হবেই। বন্ধুরা ফিরে এলে তাদের কী উত্তর দেব। মাকে বললাম যুদ্ধে যাব। মা বললেন, তোমার ইচ্ছে, আমি বাধা দেব না।

এক রাতে স্বপ্ন দেখি হাজার হাজার লোক নিশান হাতে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে যাচ্ছে।  যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, তারা সবাই স্লোগান দিচ্ছে এদেশ স্বাধীন হবেই। আঁতকে উঠি, আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি কি স্বপ্ন দেখলাম নাকি আসলে বাড়ি পাশে কেউ স্লোগান দিচ্ছে। পরে দেখি না, আমি স্বপ্নই দেখছি। পরদিন বাড়ি থেকে আবার স্কুল গিয়ে দেখি সহপাঠী কয়েকজন যুদ্ধে গেছে। মনে মনে ভাবি, বন্ধুরা যুদ্ধ থেকে ফিরে আমার কাছে জানতে চাইবে কেন আমি যুদ্ধে গেলাম না, তাদের কী উত্তর দেব। তখন ঠিক করলাম যুদ্ধে যাবই। এরপর অন্যদের নিয়ে ক্লাস করবো না বলে স্কুলে তালা দিয়ে বাড়ি চলে আসি।

তবে যুদ্ধের যাওয়ার সাহস নিয়ে এগোলেও যাত্রা সহজ ছিল না। বাবাকে বললাম, যুদ্ধ যাব। তিনি মুসলিম লীগ করতেন। বাবা বললেন, কোথাও যাওয়া লাগবে না, বাড়িতে থাকো, লেখাপড়া করো। আমি চিন্তা করলাম, দেশ তো একদিন স্বাধীন হবেই। বন্ধুরা ফিরে এলে তাদের কী উত্তর দেব। মাকে বললাম যুদ্ধে যাব। মা বললেন, তোমার ইচ্ছে, আমি বাধা দেব না। ভাইরাও বাধা দেয়নি, যেতেই বলেছেন। বাড়ির পাট বিক্রি করে কিছু টাকা যোগাড় করি। ভাইরা কিছু চাল-ডাল দেয়।

তখনও জানি না যুদ্ধ কিভাবে করে, কোথায় অস্ত্র পাব, কোথায় যেতে হবে। প্রায় ৩৫ জনের একটি দলের সঙ্গে নৌকায় ভারতে ট্রেনিং নেওয়ার জন্য রওনা দেই। নৌকায় যাওয়া সহজ ছিল না। সঙ্গে যে চাল-ডাল ছিল তাও শেষ। নদীর পানি খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। রাতে ঠাণ্ডায় অনেক কষ্ট হতো। কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অনেকে ফিরে গিয়েছিল। ভারতের শিলিগুড়ি পৌঁছাই মাত্র দুজন।

 

যুদ্ধ শুরু করলেন কী করে?

ট্রেনিং শেষে ভারতের মিত্র বাহিনীদের সাথেই আমারা দেশে আসি যুদ্ধ করতে। আমাদের কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন ডি এস ভিলন। প্রথম দিকে রাজশাহী-দিনাজপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে শুরু হয়। একবার হিলি সীমান্ত এলাকায় একটানা সাত দিন যুদ্ধ হয়। সেখানে আমাদের কাছে খবর ছিল পাক সেনারা বাঙালিদের ‍ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। ওই যুদ্ধে প্রায় ৭০০ পাকিস্তানি সেনাকে আটক করা হয়। ক্যাম্প থেকে অনেক মেয়েদের উদ্ধার করা হয়। অনেক মানুষের লাশ পাওয়া যায়। শান্তি বাহিনীর সদস্যরা এখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং আশপাশের এলাকার মেয়েদের তুলে এনে এখানে রাখত। তারা এত নির্যাতন করতো যে, আমাদের বিজয়ের পর আশেপাশের মানুষ ক্যাম্পে ছুটে আসে। সাধারণ মানুষের গণপিটুনিতে কয়েকশ পাকিস্তানি সেনা সেখানেই মারা যায়। 

পাকিস্তানি সেনারা আমাদের দেশের সব এলাকা চিনতো না। এই শান্তি বাহিনীর মাধ্যমে তারা সারা দেশে তাণ্ডব চালিয়েছে।

শেষ অপারেশন চালাই ১৫ ডিসেম্বর। দিনাজপুরের ফুলবাড়ি রেল স্টেশনের পাশের এক মাদ্রাসায়। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে রেডিওতে শুনলাম নিয়াজি আত্মসমর্পণ করবে। তখন সবার মুখে বিজয়ের হাসি। রাতে যখন নিশ্চিত হলাম আমাদের বিজয় হয়েছে তখন সবাই খুব উল্লাস করি। মিত্র বাহিনীর কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসি।

 

 

/এফএ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ