বাংলা ট্রিবিউনকে আবুল মাল আবদুল মুহিত আরও তিনবছর অর্থমন্ত্রী থাকতে চাই

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২০:১৫, জানুয়ারি ৩০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০১, জানুয়ারি ৩১, ২০১৬

আবুল মাল আবদুল মুহিতআরও তিনবছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকতে চান আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, গত ৭ বছর অর্থনীতিতে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে চাই। পাবলিক সার্ভিস থেকে কর্মজীবন শুরু করেছিলাম, আজও পাবলিক সার্ভিসেই আছি। আগামী দিনেও থাকতে চাই। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়া আমার একটি বড় স্বপ্ন। বেশ কয়েকবছর ধরে এটি ৭ শতাংশের কাছাকাছি ঘর ছুঁই-ছুঁই করছে। আশা করছি, এবার আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত হবে। সোমবার সচিবালয়ে নিজ দফতরে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ সব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে আগামী পরিকল্পনার কথা জানাতে গিয়ে মুহিত বলেন, বাংলাদেশের ১৪ শতাংশ মানুষ আসলেই গরিব। যাদের সহায় সম্বল নেই। তারা নিতান্তই গরিব। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সহায়তা করছি। তাদের প্রাপ্য তাদের হাতে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। এরপরও তাদের জন্য স্থায়ী কিছু একটা করতে চাই। তাদের প্রাপ্য তাদের হাতে দিতে চাই।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, অনেকেই টাকা নিয়ে বসে আছেন। তারা টাকা বিনিয়োগ করছেন না। আবার তারা তাদের টাকা বিদেশেও পাচার করছেন না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে। তারা অবশ্যই টাকা বিনিয়োগ করবেন। বর্তমান সময়টা হচ্ছে যুগসন্ধিক্ষণ—উই শ্যাল ওভার কাম।
এক সময়ে তিনি আর মন্ত্রী হবেন না বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। কিন্তু এবার সামনে আরও তিনবছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করার কারণ জানতে চাইলে তিনি  বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নে আমার অনেক প্ল্যান আছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করতে চাই। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে উত্তরবঙ্গকে এক করতে বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে পদ্মাসেতু পর্যন্ত মহাসড়ক করার মেঘা প্রকল্প হাতে নিতে চাই। এটি খুব প্রয়োজন হবে। বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের ভেতরে আলোচনাও চলছে। আশা করছি, এ বছরই এ প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু হবে। এ ছাড়া, এখন আর ছোট প্রকল্প হাতে নেওয়ার দিন নেই। এখন মেঘা প্রকল্প হাতে নিতে হবে। যেগুলো আছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি বলেও জানান এই বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ।

স্বাধীন দেশের বাজেট ঘোষণার ক্ষেত্রে শীর্ষে আছেন কি না—জানতে চাইলে মুহিত বলেন, না। সাইফুর রহমান সাহেব শীর্ষে। তবে একটানা বাজেট ঘোষণার ক্ষেত্রে তিনি শীর্ষে বলে জানান অর্থমন্ত্রী মুহিত নিজেই। বলেন, আমি ২০১৫-১৬ অর্থবছরসহ পূর্বের টানা ৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছি। যা সাইফুর রহমান সাহেব পারেননি। সাইফুর রহমান সাহেব তার সরকারের ২ মেয়াদে ১০ বছর এবং এর আগে ২টিসহ মোট ১২ বছরের জাতীয় বাজেট দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আমার মোট ৯টি জাতীয় বাজেট দেওয়া হয়েছে।

নিজের শারীরিক সুস্থতা নিয়েও বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। বলেন, ‘৮৩ বছর বয়সেও কাজ করছি। শরীরে রোগ নেই, বালাই নেই। সুস্থ আছি।’  এতে তার সন্তুষ্টিরও শেষ নেই।  বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা  ৮৩ বছর সুস্থ রেখেছেন, কাজ করার শক্তি দিয়েছেন। এটিই তো বড় নেয়ামত। এর চেয়ে বড় নেয়ামত হয় নাকি?’ উল্টো প্রশ্ন অর্থমন্ত্রীর।

নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বলেন, নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার ক্ষেত্রে সরকারের এ সিদ্ধান্ত দেশের ইমেজ বাড়িয়েছে। সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এগিয়ে যাওয়ার অর্থনীতি। অনেকেই বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছেন বিষয়টি।’ অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা ড. কৌশিক বসু। বাংলাদেশের অর্থনীতির উত্থান দেখে তিনি তো মহাখুশি। বলেই তো বসলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে।’ 

সব ধরনের গান শুনতে পছন্দ করলেও রবীন্দ্র সঙ্গীতে দুর্বলতা রয়েছে অর্থমন্ত্রীর। আর সেই রবীন্দ্র সঙ্গীত যদি হয় রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার  কণ্ঠে, তাহলে তো কথাই নেই। জানিয়েছেন তিনি নিজেই। ছবি দেখতে ভালোবাসেন। শুনতে পছন্দ করেন খেয়াল। এক সময় লং টেনিস খেলতেন। সাঁতার কাটতেন। এখন চিকিৎসকের নিষেধ রয়েছে। তাই টেনিস খেলা বা সাঁতার কাটা কোনওটাই হয় না। ভালো লাগে যেকোনও ধরনের আনন্দ-উৎসবের মধ্যে ডুবে থাকতে। পছন্দের খাবার তালিকার শীর্ষে মোরগ পোলাউয়ের অবস্থান।

দিনে ঘুমানোর সময় তো পান না অনেকদিন। তাই এ অভ্যাসটি তার নেই বললেই চলে। তবে রাতেও কাজের মধ্যে ডুবে থাকেন অনেক সময়। মে ও জুন মাসে যখন বাজেটের কাজ চলে, তখন এ প্রবণতা বাড়ে। ফাইল দেখতে দেখতে অনেক রাত হয়ে যায়। তখন হয়তো দিনে টানা ৩ ঘণ্টাও ঘুমানোর সুযোগ হয় না। যদি কখনও টানা তিন ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পান, তাহলে তো খুশির শেষ নেই অর্থমন্ত্রীর। যাকে সামনে পান, তাকেই এই খবরটি বলেন যে, ‘আজ টানা তিন ঘণ্টা ঘুমিয়েছি।’

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালে সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। একাধারে তিনি একজন অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা। অর্থমন্ত্রী মুহিত পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নেতা, তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আব্দুল হাফিজের তৃতীয় সন্তান। মা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী, বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডসহ রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।  মুহিত ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে তৎকালীন সারা প্রদেশে আইএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান, ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম এবং ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন। চাকরিরত অবস্থায় মুহিত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নসহ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি) যোগ দেওয়ার পর মাল  তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার, পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে তিনি পরিকল্পনা সচিব এবং ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিব পদে নিযুক্ত হন। অর্থমন্ত্রী মুহিত পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের চিফ ও উপসচিব থাকাকালে পূর্বও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে বৈষম্য বিরাজমান ছিল তার ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন। সংবিধানের বাধ্যবাধকতা পালনে পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে এটিই ছিল এ বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন। ওয়াশিংটন দূতাবাসের তিনি প্রথম কূটনীতিবিদ, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১-এর জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য দেন। 

অর্থনৈতিক কূটনীতিতেও আবুল মাল আবদুল মুহিত সবিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় তিনি একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৮১ সালে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে তিনি অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরামর্শক হিসেবে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও ইফাদে কাজ শুরু করেন। ১৯৮২ সালের মার্চ মাস থেকে ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরের দুটি জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেন। পরবর্তীকালে তিনি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে উড্রো উইলসন স্কুলে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন। লেখক হিসেবেও অর্থমন্ত্রী মুহিত সমান পারদর্শী। মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইতিহাস, জনপ্রশাসন এবং রাজনৈতিক সমস্যা বিষয়ক গ্রন্থসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার মোট ২৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের তিনি একজন পথিকৃৎ। তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং এর পূর্বসুরি ‘পরশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্ত্রী সৈয়দা সাবিয়া মুহিত একজন বিশিষ্ট ডিজাইনার। মুহিত-সাবিয়া দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে প্রথম কন্যা বেগম সামিনা মুহিত একজন ব্যংকার এবং মুদ্রানীতি ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিউইয়র্কে কর্মরত।  বড় ছেলে সাহেদ মুহিত স্থপতি ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ হিসেবে ঢাকায় কর্মরত। ছোট ছেলে সামির মুহিত টেক্সাসের হিউস্টনে শিক্ষকতা করছেন। অর্থমন্ত্রী মুহিত সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।

/এসআই/এমএনএইচ/ 

লাইভ

টপ