বাংলা ট্রিবিউনকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মাহবুবুর রহমান এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে থাকলে জিকা ভাইরাসের ভয় নেই

Send
ওমর ফারুক
প্রকাশিত : ০৩:১৪, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০৩:১৬, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১৬

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মাহবুবুর রহমানজনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন আতঙ্কের নাম ‘জিকা ভাইরাস’। নতুন প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিতে জুড়ি নেই এই ভাইরাসের। সারাবিশ্বের কয়েকটি দেশের নীতি নির্ধারকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই জিকা। দেশে-দেশে গবেষণা চলছে এর প্রতিষেধক আবিষ্কারে। যদিও এটা এখনও বাংলাদেশের সীমানায় আসতে পারেনি, তবু এই নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবনার শেষ নেই। বলা তো যায় না, কে কখন এই ভাইরাস শরীরে নিয়ে দেশের ভেতর ঢুকে পড়েন!
জিকা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় আফ্রিকায় বানরের শরীরে। কিন্তু ভাইরাস কখনও মহামারি আকারে ছড়ায়নি। তবে গত বছর নতুন করে ল্যাটিন আমেরিকান দেশ  ব্রাজিল ও ক্যারিবীয় দেশগুলোতে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। জিকার কোনও প্রতিষেধক এখনও আবিষ্কার হয়নি। ডা. মাহবুবুর রহমানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে জিকার প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতর এই বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছে, জিকা ভাইরাস নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। সতর্কতা অবলম্বন করলে এ ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
নব্বই দশকে এডিস মশা এবং ডেঙ্গু রোগ নিয়ে যখন সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়, তখন রাজধানী ঢাকাতেই পাওয়া গিয়েছিল অনেক আক্রান্ত রোগী। তখন ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় কয়েকটি হাসপাতালে খোলা হয় বিশেষ ওয়ার্ড। কারণ, ডেঙ্গু রোগটা তখন প্রায় নতুন ছিল। এ বিষয়ে মানুষের সচেতনতাও ছিল কম।

এডিস মশা ও ডেঙ্গু রোগটা এসেছিল দেশের বাইরে থেকে মানুষ বাহিত হয়ে। তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদতফর এবং নগরবাসীর স্বাস্থ্যরক্ষায় কর্মরত ঢাকা সিটি করপোরেশন সম্মিলিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে।

এবার যেহেতু ল্যাটিন আমেরিকায় জিকা ভাইরাসের উৎপাত চলছে এবং ওইসব দেশ থেকে লোকজন বাংলাদেশে যাতায়াত করে, সুতরাং জিকা ভাইরাস বাংলাদেশে আসবে না এমন গ্যারান্টিও দেওয়া যায় না। তাই এ বিষয়ে নগরবাসীর নিরাপত্তায় ঢাকা সিটি করপোরেশন কী করছে, তা জানতে রবিবার বাংলা ট্রিবিউন মুখোমুখি হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. মাহবুবুর রহমানের।

বাংলা ট্রিবিউন : জিকা ভাইরাস সম্পর্কে কিছু বলুন

ডা. মাহবুব : ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয় অঞ্চলের ২১টি দেশে জিকা ভাইরাসের উপদ্রব চলছে। বাংলাদেশে এর অস্তিত্ব নেই। তবে ওইসব দেশ থেকে কোনও আক্রান্ত ব্যক্তি যদি বাংলাদেশে আসেন এবং তাকে এডিস মশায় কামড়ায়, তাহলে ওই মশার মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। এ জন্য বাড়ি-ঘর ও নিজস্ব আঙিনা সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে সবার সতর্ক থাকা দরকার। তাহলে ডেঙ্গুর পাশাপাশি জিকা ভাইরাস নিয়েও আমাদের ভয়ের কিছু থাকবে না। যেহেতু জিকা ভাইরাস এখনও বাংলাদেশে পাওয়া যায়নি, সেহেতু এটা নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই।

বাংলা ট্রিবিউন : জিকা ভাইরাসের লক্ষণগুলো কী কী?

ডা. মাহবুব : এটা ডেঙ্গুর মতো। ডেঙ্গু হলে যেমন জ্বর হয়, মাথা ব্যথা করে, গায়ে ফুসকুড়ি পড়ে, মাংসপেশী ও শরীরের জয়েন্ট ব্যথা করে, চোখ লাল হয়ে যায়, জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিরও এসব হয়ে থাকে।

বাংলা ট্রিবিউন : তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তির করণীয় কী?

ডা. মাহবুব: এর চিকিৎসাও ডেঙ্গুর মতো। ডেঙ্গু কিংবা জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শুধু প্যারাসিটামল ও পানি খেতে হবে। এ সময় অ্যাসপিরিন জাতীয় কোনও ওষুধ খাওয়া যাবে না। এরপরও কেউ সুস্থ না হলে দ্রুত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। কারণ বাংলাদেশের হাসপাতালগুলো এখন ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় খুবই ভালো। ডেঙ্গুরোগীর চিকিৎসা যেভাবে হয়, জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরও একই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন : জিকা ভাইরাসের প্রভাব সম্পর্কে বলুন

ডা. মাহবুব: জিকা ভাইরাসে সাধারণ রোগীদের তেমন ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তবে আক্রান্ত রোগী যদি গর্ভবতী হন, তাহলে তার পেটের বাচ্চার ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্তানের মাইক্রোকেফালি হতে পারে। মাইক্রোকেফালি এমন একটি রোগ যাতে ভূমিষ্ঠ শিশুর মাথা বা মস্তিষ্ক হবে অস্বাভাবিক ছোট। এ ধরনের শিশুকে এক সময় পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়। ল্যাটিন আমেরিকান দেশ ব্রাজিলে জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের গর্ভ থেকে এ পযন্ত এ ধরনের বেশ কিছু শিশু জন্ম নিয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন : এডিস মশার উৎপাত কখন বেশি থাকে?

ডা. মাহবুব: এডিস মশা সাধারণত বর্ষাকালে বেশি বংশ বিস্তার করে। প্রতি বছর জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত—এই চার মাসকে আমরা এডিসের পিক সিজন হিসেবে গণ্য করি।

বাংলা ট্রিবিউন : এডিসের উৎপত্তিস্থলগুলো কী কী?

ডা. মাহবুব : এডিস জন্মায় বাসাবাড়িতে। বাড়ির ফুলের টব, ডাবের খোসা, পুরনো পরিত্যক্ত টায়ার, ভাঙা হাড়ি, বোতল, কোল্ড ড্রিংকসের ক্যান, মাটির পাত্র, কার্নিশ যেখানে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। তাই সবসময় খেয়াল রাখতে হবে। যেন  এসব জিনিসে কখনও পানি না জমে। ভালো হয়, এসব জিনিস নির্দিষ্ট স্থানে সরিয়ে ফেলা। এভাবে বাড়ি-ঘর পরিষ্কার রাখতে পারলে এডিসের উৎপাত থাকবে না। তখন ডেঙ্গু কিংবা জিকা ভাইরাস নিয়েও আতঙ্ক থাকবে না।

বাংলা ট্রিবিউন: এডিস নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা কী?

ডা. মাহবুব: প্রতি বছর আমরা বর্ষার আগে এডিস বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রচারণা শুরু করি। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা অভিযানও জোরদার করি। এবার আমরা মে মাস থেকে এডিস নির্মূলে অভিযান শুরু করব। এ জন্য আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। এই এডিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ডেঙ্গু কিংবা জিকা নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা করতে হবে না।

বাংলা ট্রিবিউন: এডিস কিংবা জিকা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কি শুধু আপনারাই লড়বেন, নাকি অন্যরাও থাকবে?

ডা. মাহবুব: এ জন্য অবশ্যই স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় দরকার। সম্মিলিতভাবে আমরা এসব ভাইরাস মোকাবেলা করব।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ