আপদের নাম ‘ব্যাচেলর জীবন’!

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০৫:১৯, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:২৪, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৬

ব্যাচেলরদের এমন বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত‘কয় ছেলেমেয়ে? স্বামী কী করেন? নেই? হবে না।’ ৩২ বছরের সায়মা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের জীবন শেষ করে এখন নিজে একটা ফ্ল্যাটে থাকতে চেয়ে এই অভিজ্ঞতার স্বীকার হন কাজীপাড়ায়। বিয়ে করেননি বলে কেউ তাকে বাসা ভাড়া দেবে না।
শুধু নারী বলে না, ব্যাচেলর ছেলেদেরও বাসা ভাড়া দিতে চান না কেউ। আর দিলে সবচেয়ে ভাঙাচোরা নিচতলা বা চিলেকোঠা, যেখানে একটা খুপড়ি করে আয় করার লোভ বাড়িওয়ালা সামলে উঠতে পারেন না কোনও কোনও সময়।
ব্যাচেলর ছেলে মইনুলের অভিজ্ঞতা আরেককরম। বাসা ভাড়া না পেয়ে কয়েকবন্ধু মিলে মেস করে থাকতে শুরু করেন উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরে। গ্যাস নেই, দেয়াল প্লাস্টার করা হয়নি বলেই মেস করে আগাম কিছু টাকা আয় করতে চেয়েছেন বাড়িওয়ালা। তাই সদয় হয়েছেন মইনুলদের প্রতি। তারা সবাই চাকরি করেন। হঠাৎ একদিন রাত তিনটায় টিনের দরজায় হানা। পুলিশ। শিবির ধরতে এসেছেন। কেউ শিবির করেন না সে কথা বলার সুযোগ পাওয়ার আগে ঘরে ঢুকে ঘর এলোমেলো। টাকা দিলে মুক্তি। বাড়তি ঝামেলা এড়াতে নিজেদের মাসের শেষে ফাঁকা পকেটের শেষ টাকা দিলে পুলিশ চলে যায়। চলে যাওয়ার আনন্দ তারা আর উদযাপন করতে পারেননি, আবার কখন আসে সেই ভয়ে এলাকা ছাড়া।
ব্যাচেলর জীবন মানেই এ ধরনের হাজারো বাস্তব কিন্তু তীব্র কষ্টের অভিজ্ঞতা বলে উল্লেখ করে সদ্য ব্যাংকে ঢোকা শায়লা বলেন, আমি এসেছি মফস্বল থেকে। ঢাকা শহরে আমার আত্মীয় কেউ নেই। চাকরিটা পেয়েছি, কিন্তু থাকবো কোথায়? অফিসে ছোটখাটো এসব বিষয়ে শুরুতেই বললে, সেটা আমার ক্যারিয়ারের জন্য ভালো হবে না। আমি আমার মামাতো ভাইকে স্বামী বানিয়ে বাসা ভাড়া নিয়েছিলাম শুরুতে পীরেরবাগে। বাড়িওয়ালা জানতো স্বামী বিদেশে থাকেন। 

এরপর যখন অফিসের কাছাকাছি পরিচিতদের দিয়ে একটা বাসা পেলাম তখন রক্ষা। যতদিন সমাজের চোখে বড় না হব, ততদিনই আমার এ সমস্যার মধ্য দিয়ে থাকার জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। বাড়িওয়ালা কথায় কথায় বলেন, ব্যাচেলর ভাড়া দেই না, নানা সমস্যা। কী সমস্যা হয়েছে আমাকে একবছর রাখতে গিয়ে সে প্রশ্নের কোনও জবাব কিন্তু তিনি দেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এ কে এম নূর-উন-নবী বলেন, সাধারণত ১৮ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের মধ্যে যারা বিয়ে করেননি, তাদের ব্যাচেলর বলা হয়। কিন্তু ঢাকায় এমন অনেকেই আছেন যারা বিয়ে করেছেন, অথচ পরিবারের সঙ্গে থাকেন না। অনেকে সদ্য পরিবার ছেড়ে নানা কাজে ঢাকা শহরে অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন, তাদেরও ব্যাচেলর হিসেবে গণ্য করা হয়। এর বাইরে আছেন বিপুলসংখ্যক অবিবাহিত শিক্ষার্থী।

মিরপুর শেওড়াপাড়ায় ব্যাচেলর মেয়েকে ভাড়া দিয়েছেন বাড়িওয়ালি শাহিনা খাতুন। কেউ ভাড়া না দিতে চাইলেও তিনি কেন ভাড়া দিলেন জানতে চাইলে বলেন, আমি যাকে ভাড়া দিয়েছি তিনি একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তার বাবা মা এসে তাকে বাসায় উঠিয়ে দিয়ে গেছে। আর একজন নারী বাসায় থাকলে বাসার ‘কনডিশন’ ভালো থাকে, ঘনঘন কিছু নষ্ট হয় না।

ঠিক তার পাশের বাসায় বড় করে ঝোলানো, ব্যাচেলর ভাড়া দেওয়া হয় না। কেন ভাড়া দেবেন না জানতে চাইলে বাড়িওয়ালা বলেন, আমার ইচ্ছা, পুলিশী হয়রানি যখন হবে, তখন কে সামলাবে।

বাড়িওয়ালাদের শতভাগ যে ব্যাচেলরদের ভাড়া দেন না, তা নয়। রাজধানীর কমলাপুর, ফার্মগেট, শান্তিনগর, মগবাজার, মালিবাগ, আজিমপুর, লক্ষ্মীবাজার, ওয়ারী, মোহাম্মদপুর, পান্থপথ, তেজগাঁও, কাঁঠালবাগান, ধানমন্ডির ভূতের গলি, শাহবাগের আজিজ মার্কেট, কল্যাণপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, বাসাবো, খিলগাঁও এলাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাচেলরদের জন্য বরাদ্দ ভবনের সবচেয়ে ওপরের তলা, নয়তো বাড়ির একেবারে নিচের তলা।

কর্মজীবী নারী সংগঠনটি দীর্ঘদিন পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিরিন আখতার বলেন, খুবই দুঃখজনক হলেও সত্যি, ব্যাচেলররা যখন একটা নতুন চাকরিতে ঢুকছে তখনও তাদের আবাসন সুবিধা না দিতে পারায় তারা সেই শিক্ষাজীবনের মতো মেস করে থাকছে। এতে তারা জীবনের একটা সময়কে হারিয়ে ফেলছে।

তিনি বলেন, নারীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ইস্যুটা নিয়েও ভাবা দরকার। তারা যদি নিরাপদ বাসায় নিজেদের মতো করে থাকতে পারে তাহলে কর্মজীবনেও তারা এগিয়ে যাবে।

 

/ইউআই/এজে/

লাইভ

টপ