Vision  ad on bangla Tribune

২৭ হাজার শিক্ষকের চোখের জল মুছতে লাগবে ৫শ’ কোটি টাকা

রশিদ আল রুহানী০৮:০৩, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৬

টাকাঅবসরপ্রাপ্ত ২৭ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর কল্যাণ ট্রাস্টের মোট প্রায় ৫শ’ কোটি পাওনা টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট (ব্যানবেইস)। প্রায় আড়াই বছর ধরে আটকে আছে শিক্ষক-কর্মচারীদের এ টাকা। আর এ সময়সীমা বেড়ে পাঁচ বছর হবে বলে আশংকা করেছেন ব্যানবেইস কর্তৃপক্ষ। শিক্ষকদের প্রতিমাসের বেতন থেকে কেটে রাখা টাকাই ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সংশ্লিষ্ঠরা অর্থ সংকটকেই দায়ী করছেন।
রাজধানীর পলাশী এলাকায় অবস্থিত ব্যানবেইস কার্যালয়ে গত এক সপ্তাহ গিয়ে দেখা যায়, অবসরপ্রাপ্ত কয়েকশ’ শিক্ষক দিনের পর দিন ঘুরছেন এ প্রতিষ্ঠানের বারান্দায়। তাদের বেশিরভাগই বয়সজনিত নানা রোগশোকে আক্রান্ত। কেউ কেউ কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা-মাতা। অবসরে যাওয়ার পর শেষ বয়সে উপার্জন বন্ধ হওয়ায় তাদের অনেকে আর্থিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছেন।
কথা হয় যশোর থেকে আসা এক শিক্ষকের সঙ্গে। তিনি অবসরে গেছেন প্রায় আড়াই বছর আগে। আবেদনের পর কল্যাণ ট্রাস্টের টাকার জন্য প্রতিষ্ঠানটিতে বিভিন্ন সময় এসেছেন প্রায় ২০ থেকে ২৫ বার। হৃদরোগসহ শারীরে বিভিন্ন রোগ নিয়ে তিনি কোনোরকমে বেঁচে আছেন। এ শিক্ষক টাকার অভাবে নিজের চিকিৎসা করাতে পারছেন না। কষ্টের কথা আওড়াতে গিয়ে তার চোখ ভিজে গেল। বললেন, ‘টাকা হাতে পাওয়ার আগেই হয়তো আমি মরে যাব।’
প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালক মো. আবুল বাশার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অর্থ সংকটই হাজার হাজার শিক্ষকের দুর্ভোগের কারণ। এ সংকট মেটাতে হলে ৫শ’ কোটি টাকা লাগবে। কল্যাণ ট্রাস্ট এখন পর্যন্ত ২০১৩ সালের মে মাসের আবেদন নিষ্পত্তি করছে।’
কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর এ চাহিদা দ্বিগুন হয়ে যাবে। এখানে জট আছে প্রায় আড়াই বছরের, যা বেড়ে হবে ৫ বছর। অর্থাৎ একজন শিক্ষককে আবেদনের পর কল্যাণ সুবিধার জন্য ৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রতি মাসে ৫ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে ২ শতাংশ হারে চাঁদা আদায় হয় প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা। আর প্রতি মাসে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পরিশোধ করতে হয় ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রতি মাসে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে অর্ধেকেরও বেশি। কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্রে জানা গেছে, কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা-মাতা, হজ বা তীর্থযাত্রী, গুরুতর অসুস্থ ও মৃত ব্যক্তির পক্ষে আবেদনকারীদেরকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অর্থ পরিশোধ করা হয়।

দিনাজপুর থেকে এসে টাকার জন্য ঘুরছেন রহিম উদ্দিন নামে এক শিক্ষক। তার স্ত্রী মারা গেছেন ১০ বছর আগে। একমাত্র ছেলেও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন গত বছর। মৃত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে টাকা পরিশোধ করা হয় এ বিষয় জানা পর এ শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মরে যাওয়ার পর আমি টাকা দিয়ে কী করবো? নিজের চিকিৎসার জন্যও যদি টাকা না পাই, তাহলে ওই টাকা আমার লাগবে না। আমার তো দুনিয়াতে কেউ নেই। আমি মরে যাওয়ার পর ওই টাকা সরকারের কাছেই থেকে যাবে।’

সংকটের কারণ হিসেবে জানা গেছে, ১৯৯০ সালে আইন হওয়ার পরে ৯১ সালে কল্যাণ ট্রাস্ট চালু হয়। ৬ মাস চলার পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। ৯১ থেকে ৯৬ পর্যন্ত কল্যাণ ট্রাষ্ট বন্ধ থাকায় এ সময় চাঁদা আদায় বন্ধ ছিলো। ফলে অন্তত ৪ থেকে ৫শ’ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। কল্যাণ ট্রাস্ট আইনে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বছরে এককালীন ৫ টাকা আদায় করার বিধান ছিল। ২০০৪ সালে সেটাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০০৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল এই ১২ বছরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হলে আরও ২শ’ কোটি টাকা আদায় করা হতো।
বয়সের ভারে প্রায় অচল কিবরিয়া নামে অন্য এক শিক্ষক এসেছেন গাইবান্ধা থেকে। তিনি বলেন, ‘আমি বেশ কয়েকবার এসেছি টাকা কবে পাব তা জানতে। কিন্তু এলেই বলে অপেক্ষা করুন, দেরি হবে। কবে পাবো জানি না।’

এবার আসার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমার নাকি আরও কিছু কাগজপত্র লাগবে। অফিস থেকে ফোন করে ডেকেছে, তাই দিতে এসেছি।’ 

বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ সংকট কাটাতে হলে সরকারের এ খাতে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। না হলে সম্ভব নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা হাজার পৃষ্ঠা আবেদন করেছি সংশ্লিষ্ঠ মন্ত্রণালয়ে। শিক্ষামন্ত্রী অর্থ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন। এছাড়া ২০১০ সালে বোর্ডের সভায় শিক্ষকদের এমপিও থেকে ২ শতাংশের পরিবর্তে ৪ শতাংশ করে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে বার্ষিক ২০ টাকা করে নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছিল। এ দু’টি সুপারিশ কার্যকরের সঙ্গে সরকার এখানে বরাদ্দ দিলে ভবিষ্যতে এ সংকট থাকবে না। আশা করি সুরাহা হবে।’

 

/আরএআর/এজে/আপ-এমএসএম

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ