‘গৃহিণী’রা সারাদিন কী করেন?

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১০:২৩, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৮, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৬

সন্তানের জন্য মায়েদের অপেক্ষা

সায়মা হক। দুই সন্তানের মা। স্বামী বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। সায়মা ভোরে ৬টায় ঘুম থেকে উঠে নাস্তা তৈরি, বড় সন্তানকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা, তার টিফিন বক্স এবং  স্বামীর লাঞ্চবক্স ভরে সকাল ৮টায় বাসা থেকে বের হন। ক্লাস ফাইভে পড়ুয়া ছেলের স্কুলের সামনে বসে থাকেন। সেখান থেকে বের হয়ে বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া লাঞ্চ কোথাও বসে কোনরকমে খেয়ে ছেলেকে কোচিং এ নিয়ে যান। টেলিফোনে বাসায় রেখে আসা ছোট সন্তানের খোঁজ নেন। এরপরে বিকেল ৫টায় বাসায় ফেরেন। ফিরে এসে আবার রাতের খাবার প্রস্তুত করা, ছেলের হোমওয়ার্ক করানো, ছোট সন্তানের দেখভাল করা শেষ করে প্রায় প্রতি রাতে ঘুমাতে যান সাড়ে ১২টায়। সায়মা চাকুরি ছেড়ে দিয়ে এখন কেবলই সংসারের কাজে ব্যস্ত।  

তারপরও সায়মা হককে মাঝেমধ্যেই শুনতে হয়, চাকুরিতো করো না, কী করো? বাচ্চা সামলাতে এতো সময় লাগে নাকি? মোহাম্মদপুরে প্রিপারেটরি স্কুলের সামনে সন্তানদের জন্য বসে থাকা মায়েদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারা অনেকেই অনলাইনে কাপড় কেনাবেচার কাজও করেন। এতে করে এই বসে থাকা সময়টা পার হয় এবং সংসারে বাড়তি কিছু আয়ও আসে। যদিও এই আয়কে আয় হিসেবে পরিবারের সদস্যরা কমই গুরুত্ব দেন। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের নারীরা দিনের  অন্তত ৪০ শতাংশ কাজ পরিবার এবং স্বজনদের জন্য করেন, কিন্তু তার এসব কাজের কোনও মূল্যায়ন হয়না। কিন্তু নারী অধিকার রক্ষা এবং নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে এ ধরণের কাজের মূল্যায়ন করা জরুরি- বলছে নারী অধিকার নিয়ে কর্মরত বেসরকারি সংস্থাগুলো।

সম্প্রতি বাংলাদেশের দুইটি জেলায় গবেষণা চালিয়ে অ্যাকশন এইড বলছে, অমূল্যায়িত সেবাখাতে পুরুষদের তুলনায় নারী অন্তত ৪০ভাগ সময় বেশি ব্যয় করেন। কিন্তু তাদের এই কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রধান সালমা আলী বলেন, এখন আর আলাদা করে গৃহিণী শব্দ ব্যবহারের সুযোগ নেই। কারণ নারীদের কোনও না কোনও কাজে বাসার বাইরে বড় একটা সময় পার করতেই হচ্ছে। কিন্তু তাই বলে তার ঘরের কাজ কমেনি। বাইরের কাজের সঙ্গে ঘরের কাজও যোগ হয়ে বরং তার কাজ এখন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সারাদিনের বেশিরভাগ অংশ কাজে ব্যয় করলেও সেই কাজ মূল্যায়িত হয় না। নারীর অধিকার রক্ষায় এ ধরণের কাজের মূল্যায়ন করা জরুরি।

নারীর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার এই বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি সিপিডি ও ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ এর যৌথ উদ্যোগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নারীরা ঘরে সম্পাদন করেন, এমন কাজের প্রাক্কলিত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)-এর ৭৬.৮ শতাংশের সমান। চলতি মূল্যে তা ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। গবেষণায় ৬৪টি জেলায় নমুনা জরিপ চালিয়ে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারীরা যেসব হিসাব বহির্ভূত কাজ করে থাকেন, তার পরিমাণ জনপ্রতি প্রতিদিন গড়ে ৭.৭ ঘণ্টা। একজন পুরুষের ক্ষেত্রে তা মাত্র আড়াই ঘণ্টা। নারীরা এ ধরনের যতো কাজ করে থাকেন, তা নিজেরা না করে অন্যকে দিয়ে করালে কত খরচ হতো, তা হিসাব করলে (এটিকে বলা হয় প্রতিস্থাপন পদ্ধতি) দেখা যায় যে, এর মোট পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৭৬.৮ শতাংশ। অন্যদিকে এসব কাজ অন্য কেউ করতে বললে তার বিনিময়ে নারীরা কত পারিশ্রমিক নিতেন, সেই আলোকে হিসাব করলে (গ্রহণযোগ্য মূল্য পদ্ধতি) সেসবের প্রাক্কলিত আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় জিডিপির ৮৭.২ শতাংশ। এর অর্থ দাঁড়ায়-নারীর এসব কাজকে জিডিপির পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হলে জিডিপির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ ধরে হিসাব করতে হতো।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, চাইলেই বা ইচ্ছা করলেই পরিবারের মধ্যে নারীকে অমর্যাদা করার প্রবণতা রয়েছে। সমাজের এ মনমানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। নারীর কাজের মূল্যায়ন হলে এবং যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হলে নারীর প্রতি সহিংসতাও কমবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, সন্তান লালন-পালনসহ সংসার সামলাচ্ছেন নারী। তবে নারীর এসব গৃহস্থালির কাজের মূল্যায়ন না থাকার ফলে জাতীয় আয়ে নারীর অবদানের কোনো প্রতিফলন ঘটে না। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন করলেই গৃহিনীরা আসলে কী অবদান রাখে তা স্পষ্ট হবে।

এপিএইচ/

আপ-এসটি

লাইভ

টপ