Vision  ad on bangla Tribune

ভারতের বিপক্ষে কীভাবে আসবে জয়?

ডা. এনামুল হক১৮:২৯, মার্চ ০৫, ২০১৬

এনামুল হকনিজেদের মাঠে দাপট, শাবকের পূর্ণাঙ্গ বাঘ হওয়া আর নিজেদের দলের খারাপ পারফরমেন্স যে যাই বলুক, ৬ মার্চ ভারতের সঙ্গে ফাইনালে বাংলাদেশই মুখোমুখি হচ্ছে। নিকট অতীতে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফল্য সহজেই বলে দেয় বড় দলকে হারানো আমাদের জন্য আর কোনও দৈব ঘটনা নয়, এও সবার জানা যে এশিয়া কাপের ফাইনালে আমরা নতুন কোনও দল নই, অতীতে ফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা নিয়েই যাচ্ছি এবারের এশিয়ার কাপের শেষ ম্যাচে।
ফাইনাল ম্যাচে বাংলাদেশের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন, জয়। জয় ছাড়া কোনও বিকল্প আমাদের তৃপ্ত করতে পারবে না। ভালো খেলা, মাঝে-মধ্যে জেতা আর সম্মানজনক হারের দিন আমরা অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছি।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ভারতই উপমহাদেশে একমাত্র যোগ্য দল যারা ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হওয়ার যোগ্যতা রাখে। ব্যাটিং, বোলিং আর ফিল্ডিং এ তারা টি-টোয়েন্টি বিশ্বে যে কোনও দলের জন্য দুঃস্বপ্ন। নিকট অতীতে ভারত অস্ট্রেলিয়ার মাঠে অস্ট্রেলিয়াকেই ৩-০ তে হারিয়ে এসেছে। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব যদি প্রমাণ করতেই হয় তবে সবচেয়ে ভালো দলকে হারিয়েই তা প্রমাণ করতে হবে, যা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশ দলকে দেবে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস। ২৮৯৭ পয়েন্ট নিয়ে ১২৬-রেটিং টি-টোয়েন্টিতে এক নম্বরে থাকা ভারত দলকে হারানো রেটিংয়ে আফগানিস্তানের পেছনে থাকা দলের পক্ষে কতটা বাস্তব?
উত্তরটা এখনই বলে দিতে পারি, খুবই সম্ভব এবং বাস্তব। দলগত শক্তির শতভাগ দেওয়ার কথা অনেকেই বলবেন, আমি বলি পারফরমেন্সের ৮০-৯০ ভাগ দিতে পারলেও ভারতকে হারানো আমাদের পক্ষে অবশ্যই অসম্ভব কিছু নয়। যে দেশের মাশরাফির মতো একজন দলপতি আছেন, বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার আর নিজেদের সময়ের সেরা অবস্থানে ব্যাটসম্যান আর বোলাররা আছে, মাঠ ভর্তি দর্শক আছেন... তাদের পক্ষে জয় শুধু মাত্র বাস্তবায়নের ব্যাপার। কীভাবে আসবে সেই জয়?

সেরা দল গঠন সেরা খেলোয়াড়দের নিয়েই বর্তমানে আমাদের স্কোয়াড ঘোষণা করা হয়েছে। হয়তো দলের পরিক্ষিত অনেক খেলোয়াড় নিজেকে ঠিক মেলে ধরতে পারছেন না। কিন্তু আমরা সবাই জানি, সঠিক সময়ে নিজেকে শতভাগ উজাড় করে দিয়ে একাই দলকে জয়ের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা এই স্কোয়াডে অনেকেরই রয়েছেন। ভারতের বিপক্ষে মূল একাদশ গঠনে আমি পেসারদের ওপর বেশি জোর দেবো।

চাই চারজন পেসারকে নিয়ে বাংলাদেশ, সঙ্গে সানি স্পেশালিস্ট স্পিনার এবং ব্যাটিং অলরাউন্ডার কাম স্পিনার হিসেবে সাকিব আল হাসান। মুস্তাফিজ ইনজুর্ড, তাই মাশরাফি, আল আমিন আর তাসকিনের সঙ্গে দেখতে চাই নতুন সেনসেশন আবু হায়দার রনিকে। চাইবো বাংলাদেশ এই ইয়র্কার মাস্টারকে নিয়ে ফাইনালে নামুক, নতুন বলে নতুন পেসার নিয়ে অতীতেও আমরা ভারতের বিপক্ষে অনেক সাফল্য পেয়েছি।

মুস্তাফিজের বিকল্প না হলেও ভারতকে চমকে দেওয়ার জন্য আবু হায়দার সুন্দর উদাহরণ হতে পারে। এতে একজন স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান কম খেলালেও অসুবিধা নেই, অতীতের ম্যাচগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায় ভারতের বিপক্ষে বিজয়ে বোলারদের অবদানই বেশি। এক্ষেত্রে বলি দিতে হবে মিথুনকে। সৌম্য’র সাথে তামিম ওপেন করবেন, ওয়ান-ডাউনে সাব্বির, তারপর রাইট-লেফট কম্বিনেশনে মুশফিক, সাকিব, মাহমুদুল্লাহ। চার পেসার, এক স্পিনার, ছয় ব্যাটসম্যান। দলের প্রয়োজনে এরা ছাড়াও শেষের দিকের প্রায় সবাই ব্যাটিং-এ চলনসই, প্রয়োজনে হাত ঘুরিয়ে উইকেট নিতে পারেন একাধিক খেলোয়াড়, সঙ্গে বোনাস হিসেবে আছে মাশরাফির ম্যাজিক ব্যাটিং।

এই টিমই হয়ে উঠতে পারে চমৎকার উইনিং কম্বিনেশন। ভারতের প্রায় সব ব্যাটসম্যানই স্পিন খেলায় পটু, স্পিন দিয়ে ভারতকে আটকানোর বুদ্ধি খুব একটা কাজে আসবে না, উইকেটে স্পিন ধরলে কথা ভিন্ন। সেক্ষেত্রে সানি, সাকিবের সঙ্গে সাব্বির, মাহমুদুল্লাহ কার্যকর হবেন। তবে মূল দায়িত্বটাই থাকবে পেসারদের ওপর। শুরুতে ৩-৪টি উইকেট নিয়ে ভারতের মিডল অর্ডারকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিতে হবে। মধ্য ওভারগুলোতে স্পিনার পেসার সমন্বয়ে চাপটা ধরে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে ভারতের ব্যাটিং-লাইন আপে মাহমুদুল্লাহ’র মতো ব্যাটসম্যান নেই যে ৬-৭ নম্বরে নেমে খেলা বদলে দিতে পারে। ভারতের মূল রানই কিন্তু আসে টপ-অর্ডার থেকে। তাদের টেলএন্ডারদের রানের গড় ফিজি বা পাপুয়ানিউগিনির ব্যাটসম্যানদের থেকেও খারাপ। মনে রাখতে হবে, ভারত ব্যাটিংয়ে আক্রমণাত্মক খেলে, তাই প্রতি উত্তরে আক্রমণাত্মক বোলিং ছাড়া উপায় নেই।

আইপিএল খেলে তাদের ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাস আকাশচুম্বী। যে কোনও সময়ে একটি সুযোগের বিনিময়েই তারা একজনই খেলা বদলে দিতে পারে। রোহিত শর্মাকে সেই সুযোগ গ্রুপ ম্যাচে দিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে বাংলাদেশ দলের। আইপিএলের মতো অতো বড় আসরের অভিজ্ঞতা আমাদের না থাকলেও বিপিএল-এর অভিজ্ঞতা তো আমাদের আছে।

নো ক্যাচ মিস! ফিল্ডিংয়ে চান্স মিস করা যাবে না, উপরন্তু হাফ চান্সগুলোকে ফুল চান্সে পরিণত করতে হবে। গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ে যদি ১০-১৫-রানও বাঁচিয়ে দেওয়া যায়, তবে টি-টোয়েন্টি ফর্মেটে রান অনেকটাই আয়ত্বের ভেতরে চলে আসে। এবং নিশ্চিতভাবেই ফিল্ডিংয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত ভালো দল। ওভার প্রতি টাইট ফিল্ডিং এক রান করে সেইভ করতে পারলেও ২০ ওভারে ২০ রান সেইভ হয়ে যায়।

আমরা চাইবো, ছক্কাটা ব্যাটসম্যান নিজের শরীরের জোরে, দক্ষতায় মারুক, কিন্তু মাঠ কামড়ে বল বাইরে যেতে হলে আমাদের ফিল্ডারকে বলে যেতে হবে। ব্যাটিংয়ে তামিম, সৌম্য, সাব্বির, মুশফিক, সাকিব, মাহমুদুল্লাহ, মাশরাফি আমাদের পরিক্ষিত সৈনিক।

মুশফিক, সাকিব হয়তো ততটা ছন্দে নেই, কিন্তু দলের প্রয়োজনে বিশ্বাস করি সৌম্য সরকারের মতো জ্বলে উঠবেন। তামিম, সৌম্য আর সাব্বিরের চোখ ধাঁধানো সব স্কোরিং শট, মুশফিকের নির্ভরযোগ্যতা (মানুষটা ছোট হলেও ছক্কাটি কিন্তু বড়ই হাঁকান), সাকিবের সিঙ্গেল-ডাবলস আর বাউন্ডারিতে ব্যস্ত ক্রিকেট, ফিনিশার হিসেবে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া মাহমুদুল্লাহ আর মাশরাফির ‘ধরে দিবানি’ টাইপ ব্যাটিং... আর কি চাই!

নাসিরকে মূল একাদশে রাখতে পারছি না বলে খারাপ লাগছে, তবে নির্দিষ্ট দিনে আবহাওয়া এবং উইকেট দেখে তার নাম ঘোষণা শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার। আর হ্যাঁ, একটি ব্যাপার খেয়াল রাখা প্রয়োজন মনে করছি, চার-ছক্কা মারতে গিয়ে আমরা অনেক ডট বল দিয়ে দেই। মাত্র ১২০ বলের খেলা, চেষ্টা করতে হবে অপেক্ষাকৃত কম ডট বল দেওয়ার।

সবশেষে বলতে চাই, আমাদের মূল শক্তি মাঠের বাইরে, আমাদের দর্শক। তাদের উপস্থিতিই আমাদের মূল প্রেরণা, তাদের কারণেই আমাদের ক্রিকেট আজ এতো দূর এগিয়েছে। আর ভারতকে কখনওই এতো বেশি প্রতিপক্ষ দর্শকের মাঠে ফাইনাল খেলতে হয় না। আমাদের হারানোর কিছু নেই, প্রথম সুযোগেই চাপটা ভারতের কোর্টে দিতে হবে। আর প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি মাঠে খেলোয়াড়দের জন্য টনিকের মতো কাজ করবে।

আশা রাখছি ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়বো আমরা। জয় বাংলা।

লেখক: প্রভাষক, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ|

লাইভ

টপ