বাংলা ট্রিবিউনকে ফরীদ উদ্দীন মাসঊদইসলামিক ফাউন্ডেশনের নেতৃত্বে দুর্বলতা রয়েছে

Send
চৌধুরী আকবর হোসেন
প্রকাশিত : ১৭:৫৬, মার্চ ১০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩২, মার্চ ১০, ২০১৬

ফরীদ-উদ্দীন-মাসঊদইসলামিক ফাউন্ডেশনের নেতৃত্বে দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান ও  ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রধান ইমাম শায়খুল হাদিস মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। তার মতে, নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আগের মতো সব মতের আলেমদের একত্রিত করতে পারছে না। এছাড়া, তিনি মনে করেন, গণতন্ত্রের জন্য ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া উচিত নয়। যদিও দেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিকদলগুলো জনসম্পৃক্ত হতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। বুধবার বারিধারায় নিজ কার্যালয়ে একান্ত আলাপে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ সব কথা বলেন। 

বাংলা ট্রিবিউন: লাখো আলেমের ফতোয়া ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হওয়া কথা ছিল, কবে নাগাদ শেষ হবে?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: মাদ্রাসা ও দেশের আলেমদের রক্ষার উদ্দেশ্যেই সন্ত্রাসবিরোধী ফতোয়া কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম, ফেব্রুয়ারির মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু মাঝে অপপ্রচার হয়েছে, এই ফতোয়া জিহাদবিরোধী ফতোয়া বলে, এতে কার্যক্রম কিছু ব্যহত হয়েছে। এ ছাড়া, সারাদেশের আলেমদের  সঙ্গে যোগাযোগ করতেও সময় লাগে। তবে, এখন দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করছি, মার্চের মধ্যেই শেষ হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: বাংলাদেশে ধর্মকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসবাদের উত্থানের কারণ কী?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ:  সন্ত্রাসীরা কারও বন্ধু নন, তারা মূলত মানুষের অকল্যাণকামী। তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দিয়ে ইসলামের প্রচারকে ব্যাহত করে দিচ্ছেন। যারা ধর্মীয় ক্ষমতার বিষয় নিয়ে ভাবেন, তালেবানদের উত্থান তাদের প্ররোচিত করতে পারে। এছাড়া,  আফগান, ইরাক  যুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে অনেক লোক যোগ দিয়েছিলেন। তারা সেই তালেবানি চেতনা নিয়ে ফিরে এসেছেন দেশে। তাদের একটা প্রভাব থাকতে পারে। অন্যদিকে বিভিন্ন রাষ্ট্রে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন এবং সেখানকার মুসলমানদের আন্দোলন কাউকে-কাউকে উৎসাহিত করতে পারে। এছাড়া, আর্থিক প্রলোভনের মাধ্যমেও মুসলিম তরুণদের বিপদগামী করে জঙ্গিবাদে জড়িত করতে পারে।

 বাংলা ট্রিবিউন: জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা কতটুকু?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: আমাদের দেশে যারা ধর্মের নামে রাজনৈতিক করছেন তাদের শক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক নয়। একটি গোষ্ঠী জামায়াতে ইসলামী নামে রয়েছে, যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করে নৃশংসতা চালিয়েছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের চক্রান্ত কাজ করছে। অন্য দলগুলোর উচিত, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।

বাংলা ট্রিবিউন: ধর্মীভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি আপনি সমর্থন করেন?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: আমি সমর্থন করি না, এটা গণতন্ত্রের পরিপন্থী দাবি। গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো, ধর্ম হোক, বর্ণ হোক, সবার মত প্রকাশ ও রাজনীতি করার অধিকার আছে। এখানে জনগণ সিদ্ধান্ত নেবেন, নেতা নির্বাচন করবেন।

বাংলা ট্রিবিউন: ধর্মীয় ইস্যুর বাইরে জাতীয় ইস্যুতে ধর্মীভিত্তিক দলগুলোর ভূমিকাকে আপনি কিভাবে দেখেন?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: ইসলাম মৌলিকভাবে মানুষের জন্য। বিশেষ করে যারা বঞ্চিত, তাদের পক্ষে। বর্তমানে বাংলাদেশে ইসলামের নামে যারা রাজনীতি করেন, তাদের ব্যর্থতা হলো,  তারা জনগণের চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তারা সাধারণ মানুষের দাবির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেননি। 

বাংলা ট্রিবিউন: খুৎবা নিয়ন্ত্রণ, মসজিদ-মাদ্রাসা কমিটিতে কারা আছেন, সেই বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্তকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: খুৎবা বা কারও বক্তব্যকে নিয়ন্ত্রণ গণতান্ত্রিক দৃষ্টিতে উচিত নয়। তবে, সরকারকে সর্তক থাকতে হবে, যেন কোনও দুষ্কৃতকারী সুযোগ নিতে না পারেন। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ না করে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে, যেন কেউ বিদ্বেষ ছড়াতে না পারেন। আর মসজিদ-মাদ্রাসা কমিটিতে কারা আছেন, এটা সরকারের জানা দায়িত্ব। শুধু মাদ্রাসা-মসজিদ বলে নয়, রাষ্ট্রের ভেতরের যেকোনও প্রতিষ্ঠানের খোঁজ খবর রাখা।

বাংলা ট্রিবিউন: ইসলামিক ফাউন্ডেশন নিয়ে এত বির্তক কেন? বর্তমান সময়ে আলেমরা ইসলামিক ফাউন্ডেশন নিয়ে কেন বিরূপ মন্তব্য করছেন?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নেতৃত্বের দুর্বলতা রয়েছে। তারা আগের মতো সব মতের আলেমদের একত্রিত করতে পারছেন না। বরং ক্রমান্বয়ে দেখা যাচ্ছে, একটি নির্দিষ্ট সংকীর্ণ গোষ্ঠীতে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। ইসলাম নিয়ে শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণা আছে, এমন ব্যক্তিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান করা উচিত। অতীতেও এমনটাই হয়েছে, বর্তমানে ইসলাম নিয়ে গবেষণা দূরে থাক, শিক্ষাই নেই, এমন লোক নিয়োগ পেয়েছেন। আলেমারা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি জানালেও কোনও পরিবর্তন হয়নি।

বাংলা ট্রিবিউন: কওমি সনদের স্বীকৃতি নিয়ে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন, বর্তমানে স্বীকৃতি নিয়ে কোনও উদ্যোগ নেবেন?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: কওমি সনদের স্বীকৃতি নিয়ে বেশির ভাগ আলেম একমত ছিলেন। স্বীকৃতি নিয়ে একমত থাকলেও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্নতা ছিল। আমরা এখনও হতাশ নই। আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী পুনরায় উদ্যোগ নেবেন।

বাংলা ট্রিবিউন: কওমি মাদ্রাসার একাধিক বোর্ড রয়েছে, বোর্ডগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকা উচিত কি না? কওমি পাঠ্য বইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, এগুলো সমাধানের পথ কী?

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ: বেফাক (কওমি বোর্ড) এর বাইরেও অনেক আঞ্চলিক বোর্ড রয়েছে। সব মাদ্রাসাকে শৃঙ্খলায় আনা জরুরি। বেফাকে যারা রয়েছেন, তারা নেতৃত্বের কতটুকু যোগ্যতা রাখেন, সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। পাঠ্য বই রচনা সহজ কাজ নয়। শিক্ষার্থীর স্তর, মান, মনোভাব—ইত্যাদি বিবেচনা নিয়ে শিক্ষার বিষয়টি ভেবে পাঠ্য বই রচনা করতে হয়। কিন্তু এ নিয়ে বেফাকের কোনও গবেষণা নেই। তারা নামমাত্র চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের বই অত্যন্ত অসংলগ্ন, তথ্য-উপাত্তে ভুল রয়েছে। কিছু স্বার্থপর লোকের জন্য উন্নয়ন হয়নি। শিক্ষার্থীরা বাধ্য হচ্ছেন এ সব বই পড়তে। তাদের (শিক্ষার্থী) ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

মাদ্রাসার বোর্ড, পাঠ্য পুস্তকের পরিবর্তন ও উন্নয়নে জনসচেতনা প্রয়োজন। কারণ সরকার উদ্যোগ নিলে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়। মাদ্রাসার দাতা, শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা সচেতন হলে পরিবর্তন আসবে।

/এমএনএইচ/ 

লাইভ

টপ