behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

বাংলা ট্রিবিউনকে ইউজিসির চেয়ারম্যানদেশে বসেই বিদেশি ডিগ্রি অর্জন, স্রেফ ভাওতাবাজি

রশিদ আল রুহানী০৫:৫৫, মার্চ ১২, ২০১৬

ইউজিসি`র চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান.‘দেশে বসেই বিদেশি ডিগ্রি’,‌‌‘ইউকে ডিগ্রি ইন বাংলাদেশ,’ পত্রিকায়, সাইনবোর্ডে এসব বিজ্ঞাপন দিয়ে যারা দেশের শিক্ষার্থীদেরকে বিদেশি ডিগ্রি দেওয়ার কথা বলছেন তারা স্রেফ ভাওতাবাজি করছেন। কারণ নামে-বেনামে যেসব বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা স্টাডি সেন্টার দেশে চালু আছে তাদেরকে ইউজিসি এখনও কোনও অনুমোদন দেয়নি।বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান বৃহস্পতিবার দুপুরে ইউজিসি কার্যালয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন,দেশে বিদেশি ডিগ্রি দেওয়ার নামে যারা প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করছেন তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ সাপেক্ষে একে একে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আব্দুল মান্নান আরও বলেন,‘ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন’ নামে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একটি নীতিমালা করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ বাংলাদেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় অথবা স্টাডি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নীতিমালা মেনেই সেটা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।কিন্তু হয়ত অনেক প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।তাদেরকে এখনও কোনও অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে।

এক প্রশ্নের জবাবে আবদুল মান্নান বলেন,‘এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় শুধু আমাদের দেশেই অনুমোদন দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে তা নয়, ইতোমধ্যে অনেক দেশেই এ ধরনের ক্যাম্পাস চালু আছে।বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোতে চালু আছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের চালু হওয়া দরকার।তাছাড়া ডিগ্রি অর্জন করতে বিদেশে যাওয়াটা বর্তমানে অনেক খরচের বিষয়। ফলে দেশে বসেই যদি আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি নিতে পারে সেটা তো ভালো। এতে শিক্ষার মান সমৃদ্ধি হবে।আর সবদিক বিবেচনা করেই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা স্টাডি সেন্টারের অনুমোদন দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশে অনুমোদন ছাড়াই যেসব স্টাডি সেন্টার চালু হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল তাদের মধ্যে পাওয়ার ফ্যাশন,ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অফ ইউএসএ, পিচব্লেন্ড, পাঠদানা নামক এসব ভাওতাবাজি প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ সাপেক্ষে আইনি সহায়তা নিয়ে আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। আরও কিছু স্টাডি সেন্টার আছে, যারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ও হস্তক্ষেপ ছাড়া আমরা এসব প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করতে পারি না।

বিদেশি ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টারের অনুমোদন চেয়েছে কারা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আট থেকে দশটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমতির জন্য আবেদন করেছে। তবে আমরা এখন পর্যন্ত তাদেরকে অনুমতি দেইনি। কারণ তারা নীতিমালা পূরণ করতে পারেনি। যারা দেশে বিদেশি বিশ্বাবিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস করতে চায়, তাদের নিজেদের দেশে মাদার ইউনিভার্সিটি আসলেই আছে কিনা তা দেখতে হবে। তবে একটিমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়-অস্ট্রেলিয়ার মনাস বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে খোঁজ  নিয়েছি, পরিদর্শনে গিয়েছি। তারা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়, যদিও দেখার প্রয়োজন ছিল না। তাদের অবস্থা ভালো পেয়েছি। তবুও এখনও অনুমোদন দেওয়া হয়নি।’

কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন,‘এখন যদি অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন করে তাহলে তাদের সম্পর্কে তো সরেজমিনে গিয়ে দেখার দরকার নেই।কারণ এরা বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়।আমরা দেখবো যে,আমাদের দেশে তাদের প্রতিষ্ঠানের অবস্থা কেমন। আমাদের নীতিমালা অনুযায়ী চলছে কিনা।’

বাংলাদেশে বিদেশি এসব ডিগ্রির মূল্যায়নটা কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘এসব ডিগ্রি দিয়ে হয়ত খুব একটা সুবিধা করতে পারে না, তবে এসবের ব্যবহারও হচ্ছে দেশে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা ও দেশে বিদেশের বিভিন্ন সংস্থায় ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু এগুলো কিভাবে যে ব্যবহৃত হয় তা জানি না। সার্টিফিকেট বাণিজ্যকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আমার সবসময় বলি, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেই, ওয়েবসাইটে প্রচার করা হয়, তালিকা দেওয়া হয় কোন কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যাবে, কোনটাতে যাবে না,তারপরও মানুষ ধোঁকায় পড়ে। চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে প্রতারিত হয়।’

বাংলাদেশে আগের তুলনায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের সংখ্যা বেশি, যারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাদের ছেলে মেয়েদেরকে অনেক সময় দেশের বাইরে পড়াশোনা করতে পাঠাতে পারেন না। বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বর্তমানের মত শিক্ষার প্রতি মানুষের এতটা আগ্রহ বা মনোযোগ ছিল না। কিন্তু বর্তমানে সবাই সচেতন। বাবা রিকশা চালিয়ে, মা ইট ভেঙে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছেন।এর মধ্যে কষ্ট করে মোটা অংকের টাকা খরচ করে বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়াটা বিরাট অর্জন বলে মনে করি আমরা। সেটা সুফলও বয়ে আনে শিক্ষার্থীদের। কিন্তু বিদেশে গিয়েও অনেকে প্রতারিত হয়ে দেশে ফেরেন।’  

বিদেশে পড়তে যাওয়ার প্রবণতা সম্পর্কে তিনি বলেন,‘মানুষ সচেতন হয়েছে, শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে শিখেছে,কিন্তু সেই তুলনায় দেশে শিক্ষার মান হয়তো বাড়েনি। ফলে এই চাহিদার সঙ্গে যোগানের তাল মেলাতে না পারাই দেশ থেকে বিদেশে গিয়েছে অনেক শিক্ষার্থী। যাদের সামর্থ্য ছিল স্কুলে যাওয়া তারা স্কুল গিয়েছে, যাদের সামর্থ্য ছিল কলেজে যাওয়ার তারা কলেজে গিয়েছে, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি সামর্থ্য অনুযায়ী বিদেশে পাঠিয়েছে পড়াশোনার জন্য।’

বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদেরকে টার্গেট করে বাংলাদেশের অনেক প্রভাবশালীরা বিদেশের মাটিতে রমরমা ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে বলেও তার কাছে তথ্য আছে বলে জানান ইউজিসি’র চেয়ারম্যান। তিনি বলেন,‘দেশের শিক্ষার্থীদের যখনই বিদেশে পড়তে যাওয়া প্রবণতা বেড়েছে তখন থেকেই বিশেষ করে ভারতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে ওখানকার ইনভেস্টারদের সঙ্গে পার্টনারশিপ করে রাতারাতি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করেছে।আর এইসব দেখে বাংলাদেশেও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বিদেশে গিয়ে লেখাপড়া করতে আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা লাগে। আগে যে টাকা খরচ হতো তার চেয়ে বর্তমানে কয়েকগুণ টাকা তারা বাড়িয়ে দিয়েছে।’

জেনেছি ইউজিসিকে উচ্চ শিক্ষা কমিশনে রূপান্তর করা হবে। উচ্চ শিক্ষা কমিশনে রূপ দিলে ইউজিসি আরও ক্ষমতাশালী হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘ এ বিষয়ে অনেকের অনেক রকম ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। কেউ মনে করে ইউজিসির ক্ষমতা কমে যাবে। কেউ মনে করে ক্ষমতা বাড়বে। কারণ মাত্র ৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ইউজিসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখন সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় দেড়শত বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখভাল করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। সুতরাং এর ক্ষমতা না বাড়লে তো এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় দেখভাল করা কঠিন। কমিশন হলে জনবল বাড়বে, এর পরিধি বাড়বে। শিক্ষার মান নিয়ে কাজ করতেও সুবিধা হবে।’

/আরএআর/এআর/এমএসএম/

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ