behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

নির্যাতনে মরিনি, স্বাধীনতার পর মরে গেলাম: কমলা রাণী

উদিসা ইসলাম১৮:১৪, মার্চ ২৬, ২০১৬

বীরাঙ্গনার প্রতীকআমি বীরাঙ্গনার মানে জানি না। তবে, যুদ্ধের পর বুঝেছি, ভালো কোনও নাম দেওয়া হয়নি আমাদের। যুদ্ধের কয়েক মাস পর আমাকে ধরে নিয়ে গেল, নির্যাতন করল পশুর মতো, মরারও কোনও পথ রাখেনি সেই ক্যাম্পে। দেয়ালের সাথে মাথা ঠুকে রক্ত বের করেছি। মরিনি। কিন্তু স্বাধীনের পর মরে গেলাম। পরিবারে ঠাঁই হলো না।’ এভাবেই বঞ্চনা আর ক্ষোভের কথা জানালেন  সাভারের বীরাঙ্গনা কমলা রাণী।  তিনি আরও বলেন,  ‘পেটে যাকে ধরেছিলাম, তাকে শেকড়-বাকড় খেয়ে মারলাম ঠিকই। কিন্তু সমাজে ফেরা হলো না। তাহলে পেটেরটারে মারলাম কেন? সে থাকলে আপন কেউ থাকত আমার।’
কমলা রাণী থাকেন সাভারের এক গ্রামে। নিভৃতে, ছাপড়া ঘরে। ভিখারিনী হিসেবেই সবাই তাকে চেনেন।  আগে ঢাকায় বাসাবাড়িতে কাজ করেছেন। এখন আর কাজ করতে পারেন না। এলাকার মানুষ জানেন, তিনি নদীভাঙনে সব হারিয়েছেন। কমলা রাণী ঢাকায় যে বাসায় কাজ করতেন, সে সব বাসার সবাই এখন প্রবাসী।  তার সাবেক কর্মস্থলের সূত্র ধরেই কমলা রাণীর কাছে পৌঁছানো গেল। তিনি কোনও কথা বলতে চাননি। বলেন, ‘আমার নাম কমলা রাণী, হিন্দু, বাড়ি কোথায় ভুলে গেছি।’
কমলা রাণীর জন্য একটা ঠিকানার ব্যবস্থা করে দিতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে কেন? আরও কতজন আছে। কথায়-কথায় তিনি স্মরণ করেন ৪৫ বছরের ফেলে আসা দুঃসহ স্মৃতি। তাকে আশ্বস্থ করা হয়, কেউ জানবেন না তিনি কে। তাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়,  কিভাবে নির্যাতিত  হয়েছিলেন, তা সে বিষয় জানতে চাই না। তখন তিনি যুদ্ধপরবর্তী সমাজের সহিংসতা নিয়ে মুখ খোলেন।

কমলা রাণী বলেন, ‘যুদ্ধে নির্যাতনের পরে নিজের আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে পাওয়া কষ্ট সবচেয়ে বেশি কাঁদিয়েছে জীবনে। যারা আমার সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছে, তারাতো আপনজন ছিল না, কিভাবে কেড়ে নিয়েছে, তা আমার আপনজনেরা তা জানতেন, দেশের মানুষ জানতো। তারপরও আমার জায়গা হলো না কোথাও! স্বাধীন হয়ে এত ননীচু মনের হয়ে গেলাম আমরা! বাবা বলেছিলেন, দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি, তোমাকে সাথে নেওয়া যাবে না। বেঁচে থাকলে ভালো থেকো। সেই কথাগুলো আমি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি। কিন্তু বাবাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।’

কেবল কমলা রাণী নন। এ ধরনের হাজারও নারী আছেন, যারা ধর্ষণ ছাড়াও নানা ধরনের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন ১৯৭১ সালে। কারও শরীরের নানা অঙ্গ কেটে নেওয়া হয়েছিল, কারও চুল উপড়ে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু তার চেয়েও বড় ক্ষত হয়েছিল, যখন এ সমাজ তাদের মেনে নেয়নি। 

ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটির এমএ হাসান দাবি করেন, ‘১৯৭২ সালের মার্চ পর্যন্ত ১ লাখ ৬২ হাজার ধর্ষিত নারী এবং আরও ১ লাখ ৩১ হাজার হিন্দু নারীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।’ তাদের মধ্যে ৫ হাজার জনের গর্ভপাত সরকারিভাবে ঘটানো হয়েছিল বলে জানান আন্তর্জাতিক প্লানড ফাদারহুড প্রতিষ্ঠানের ড. জিওফ্রে ডেভিস। তার ভাষ্য, সরকার উদ্যোগ নেওয়ার আগেই দেড়লাখের বেশি নারীর ভ্রূণ স্থানীয় দাই, ক্লিনিকসহ যার পরিবার যেভাবে পেরেছে, সেভাবে নষ্ট করেছে।

দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৫ বছরে এসে তাদের বীরাঙ্গনা পরিচয়টাই সমাজে তাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বলে মনে করেন ওই সময়ের নির্যাতনের শিকার অনেক নারী। তারা বলছেন, যাদের ধর্ষণ করা হয়েছে, তারা বীরাঙ্গনা, এটা বলার সঙ্গে-সঙ্গে তো সবাই জানতেন, এ সমাজের চোখে আমার মতো নারীর আর কোনও মূল্য নেই। ফলে তাদের অনেকেই এখানে ওখানে কোনওভাবে টিকে থাকলেও সরকারের উদ্যোগের তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা ভাবেন না। জীবনের শেষ সময়ে এসে নতুন করে আর চিহ্নিত হতে চান না। ফলে ধীরগতিতে এগুচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও। প্রাথমিক তথ্যের অভাব ও সামাজিক বাধায় বীরাঙ্গনাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরিতে সময় লাগছে বলে জানান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, এই বিবেচনা করেই আমরা তালিকা বানানোর নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে রাখিনি। এটা ওপেন করা আছে। যে নারী যখন এই তালিতায় অন্তর্ভুক্ত হতে আসবেন, তার বিষয়টাই বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ জন্য কেউ যেন বিব্রত বোধ না করেন, সেই লক্ষ্যে পুরো প্রক্রিয়ায় মহিলা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

/এমএনএইচ/

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune
টপ