ভোলায় অযত্ন অবহেলায় বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘর

আহাদ চৌধুরী তুহিন, ভোলা২০:১০, মার্চ ২৬, ২০১৬

যাদুঘরের সামনের প্রস্তর ফলক

অযত্ন আর অবহেলায় ভোলা সদরের আলীনগর ইউনিয়নের মৌটুপি গ্রামে আলীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলীনগর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মো. মোস্তফা গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘর।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে যাদুঘরটি ২০০৮ সালের ৩ মে উদ্বোধন করেন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল কেএম সফিউল্লাহ বীর উত্তম (অবসরপ্রাপ্ত)। পাঁচটি পড়ার টেবিল, ৪০টি চেয়ার, বই সম্বলিত পাঁচটি বুক সেলফ আর বীরশ্রেষ্ঠর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য দু’টি খাওয়ার প্লেট, একটি বদনা আর বিভিন্ন জাতীয় দিবসে তার পরিবারকে দেওয়া কয়েকটি স্মৃতি পুরস্কার দিয়ে সাজানো একটি শোকেস নিয়ে যাত্রা শুরু হয় বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের নামে তার জন্মস্থান ভোলায় প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘর।

বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘর-১

বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় সরেজমিনে এই গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘরে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশদ্বারের একটি দরজা খোলা। ভিতরে তাকিয়ে দেখা গেলো পাঁচটি রিডিং টেবিল সাজানো। কোনও টেবিলের সঙ্গে চেয়ার আছে আবার কোথাও নেই। বহু খোঁজাখুঁজির প্রায় আধাঘণ্টা পর এলো কেয়ারটেকার মো. রাশেদ। জানালেন তিনি এখানেই থাকেন, কোনও পাঠক না থাকায় যাদুঘরের পাশের দোকানে ছিলেন। বীরশ্রেষ্ঠর ভাগ্নে কেয়ারটেকার রাশেদ আরও জানান, গ্রন্থাগারের বেশির ভাগ চেয়ারই নষ্ট। ভবনের ছাদ দিয়ে বর্ষার সময় পানি পড়ে। গত বর্ষায় গাছ পড়ে ভেঙে যাওয়া স্মৃতি যাদুঘরের ফুল বাগানের গ্রিল আজ পর্যন্ত মেরামত করা হয়নি। ভেঙে যাওয়া গ্রিলগুলো গ্রন্থাগারের মধ্যে স্তুপ করে রাখা হয়েছে। বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মো. মোস্তফা গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘরের মধ্যে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশ্রামাগার রয়েছে যা শুধু জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদের কর্মকর্তা বা আরও বড় কেউ গেলে খোলা হয়। বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মো. মোস্তফা কামালের ভাতিজা মো. সেলিমকে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘরের লাইব্রেরিয়ান পদে নিয়োগ দিয়েছে ভোলা জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকার সময়ের মধ্যে গিয়েও লাইব্রেরিয়ানকে পাওয়া যায়নি।

বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা যাদুঘরের অভ্যন্তর ভাগ

এ ব্যাপারে কেয়ারটেকার রাশেদ কোনও কথা বলতে রাজি হননি। স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম জানান, লাইব্রেরিয়ান সেলিমের ভোলা শহরতলীর আলতাজের রহমান কলেজে চাকরি হয়েছে। তাই এই যাদুঘরের প্রতি তার কোনও আগ্রহ নেই। লাইব্রেরিয়ানের রিজাইন লেটার তার পকেটে থাকে।

সরকারি তথ্যমতে,  বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মো. মোস্তফা ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোলার দৌলতখান উপজেলার পশ্চিম হাজীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের মার্চের মাঝামাঝি সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়ার দরুইন গ্রামে পাক বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল তিনি শহীদ হন। পরে সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। তার বাবা সেনাবাহিনীর হাবিলদার মো. হাবিবুর রহমান ২০০৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মারা যান। মা মালেকা বেগম রোগ শোক নিয়ে বেঁচে আছেন। একমাত্র মেয়ে মুক্তিও এক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা যাদুঘরের সামনের প্রস্তর ফলক

কাগজে বীরশ্রেষ্ঠর নাম মোস্তফা হলেও তার পরিবারের কাছে তার নাম মোস্তফা কামাল। বীরশ্রেষ্ঠর জন্মস্থান ভোলার পশ্চিম হাজীপুর গ্রাম মেঘনা নদীতে বিলীন হলে ১৯৮২ সালে সরকার ভোলা সদরের আলীনগর ইউনিয়নের মৌটুপি গ্রামে তার বাবা মাকে একটি একতলা বাড়ি করে দেয়। তার প্রতি সম্মান জানিয়ে মৌটুপি গ্রামের নাম মোস্তফা কামাল নগর করা হলেও এখনও মৌটুপি নামেই পরিচিত গ্রামটি। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে যে গ্রামে এই যাদুঘরটি স্থাপিত সেখানকার অনেক মানুষ এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। স্থানীয় বাসিন্দা ৬৫ বছরের মোজাম্মেল তালুকদার জানেন ’এটি স্কুলের বিল্ডিং’!

স্থানীয় আবুল খায়ের (৪০) জানান, তিনি একবার ভেতরে ঢুকে দেখেছেন আলমারির মধ্যে কিছু বই আছে।

আলীনগর স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র রাকিব, মনির, মাকসুদ জানায়, এটি গ্রন্থাগার অথচ পত্রিকা পাওয়া যায় না।

এ ব্যাপারে কেয়ারটেকার রাশেদ জানান, দুটি পত্রিকা বরাদ্দ আছে কিন্তু নিয়মিত আসে না।

আলীনগর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক জ্যোতি লাল দে জানান, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মো. মোস্তফা গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘর দেখতে অনেকেই আসেন। কিন্তু ভেতরে দেখার মতো কিছুই নাই। তার মতে, এখানে জাতির জনকের বিভিন্ন ঐতিহাসিক দুর্লভ ছবি, দেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ছবি দেয়ালে বাঁধাই করে রাখা যেতে পারে। এছাড়া অপর ছয় বীরশ্রেষ্ঠর ছবিসহ জীবনী থাকা উচিত।

বীরশ্রেষ্ঠর প্রতি সম্মান জানিয়ে ভোলার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের নাম মোস্তফা কামাল বাস টার্মিনাল করা হয়েছে। তার নামে একটি কলেজও করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য স্বাধীনতা দিবস আর বিজয় দিবস ছাড়া এ পরিবারকে স্মরণ করা হয় না। এমনকি তার মৃত্যু দিবসও পালন করা হয় না।

তবে ভোলা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম শওকত ইকবাল শাহীন জানান, একটি প্রকল্প নিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মো. মোস্তফা গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘর ভবনের সংস্কার করা হবে। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দিবসে এ যাদুঘর প্রাঙ্গনে মেলার আয়োজন করা হবে।

/বিটি/টিএন/

লাইভ

টপ