কমিশন বাণিজ্য বীমা খাতে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে: আমিনুর রহমান

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ০৭:০৫, মার্চ ২৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২৮, মার্চ ২৮, ২০১৬

মো. আমিনুর রহমানসারাবিশ্বে বীমাখাত জনপ্রিয় হলেও ভালো নেই বাংলাদেশের বীমাখাত। অসম প্রতিযোগিতা, কমিশন বাণিজ্য, প্রতারণা ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ এই খাতের সেবা নেওয়া থেকে দূরে। এর ফলে যে উদ্দেশ্যে বীমাখাতের সৃষ্টি হয়েছে, তা ব্যর্থ হতে চলেছে। এই যখন অবস্থা, তখন নিয়ম না মানার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে বীমা কোম্পানিগুলো। বর্তমানে বীমাখাতে চলছে এক ধরনের নৈরাজ্য।  বীমা খাতের এমন চিত্র তুলে ধরেছেন মার্কেন্টাইল ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুর রহমান। মতিঝিলে মার্কেন্টাইল ইন্সুরেন্স কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। 

বাংলা ট্রিবিউন: বীমা খাতের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলুন।

মো. আমিনুর রহমান: আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বীমা খাতের অবস্থা ভালো বলা চলে। কারণ, দেশের বীমা কোম্পানিগুলোর অভিভাবক বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) গঠনেরর পর বীমা খাতে  কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি বলছেন কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরেছে, তাহলে বিশৃঙ্খলাটা  কোথায়?

মো. আমিনুর রহমান: আইডিআরএ কাজ শুরু করার আগে বীমা খাতে চরম বিশৃঙ্খলা ছিল। আইডিআরএ গঠন হওয়ার পর অনেকগুলো দিক ভালো হয়েছে। তবে, কমিশন বাণিজ্য নিয়ে বর্তমানে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে।

বাংলা ট্রিবিউন: কমিশন দেওয়ার ক্ষেত্রে বা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও নিয়ম বা নীতি আছে কি না?

মো. আমিনুর রহমান: কমিশন নিয়ে বীমা শিল্পের কোম্পানিগুলোর মধ্যে এক ধরনের অসম প্রতিযোগিতা বিরাজ করছে। আইডিআরএ এর পরিমাণ নির্ধারণ করে  দিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ১৫ শতাংশের বেশি হারে কমিশন দেওয়া যাবে না। কিন্তু অধিকাংশ কোম্পানি এই নিয়ম মানছে না।

বাংলা ট্রিবিউন: কমিশন বেশি দিলে তো কোম্পানিরই লোকসান হওয়ার কথা। তাহলে দিচ্ছে কেন?

মো. আমিনুর রহমান:  প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে অনেক কোম্পানি অনৈতিকভাবে নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি কমিশন দিচ্ছে। এতে পুরো খাতের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে পড়ছে। এক ধরনের নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: নৈরাজ্য থেকে পরিত্রাণের পথ কী?

মো. আমিনুর রহমান: আগে বীমা খাতের সবাইকে বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে। তার পর সবাই মিলে এই নৈরাজ্য দুর করতে হবে। বিশেষ করে কমিশনের ক্ষেত্রে আইডিআরএ-এর বেঁধে দেওয়া ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারলে সব কোম্পানি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। বীমা খাত পরিচ্ছন্ন একটি খাত হিসাবে পরিগণিত হবে এবং এই শিল্প লাভজনক শিল্পে পরিণত হবে।

 

বাংলা ট্রিবিউন: বীমা কোম্পানিগুলো দুনীতি করার সুযোগ পায় কিভাবে?

মো. আমিনুর রহমান: আইডিআরএ নিয়ম করেছে, প্রিমিয়াম নেওয়ার সময় ক্যাশ টাকা নেওয়া যাবে না। কিন্তু অধিকাংশ কোম্পানি এই নিয়ম মানে না। বরং ক্যাশ নেওয়াতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এতে  গ্রাহক কম টাকার প্রিমিয়াম দিয়ে বেশি টাকা ভাউচার বা রশিদ নেন। পলিসি বাড়াতে কোম্পানিগুলো নির্ধারিত হারের চেয়ে কম টাকায় পলিসি করে দেন। যদিও চেক বা পে-অডারে লেনদেন করলে অনিয়ম অনেকাংশ কমে যাবে।

বাংলা ট্রিবিউন: কি কারণে বীমা খাত জনপ্রিয় করা যাচ্ছে না?

মো. আমিনুর রহমান: মুষ্টিমেয় কিছু বীমাপতির জন্যই বীমা খাত এখনও অজনপ্রিয়। কারণ, কিছু কিছু কোম্পানি কম টাকার প্রিমিয়াম নেওয়ার কারণে দাবি পূরণ করে না। অনেকে দাবি পূরণের ক্ষেত্রে বিলম্ব করে। গ্রাহকদের ভোগান্তি করে। বিশেষ করে জীবনবীমার অনেক মাঠ কর্মী আছেন, যারা প্রিমিয়ামের টাকা কোম্পানিতে জমা না দিয়ে পালিয়ে যান।

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত আলাপে মো.আমিনুর রহমান.

বাংলা ট্রিবিউন: বীমার কাছে মানুষের যাওয়া উচিত, নাকি মানুষের কাছে বীমার আসা উচিত?

মো. আমিনুর রহমান: এখনও এই খাতে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। সে কারণে বীমার কাছে মানুষ আসবে এমনটি নয়, তবে কোম্পানি ভালো হলে সেখানে মানুষের আসা উচিত।   

বাংলা ট্রিবিউন: বীমা খাতে বর্তমানে অনিয়ম কমছে, না বাড়ছে?

মো. আমিনুর রহমান: এখন বিভিন্ন কোম্পানির অনলাইন লেনদেন হওয়ার কারণে অনিয়ম বা দুর্নীতি কিছুটা কমেছে। এছাড়া, কোম্পানিগুলো বিভিন্ন ধরনের মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করেছে। এর ফলে প্রতারণার পরিমাণ এখন কমে এসেছে।   

বাংলা ট্রিবিউন: ঢাকায় এখন বীমা মেলা হচ্ছে এর প্রভাব কি পড়বে এই খাতের ওপর?

মো. আমিনুর রহমান: ঢাকায় যে বীমা মেলা হলো, এটার ফলে মানুষ বীমার প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। বীমা খাতের জন্য এটা একটা ভাল উদ্যোগ। ঢাকা শহরের মতো জেলা শহরে বা উপজেলা শহরেও বীমা মেলা হলে এই খাত  ধীরে ধীরে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। দুই দিনব্যাপী ঢাকায় যে বীমা মেলা করা হলো তা, বিভিন্ন শহরে করা গেলে জনসচেতনতা বাড়বে।

বাংলা ট্রিবিউন: বীমা খাতকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?

মো. আমিনুর রহমান: যেকোনও পলিসির মেয়াদ পুর্ণ হলে গ্রামেগঞ্জে গিয়ে যদি কোম্পানিগুলো গ্রাহকের টাকা গ্রাহকের হাতে দিয়ে আসে তাহলে, এই খাত মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ‘ভ্রাম্যমাণ দাবি নিষ্পত্তি ইউনিট’ গঠন করে হাঁটেবাজারে, পাড়ায়-মহল্লায় গিয়ে দাবি মেটালে সাধারণ মানুষ নিজেরাই এর প্রচার করবে।  

বাংলা ট্রিবিউন: বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরির প্রভাব এই খাতে পড়বে কি না?

মো. আমিনুর রহমান: না, রিজার্ভ চুরির পরও বীমা খাতে কোনও বিরূপ প্রভাব পড়বে না। কারণ, বীমা খাতে আগে থেকেই গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা বা টাকা চুরির ঘটনা ঘটেছে। বীমা খাতের গ্রাহকেরা অতীতেও প্রতারিত হয়েছেন, এখনও হচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনা এই প্রথম ঘটেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: বীমার আওতা বাড়ানোর ব্যাপারে কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

মো. আমিনুর রহমান:  ইউনিয়ন পর্যায়ে গ্রামগঞ্জে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, তাদের সবাইকে বীমার আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। ক্ষুদ্র বীমার মাধ্যমে মুদির দোকানদার বা ক্ষুদে দোকানদারকে যদি ট্রেড লাইসেন্স করা বাধ্যতামুলক করা হয় এবং প্রত্যেক ট্রেড লাইসেন্সের বিপরীতে যদি বীমা করা বাধ্যতামুলক করা হয়, তাহলে দ্রুত এই খাত প্রসার লাভ করবে।

বাংলা ট্রিবিউন:  ছোটবড় সব ব্যবসায়ীকে বীমার আওতায় আনার ব্যাপারে বীমা খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কোনও প্রস্তাব আছে কি?

মো. আমিনুর রহমান: বীমা খাতের এমডিদের পক্ষ থেকে একাধিকবার এই ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শিল্প-কলকারখানার জন্য ফায়ার ইন্সুরেন্স করা বাধ্যতামুলক হলেও সাধারণ দোকানদারদের জন্য তা বাধ্যতামূলক করা হয়নি।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ