behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

অযত্ন অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বধ্যভূমিগুলো

আনোয়ার হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ১৪:৪৭, মার্চ ৩০, ২০১৬

১

অযত্ন আর অবহেলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৭১’র বধ্যভূমিগুলো লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে যাচ্ছে। দেশ স্বাধীনের ৪৫ বছর পরেও জেলার বধ্যভূমিগুলো এখনও সংরক্ষণ ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণে নেওয়া হয়নি কোনও উদ্যোগ । এমনকি এসব বধ্যভূমির অনেকগুলোরই সীমানা প্রাচীর পর্যন্ত নেই। বিষয়টিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে জানান জেলার মুক্তিযোদ্ধারা। আর যে দু’য়েকটি স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে সেগুলো দেখভালের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। 

মুক্তিযোদ্ধারা জানান, জেলার বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণে বার বার আবেদন করা হলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা এখন পর্যন্ত কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। বছরের পর বছর শুধুই মিলেছে আশ্বাস, কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। অথচ এগুলো সংরক্ষণ ও দেখভালের দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তালেও  তারা দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন, দায়িত্ব এড়িয়ে গেছেন।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহকারী ও গবেষক অধ্যক্ষ এনামুল হক জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী সাধারণ মানুষ ও সৈনিকদের সমাধিস্থল যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং বর্তমান পর্যন্ত তা চালু রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের মুক্তিকামী ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হওয়ার পরেও তাদের বধ্যভূমি, গণকবর  এবং সমাধিস্থল ও যুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো সঠিকভাবে আজও সংরক্ষণ করা হয়নি। গড়ে ওঠেনি ওইসব স্থানগুলোতে শহীদদের স্মরণে কোনও স্মৃতিসৌধ বা শহীদ মিনার। শুধু তাই নয়, যারা এর সুফলভোগী রাজনীতিবিদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা কেউই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেয়নি। অথচ জাতীয় স্বার্থেই এসব স্থান সংরক্ষণ করা জরুরি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭১ এ পাকিস্তানি বাহিনী  তাদের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলো। আর এ নির্মমতার সাক্ষী হয়ে আছে বেশকিছু বধ্যভূমি ও গণকবর। মুক্তিযুদ্ধে এ জেলার প্রায় ৫০ হাজার মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকার-আলবদর বাহিনী। এ রকম কিছু বধ্যভূমি হলো কল্যাণপুর বিডিআর ক্যাম্প (বর্তমানে এটি ৯ বিজিবি’র মেইন ক্যাম্প), শশ্মানঘাট বধ্যভূমি, পুরাতন জেলখানা, নয়াগোলা, ইসলামপুর, হুজরাপুর, সোনামসজিদ-বালিয়াদীঘি গণকবর, শিবগঞ্জের বিনোদপুর, কলাবাড়ি, মনাকষায় হুমায়ন রেজা উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনের আমবাগানে অবস্থিত বধ্যভূমি, আদিনা ফজলুল হক কলেজ সংলগ্ন বাগান, খাসেরহাট, দোরশিয়া,  রানিহাটি,  আলীনগর বাঙ্গাবাড়ি গণকবর, বোয়ালিয়া ও রহনপুর সমাধিস্থল ।

সোনামসজিদ-বালিয়াদীঘি গণকবর

জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বালিয়াদীঘি এলাকায় ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ রাইফেলস, রাজশাহী সেক্টর নির্মিত ‘জীবনযুদ্ধে বিজয়ের শহীদ স্মারক স্তম্ভটি’ সঠিকভাবে দেখভালের অভাবে জরার্জীর্ণ হয়ে পড়ছে। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিটের কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম জানান, বর্তমানে এই গণকবরটির আশেপাশের  জায়গাগুলো বেদখল হয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত। বর্তমানে স্থানীয়রা এখানে সাধারণ মানুষের লাশ কবর দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

৪

বিনোদপুর শহীদ মিনার

১৯৭১ সালের ৬ অক্টোবর রাজাকার-আলবদরদের সহায়তায় শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের চানশিকারী, লছমনপুর ও এবাদত বিশ্বাসের টোলা গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে ৩৯জন মানুষকে ধরে নিয়ে বিনোদপুর উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পে নিয়ে আসে পাকিস্তানি সেনারা। বিদ্যালয়ের মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের গুলি করে হত্যা করে মাঠের দক্ষিণ পাশে মাটিতে লাশগুলো পুঁতে রাখে তারা। পরবর্তীতে ৭২ সালে এ স্থানে ৩৯জন শহীদদের স্মরণে একটি শহীদ মিনার তৈরি করা হয়। বর্তমানে জরার্জীর্ণ অবস্থায় রয়েছে শহীদ মিনারটি। এটি সংস্কারের দাবি করেছেন শহীদ পরিবারের লোকজন ও স্থানীয়রা। 

রহনপুর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর 

গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর রেল স্টেশনের পাশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১১ পদাতিক ডিভিশন নির্মিত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিসৌধটির সীমানা প্রাচীরের ভেতরের অংশ ঝোঁপঝাড় আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে আছে। জমেছে নানা আবর্জনার স্তুপ। বেদিতে স্থানীয়রা নিয়মিত জ্বালানি খড়ি-কাঠ শুকায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ১০ হাজার সাধারণ মানুষকে এই বধ্যভূমিতে বিভিন্ন সময় ধরে এনে হত্যা করা হয়েছিল। এছাড়াও রহনপুর সরকারি এবি উচ্চ বিদ্যালয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পে শত শত মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হয়।

রেহাইচর শশ্মান ঘাট বধ্যভূমি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহানন্দা নদী তীরবর্তী শশ্মানঘাট বধ্যভূমিটি সংরক্ষণে আজও নেওয়া হয়নি কোনও উদ্যোগ। এমনকি আজ পর্যন্ত চিহ্নিতও করা হয়নি এর জায়গা। শশ্মানঘাট শশ্মান হয়েই আছে। অথচ ৬ থেকে ৭ হাজার মানুষকে এখানে ধরে এনে হত্যা করা হয় বলে জানায় মুক্তিযোদ্ধারা।

দোরশিয়া বধ্যভূমি

৭১ সালের ১০ অক্টোবর দোরশিয়া এলাকার ৩৯ জনসহ আশেপাশের গ্রামের আরও ২০ জন সাধারণ মানুষকে ধরে এনে হত্যা করেছিলো পাকিস্তানি হানাদাররা। সেদিনের ওই ঘটনায় শহীদ ৫৯ জনের লাশ সমাহিত করা হয়। অথচ এত বছর পরও এই বধ্যভূমিটি সংরক্ষণে নেওয়া হয়নি কোনও উদ্যোগ।

ইসলামপুর বধ্যভূমি

সদর উপজেলার ইসলামপুরে ৭১ সালের ১০ অক্টোবর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদররা ২ শতাধিক মানুষকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করে। যাদের মধ্যে পরবর্তীতে ১৩৬ জনের পরিচয় পাওয়া গেলেও বাকিদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। সেদিন ইসলামপুরের পিয়ার বিশ্বাসের ঘাট, বালিয়াঘাটা ও সাহেবের ঘাট এলাকার বাড়িঘরসহ পুড়িয়ে দেওয়া হয় সবকিছু।

পরবর্তীতে এই স্থানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণে সরকারের কাছে বেশ কয়েকবার আবেদন করেও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। আজ পর্যন্ত এমনকি ১০ অক্টোবরে শহীদদের স্মরণে এখানে কোনও স্মরণসভাও অনুষ্ঠিত হয় না।

৫

বোয়ালিয়া গণকবর

গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়ায় যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ সেপ্টেম্বর ওই এলাকার ২শতাধিক সাধারণ মানুষকে গণহত্যা করা হয়েছিল। যাদের মধ্যে ১৫২ জনের নাম পরিচয় জানা গেলেও বাকিদের পাওয়া যায়নি। সেদিন ধর্ষিত হয়েছিল ওই এলাকার বহু নারী। সম্প্রতি ৪১ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে খেতাব দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়। যার মধ্যে ১১ জনই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার। যাদের মধ্যে ৯ জনের বাড়ি গোমস্তাপুর উপজেলার এই বোয়ালিয়া ইউনিয়নে। পরবর্তীতে এখানে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দেখভালের অভাবে সেটিও দিন দিন জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে।

এছাড়াও জেলায় অন্য যেসব বধ্যভূমি রয়েছে সেগুলোর বেশিরভাগই সংরক্ষণে নেওয়া হয়নি কোনও উদ্যোগ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম ৭১’র সেইসব স্মৃতি মনে করতে গিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সেইসব দিনের পৈশাচিকতা এখনও স্মৃতিতে ভয়াল রূপ নিয়ে ফিরে আসে প্রতিবছর। তিনি বলেন, উপজেলায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম সংরক্ষণসহ বধ্যভূমি সংরক্ষণ ব্যবস্থা আজও করা হয়নি। থানার মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্নভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সরকারের কাছে এ মুক্তিযোদ্ধার চাওয়া যারা মুক্তিযুদ্ধ না করেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় যাদের নাম আছে এবং সরকারি সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের চাকরি কোটা, সম্মানীভাতা ও তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হউক। এতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হকের কবরটি সম্প্রতি চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে একটি নামফলক টানানো হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে। কিন্তু সেটি আজও অরক্ষিত আছে। কবরটি সংরক্ষণে মৌখিক ও লিখিতভাবে বারবার সরকারের কাছে আবেদন করেও এখনো বাঁধানো হয়নি। এই কবরটি সংরক্ষণে  সরকারের কাছে জোর দাবি জানান মুক্তিযোদ্ধাসহ শহীদ শামসুল হকের মাতা মালেকা বেগম।

৩

শহীদদের তালিকা 

মুক্তিযুদ্ধে জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরের সামনে একটি তালিকা স্তম্ভ করা হলেও এখনও এ তালিকায় অনেকের নাম বাকি আছে। মুক্তিযোদ্ধারা জানান, অনেকের তালিকায় এখনও নাম উঠেনি। অনেকের কবরগুলো সংরক্ষণে নেওয়া হয়নি আজও কোনও উদ্যোগ।

যেভাবে শহীদদের স্মরণ করা হয়

শহীদদের স্মরণে ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং স্মরণসভা ছাড়া আর তেমন কোনও অনুষ্ঠান পালিত হয় না। এমনকি শহীদ পরিবারগুলোর খোঁজখবর ও দেখভালও করা হয় না।

মুক্তিযোদ্ধাদের চাওয়া 

জেলার মুক্তিযোদ্ধার জানান, ‘কোনও কিছু প্রাপ্তির জন্য নয়, দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছি। যা ছিল পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ ও বঞ্চনার অবসানের সর্ববৃহৎ পদক্ষেপ। তারা বলেন, ৪৫ বছর পরও রাজাকারদের তালিকা হয় নাই। অথচ বার বার দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির নামে হয়রানি ও অসম্মান করা হচ্ছে।

আবেগ তাড়িত কণ্ঠে মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, বঙ্গবন্ধু সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে তোমরা শত্রুর মোকাবেলা করো। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, বারবার সরকার বদলাবে আর নতুন নতুন তালিকা করা হবে, আর চলবে যাচাই-বাছাইয়ের নামে প্রহসন। এই প্রহসন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তির দাবিও জানান তারা।

২

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহকারী ও গবেষক অধ্যক্ষ এনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা রাজনৈতিক, শারীরিক এবং অর্থনৈতিকভাবে মার খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জামায়াতদের কোনও দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগের মধ্যে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব বেশি। এখানে প্রকৃত যারা মাঠকর্মী তাদের হেনস্তা করা হচ্ছে স্বাধীনতা বিরোধী লোকজনের দ্বারা। আর এটা করছে নব্য আওয়ামী লীগাররাই। এ বিষয়ে তাই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত হস্তক্ষেপ কামনা করেন এই বর্ষীয়ান যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা।

/এআর/টিএন/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ