behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

তনু ধর্ষণ-হত্যার বিচার চাইবো কেন?

মোজাফ্ফর হোসেন১৭:১৮, মার্চ ৩০, ২০১৬

মোজাফ্ফর হোসেনকুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণ শেষে হত্যার ঘটনা নিয়ে সমগ্র দেশ এখন উত্তাল। জাত-ধর্ম-রাজনীতি সবরকমের ভেদাভেদ ভুলে একমঞ্চে দাঁড়িয়ে এই ধর্ষণ ও হত্যার বিচার চাইছে জনগণ। রাজপথে নেমে এসেছে দেশের লাখ লাখ জনতা। সর্বস্তরের মানুষ লংমার্চ-মানববন্ধনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলত শাস্তির দাবি নিয়ে। ফলে কিছুটা আড়ালে পড়ে গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা। এতবড় ঘটনার কোনও গ্রহণযোগ্য উত্তর উদ্ধার করতে পারেনি আমাদের ‘স্কিলড’ তদন্ত কমিটি! আন্দোলনের মুখে এগিয়ে যাচ্ছে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎপ্রকল্প। সেটি নিয়েও আমরা আপাতত ভাবছি না। যে বিষয়টি নিয়ে আমরা এখন ভাবছি, সেটি অতি মানবিক-মর্মস্পশী এবং আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন সেখানে জড়িয়ে, সে কারণে না ভেবে পারা যাচ্ছে না।
কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো তনুর ধর্ষণ এবং ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের জন্যে দেশবাসীর এভাবে মরিয়া হয়ে বিচার চাইতে হবে কেন? বাংলাদেশের আইনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী-২০০৩)-এর ধারা ৯-তে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে:
ক. যদি কোনও পুরুষ কোনও নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।
খ. যদি কোনও ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা ওই ধর্ষণ-পরবর্তী তার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহলে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।
গ. যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনও নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে ওই নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহলে ওই দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অতিরিক্ত এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। [সূত্র: দৈনিক সমকাল]
অর্থাৎ একটা সচল ও গ্রহণযোগ্য আইন দেশে আছে আর সেটি কার্যকর করার জন্যে দেশে একটি ‘শক্তিশালী’ ও ‘দায়িত্বশীল’ প্রশাসন আছে। তাদের কাজই হলো- সকল দোষীকে ধরে এই আইনের আওতায় আনা। এজন্যে তাদের পেছনে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়। বলাই বাহুল্য সে সবই জনগণের অর্থ, দেশের সম্পদ। এখন আমার প্রশ্ন হলো, যেখানে ধর্ষণ ও খুন দুটিই আলাদা করে সর্বোচ্চ অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, সেখানে তনুকে ধর্ষণ ও খুনের পেছনে দায়ী আসামীরা নিশ্চয় ছাড় পাওয়া কথা না। প্রশাসনও বলছে দ্রুত তাদের ধরে দৃষ্টান্তমূলত শাস্তির আওতায় আনা হবে। তারপরও মানুষ রাজপথে নেমে এই নির্মম ঘটনার পেছনে জড়িতদের বিচার চাইছে। দেশের আইন ও প্রশাসনের বক্তব্য জেনেও জনগণ এই গরমে কাজকাম ছেড়ে রাজপথে নামছে; কিন্তু কেন? তনু কি সকলের আত্মীয়, পরিচিত জন? নিশ্চয়ই না। তাহলে যারা নামছে তারা কি তনুকে ইস্যু করে এই সরকারের পতন চাইছে? আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে ‘মটিভেটেড’ হচ্ছে? তাও না। কারণ দৃশ্যত এই আন্দোলন এখন গণআন্দোলন। আওয়ামী লীগের বিবেকবান নেতা-সমর্থকরা এই আন্দোলনের সঙ্গে আছেন। তাছাড়া তনুর এই ঘটনা দিয়েই কেউ সরকারে চূড়ান্ত ব্যর্থতা-সফলতা নির্ণয় করতে যাচ্ছে না।

সকলে একাট্টা হয়ে এই ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার চাইছে কারণ জনগণ আমাদের আইনি প্রক্রিয়ার ফাঁকটা জেনে গেছে। তারা জানে, এর সঙ্গে রাজনৈতিক মহল জড়িত থাকলে এই ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেবে। যেহেতু ঘটনাটি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ঘটেছে, ‘রক্ষক’র বুকের ভেতর ‘ভক্ষক’র কবলে পড়েছে তনু, তাই এটিকে দমিয়ে রাখার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। জনগণ এসবই জানে, তাই তারা দেশে আইন থাকলেও প্রশাসন থাকলেও, প্রশাসন প্রতিশ্রুতি দিলেও, ভরসা পাচ্ছে না। একটি দেশের জনগণ যখন ধর্ষণ এবং খুনের বিচার চেয়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়, তখন সেই দেশের বিচার ব্যবস্থা ও আইনি প্রক্রিয়া যে কোন পথে চলছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।   

জনগণের এই দাবিতে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে কিনা কী জানি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন (২৭ মার্চ ২০১৬) কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বললেন, বাঙালিকে খুশি করা কষ্টকর। যত পায়, তত চায়। তিনি শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে কথাটা বললেও আমার মনে হচ্ছে একটা ইঙ্গিত এখানেও ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলছি, ইতিহাস কিন্তু উল্টো কথা বলে। অতি অল্পতে তুষ্ট থাকার জাতি হলো বাঙালি জাতি। এই জাতির চাওয়াটা খুব বড় কিছু না। তারা বলছে না, রাতারাতি দুর্নীতি দূর হোক, তারা দুর্নীতি পরায়ণ রাজনীতিবিদদের অপসারণের দাবিও তোলেনি। ঘুষ, অর্থ-কেলেঙ্কারি, চাঁদাবাজি এসব দেশে নিত্যদিনের ঘটনা। এসব নিয়েও কোনও উচ্চবাচ্য করছে না কেউ। তাদের এই মুহূর্তের দাবি তনুর ধর্ষণকারী ও হত্যাকারীদের সনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার। তনুর এই ঘটনার পর দেশে আরও বেশ কয়েকজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। রাজশাহীতে বিয়ের প্রলোভনে এক কিশোরীকে কৌশলে হোটেলে নিয়ে দলবেঁধে ধর্ষণ করেছে কথিত প্রেমিকসহ তার সঙ্গীরা। গাজীপুরে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করেছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর ফরেস্ট গেট এলাকায় অটোরিকশা যাত্রী চিকিৎসককে ধর্ষণের চেষ্টা চালিয়েছে। ফরিদপুরে প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। কামরাঙ্গীরচরে ৬ষ্ঠ শ্রেণির এক শিশুকে ধর্ষণ করেছে জামাল উদ্দিন নামের এক বৃদ্ধ। বিয়ের প্রলোভনে গাইবান্ধা সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুরে এক গৃহবধূকে গণ-ধর্ষণ করেছে দুর্বৃত্তরা। ফেনীতে চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে পাওয়া গেছে। [তথ্যসূত্র: খবরের কাগজ]

এত এত ধর্ষণের ঘটনা। দেশবাসী কিন্তু সবগুলোর কথা তুলে আপনাকে বা আপনার প্রশাসনকে বিরক্ত করছে না। তারা তনুর জন্যে মাঠে নেমেছে। তনু এখন একটা প্রতীকী নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই একটি বিচার আপনি দ্রুত কার্যকর করে জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারেন। ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে বলে ‘কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের হয়ে আসতে পারে’ ভেবে পিছু হটার কোনও কারণ নেই।

আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনগণের অতি কাছের নেত্রী (তিনি নারী বলে, একজন মা বলে, ঘটনাটি বেশি গুরুত্ব পাবে, পুরুষ হলে পেতো না, এমনটি আমি ভাবতে চাই না)। সর্বোপরি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা। তার কাছে এই নির্মম ধর্ষণ ও খুনের বিচার চেয়ে কেন রাজপথে নামতে হবে? একাত্তরে একই অপরাধ সংগঠিত করার জন্য তো তিনি দেশে-বিদেশের নানা বাধা জটিলতা অতিক্রম করে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর করেছেন। তাহলে তার কাছে তনু হত্যার বিচার চেয়ে রাজপথে নামতে হবে কেন? তাছাড়া তিনি স্পষ্টভাবে বিএনপির চেয়ে নিজেকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে চান। ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে পুলিশ কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়ে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করে ইয়াসমিন নামের এক কিশোরী। প্রতিবাদে আন্দোলনে ফেটে পড়ে সারা দেশ। পুলিশ ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে ব্যর্থ হয়ে জনতার আন্দোলনে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে আন্দোলনরত আরও ৭ জনকে শহীদ হতে হয়। এক ইয়াসমিনের হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে আরও সাতজনকে প্রাণ দিতে হয়। তবুও সরকার ও প্রশাসনের টনক নড়েনি। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি। দুইজন পাশবিক ধর্ষক ও নৃশংস নিষ্ঠুর খুনিকে বাঁচানোর জন্য সরকার অপরাধীর পক্ষ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে কোনও সুফল পাইনি। এক্ষেত্রে তনু হত্যার উপযুক্ত ট্রিটমেন্ট করে বর্তমান সরকার কাজের মাধ্যমে বিএনপি থেকে নিজেদের আরও আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারে। সেই সুযোগ আছে কিন্তু!

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ