প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির ফাঁসিতে যে কারণে চুপ ছাত্রশিবির

সালমান তারেক শাকিল
০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ২২:৫৯আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০০:১৮

 

মীর কাসেম আলী

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের পরও চুপ রয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাতে কাশিমপুর কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলেও ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি কার্যত কোনও কর্মসূচি নেয়নি। এদিকে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে আদালতের রায় প্রকাশ ও রায় কার্যকর করার পর সারাদেশে নাশকতা করে শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ সময় দেশ-বিদেশে সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সহস্রাধিক মামলা হয়। গ্রেফতার-আটক করা হয় অনেককে। এসব কারণে গত এক বছরের বেশি সময় ধরেই সারা দেশে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় সংগঠনটি। একইসঙ্গে জামায়াতের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় রাজপথে সক্রিয় হয়নি শিবির। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি প্রতিকূলে থাকায় সাংগঠনিক পরিচয়ে কোনও রকম বিক্ষোভ-সমাবেশ করা থেকে বিরত থাকে ছাত্র শিবির। সোমবার দিবাগত রাতে ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় ও সাবেক কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয়ে জানা গেছে।

এদিকে গত দুই বছরে জঙ্গিদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে, জঙ্গিবাদের সঙ্গে শিবির জড়িত। সর্বশেষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জঙ্গি সংগঠনের পাশাপাশি শিবির নিষিদ্ধ করার কথাও জানান। মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টিকে ইস্যু কেন্দ্র করে হরতাল-বিক্ষোভ করে সরকারের রোষানলে পড়তে চায় না জামায়াত। ক্ষমতাসীনদের না চটিয়ে জামায়াত কিভাবে রাজনৈতিকভাবে টিকতে থাকতে পারে, সে চিন্তাও রয়েছে দলটির ভেতর।  এ কারণেও মীর কাসেমের ফাঁসির প্রতিবাদে শিবিরকে কোনও রকম আন্দোলন করার অনুমতি দেয়নি জামায়াত।

জানা গেছে, জামায়াতের সর্বশেষ সংশোধিত গঠনতন্ত্রের ধারা ৬ এ স্থায়ী কর্মসূচি আছে ৪টি। এর মধ্যে চতুর্থ নম্বরটি হচ্ছে, ‘গণতান্ত্রিক পন্থায় সরকার পরিবর্তন এবং সমাজের সর্বস্তরে- সৎ ও চরিত্রবান লোকের নেতৃত্ত্ব কায়েমের চেষ্টা করা।’ এক বছরের বেশি আগে দলের নীতিনির্ধারকরা এই কর্মসূচিকে স্থগিত রেখেছেন। সরকারের কঠোর অবস্থান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির কারণে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়নি জামায়াত-শিবির।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর জামায়াতের পল্টন শাখার এক কর্মী, শিবিরের ঢাকা আলিয়ার সাবেক বায়তুল মাল সম্পাদক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘সাংগঠনিকভাবে একটা টোকা দেওয়াও নিষেধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা আছে জামায়াতের পক্ষ থেকে।’

জানা গেছে, ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সভাপতি ছিলেন আলবদর নেতা মীর কাসেম আলী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। ১৯৭৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং ক্ষমতার পালাবদলের পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপরই ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন ৭১-এর আগে ছাত্রসংঘের এই কেন্দ্রীয় নেতা।

সোমবার আধাবেলা হরতালে জামায়াতের ব্যানারে ঝটিকা বিক্ষোভ করেছে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। তবে রাজপথে নিষ্ক্রিয় থাকলেও নিজেদের উদ্যোগে কয়েকটি দোয়া-মাহফিল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাসের মাধ্যমেই দায় সেরেছে ছাত্রশিবির।
ছাত্রশিবিরের একাধিক সাবেক দায়িত্বশীলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিষয়টি তাদের কাছেও ‘অবাক লেগেছে। তারা মনে করেন, ‘মীর কাসেম আলীর মৃত্যুতে অন্তত বিক্ষোভ করার প্রয়োজন ছিল।’ তারা দোয়া মাহফিলেই দায় মিটিয়েছে বলেই মনে করেন একাধিক সাবেক শিবির নেতা।

ছাত্রশিবিরের সাবেক এক প্রচার সম্পাদক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভালো বিষয় ধরেছেন। আসলেই তো, এটা খেয়ালই করিনি।’

বর্তমানে জামায়াতের ধানমণ্ডি-মোহাম্মদপুর অঞ্চলের একজন দায়িত্বশীল, যিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিবিরের দায়িত্বশীল ছিলেন; তিনি বলেন, ‘ঠিক আছে, আপনার কথায় কিছুটা যুক্তি আছে। তবে, এটা তো জানেন, যে শিবির এখন রাজপথে মিছিল করলেই সরকার চড়াও হবে।’

জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার প্রভাবশালী এই সদস্য আরও বলেন, ‘উনি জামায়াতের নেতা অবস্থায় মারা গেলেও উনি শুধু শিবিরের নেতাই। ছাত্রশিবিরের উত্থান-পতন সব কিছুই উনার হাত ধরে এসেছে। এখন যারা জামায়াতের প্রভাবশালী নেতা, তারা প্রত্যেকেই তার অনুজ। শিবিরের সাবেক নেতা। ফলে, জামায়াত বলা মানেই তো শিবির বলা।’
গত শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাতে মীর কাসেমের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর রবিবার সারা দেশে দোয়া মাহফিল করে শিবির। এই কর্মসূচিও ছিল জামায়াত ঘোষিত। একই দিন সকালে সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত বিবৃতি পাঠানো হয়। ওই বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল ইয়াসিন আরাফাত বলেছেন, ‘আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করছি, সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে হলেও  মীর কাসেম আলীর রেখে যাওয়া বিজয়ের কাজকে সম্পূর্ণ করতে আমরা দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ। মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে যারা ইসলামি আন্দোলনকে নেতৃত্বশূন্য করার স্বপ্ন দেখছে, তাদের সে স্বপ্ন কখনোই পূরণ হবে না। মীর কাসেম আলীর প্রতি ফোঁটা রক্ত এ দেশের ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী জনগণকে উজ্জীবিত করবে।’

সচরাচর শিবিরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নানা ধরনের কঠোর বক্তব্য থাকলেও মীর কাসেমের ফাঁসির প্রতিক্রিয়াটি অনেকটাই ‘নরম’ ছিল বলে মনে করছেন ছাত্রশিবিরের প্রবাসী এক নেতা। কাতারে বসবাসরত এই নেতার যুক্তি, ‘একটা ভালো মন্তব্য নেই। আর কর্মসূচি তো হাতেই নেয়নি শিবির।’

বিষয়টি নিয়ে ছাত্র শিবিরের বর্তমান দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সঙ্গে মোবাইল ও ফেসবুকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনও সাড়া দেননি। যদিও সাবেক নেতাদের মধ্যে সাবেক সভাপতি সেলিম উদ্দীন ও ড. রেজাউল করিম, তুরস্কপ্রবাসী সাবেক প্রচার সম্পাদক আবু সালেহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া ফেসবুকে লেখালেখি করছেন। মীর কাসেম আলী বিষয়ে নানা বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন নিয়মিত।

দেশের বাইরে শিবির নেতাদের প্রতিক্রিয়া

বাইরের কয়েকটি দেশে প্রতিবাদ করেছেন ছাত্র শিবিরের সাবেক নেতারা। রবিবার কাতারের একটি মসজিদে মীর কাসেমের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ওই জানাজায় বক্তব্য দেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি হামিদ হোসাইন আজাদ।

লন্ডনেও অনুষ্ঠিত হয়েছে গায়েবানা জানাজা। ওই জানাজায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ও জামায়াত-সমর্থক মাওলানা তারেক মনোয়ার বক্তব্য রাখেন।

আবদুর রাজ্জাক ওই জানাজা-পূর্ব বক্তব্যে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনের অগ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় মীর কাসেমকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে মিথ্যা অভিযোগে তাকে হত্যা করেছে। অবৈধ ক্ষমতাকে দীর্ঘ করতেই সরকার জামায়াত নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করছে।’

টিভি উপস্থাপক তারেক মনোয়ার বলেন, ‘আমি কাসেম আলী মিন্টুকে গত ত্রিশ বছর ধরে দেখেছি, তিনি জীবনে তাহাজ্জুতের নামাজ ছাড়েননি।’

প্রবাসে অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় ছোট ভাই মীর মাসুম আলী বলেন, ‘মীর কাসেম আলী যখন ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠা করেন, তখন হাতেগোনা কয়েকজন ছিলেন। এখন কয়েক লাখ নেতাকর্মী রেডি হয়ে আছেন বাংলাদেশকে তৈরি করার জন্য।’

 আরও পড়ুন: 'তুরস্কের মন্তব্য অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল'

/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
প্রবাসীসহ সব বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা দেবে সরকার
প্রবাসীসহ সব বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা দেবে সরকার
সব দলকে রাজনীতি করতে দিতে চায় বিএনপি, এর মধ্যে আ.লীগ কি আছে?
সব দলকে রাজনীতি করতে দিতে চায় বিএনপি, এর মধ্যে আ.লীগ কি আছে?
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
কৃষিকে আধুনিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী
কৃষিকে আধুনিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী