অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিপর্যস্ত সিলেট বিভাগ বিএনপি

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ১৬:৫৩, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৩০, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮

সিলেট বিএনপিএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যেই ঘর গোছাতে শুরু করেছে। এরই অংশ  হিসেবে  দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে সারাদেশের নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসনে বহুমুখী উদ্যোগও নিচ্ছে দলগুলো। অথচ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসারও পরও সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সারা দেশের নেতাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের নিরসন হয়নি এখনও। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দলে রয়েছে সিলেট বিভাগের বিএনপিতেও। এই বিভাগে দলটির ৫টি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। এরমধ্যে তিন জেলায় নেতায়-নেতায় দ্বন্দ্ব চরমে। কোথাও কোথাও পূর্ণাঙ্গ কমিটিই হয়নি। একাধিক কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সম্মেলন হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে। তবে, অভ্যন্তরীণ এই দ্বন্দ্ব আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন জেলা নেতারা।

আংশিক কমিটি দিয়ে চলছে সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি

২০১৭ সালের ২৬ মে ৫১ সদস্যের আংশিক কমিটি হয় সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির। এরপর ১৫ মাস পার হয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। জেলার আওতাধীন ১১টি  উপজেলা ও  ৪টি পৌরসভার কমিটির মেয়াদও শেষ।  এসব বিষয়ে জেলা সভাপতি কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন বলেন,  ‘দলের অভ্যন্তরীণ যেন কোনও বিভেদ সৃষ্টি না হয়, সেজন্য সবার মত নিয়ে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার কাজ চলছে। তাই দেরি হচ্ছে।’

উপজেলা ও পৌর কমিটি নিয়ে কলিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সব জায়গায় কমিটি আছে। ৫ থেকে ৬টি উপজেলা ও পৌরসভার আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির এখনও মেয়াদ শেষ হয়নি।’

তবে, স্থানীয় একটি সূত্রে জানায়—জেলার আওতাধীন ১৬টি সাংগঠনিক ইউটিনের মধ্যে বর্তমান জেলা কমিটি শুধু তাহিরপুর উপজেলার কমিটি দিয়েছে। আর ১৫টি সাংগঠনিক ইউনিটের কমিটি মেয়াদ শেষ।

জামালগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কমিটি হয়েছে ২০১৫ সালে। এই কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও জেলা কমিটির মেয়াদ থাকায় সম্মেলন করা যাচ্ছে না।’

জানা গেছে, সুনামগঞ্জ জেলা ৫টি সংসদীয় আসন রয়েছে। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ-৪ আসন আগামী নির্বাচনে মনোনয় নিয়ে জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুল হকের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তারা দুই জনের কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি।

৫ বছর ধরে কমিটি নেই হবিগঞ্জ জেলার,  নেতায় নেতায় দ্বন্দ্ব

২০১১ সালের ২৬ এপ্রিল সৈয়দ মো. ফয়সাল সভাপতি ও জিকে গউছকে সাধারণ সম্পাদক করে হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির কমিটি করা হয়। ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে কমিটি হয়নি। কমিটি না থাকলেও তিনটি অংশে বিভক্ত জেলার রাজনীতি। এরমধ্যে এক অংশের নেতৃত্বে দেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাক জিকে গউছ। অন্য গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক সেলিম। এছাড়া আরও একটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রশীদ এমরান। তবে, তিনি দীর্ঘদিন আমেরিকায় থাকায় তার গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন দলীয় মনোনয়-প্রত্যাশী জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. আহমদুর রহমান আব্দাল।

এ বিষয়ে জেলা সভাপতি মো. ফয়সাল দেশের বাইরে থাকা কোনও মন্তব্য নেওয়া যায়নি। আর সাধারণ সম্পাদক গউছের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি ফোন ধরেননি। তবে জেলা সাংগঠনি সম্পাদক এনামুল হক সেলিম বলেন, ‘সরকারের নিপীড়ন আর আমাদের কিছু অগণতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে কমিটি মেয়াদ শেষ হলেও নতুন কমিটি দেওয়া যায়নি। আশা করি, শিগগিরই সম্মেলন করে কমিটি দেওয়া হবে।’

আর দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়ে এনামুল হক সেলিম বলেন, ‘বড় দলের মধ্যে একটু দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। এটাকে আমি নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা বলবো। তবে দলের প্রয়োজনে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ আছি।’

একই কথা বললেন হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ডা. আহমদুর রহমান আব্দাল। তিনি বলেন, ‘এসব দ্বন্দ্ব আগামী নির্বাচনে কোনও প্রভাব ফেলবে না।’

প্রসঙ্গত, হবিগঞ্জ জেলায় ৪টি সংসদীয় আসন রয়েছে। এ বিষয়ে সেলিম বলেন, ‘প্রতিটি আসনের নির্বাচনের প্রস্তুতি আছে আমাদের। তবে, আমরা খালেদা জিয়াকে ছাড়া কোনও নির্বাচনে যাবো না। কোনও নির্বাচন হতেও দেবো না। দল যদি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আমি নিজেও হবিগঞ্জ-৩ আসনে প্রার্থী হবো।’

মৌলভীবাজার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দ্বন্দ্ব চরমে

২০১৭ সালের ২৭ মে ৪৮ সদস্য বিশিষ্ট মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির কমিটি করা হয়। এরপর দেড় বছর পার হলেও কমিটির সভাপতি এম নাছের রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজানের দ্বন্দ্বে পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটি হয়নি। এই কারণে জেলা বিএনপি সাংগঠনিক কার্যক্রমও নেই।’

এ বিষয়ে জেলা সভাপতি এম নাছের রহমান বলেন, ‘জেলা সাধারণ সম্পাদকের প্রতি ৪৮ সদস্যের কমিটির ৩২ জন্য অনাস্থা জানিয়েছে। এই কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা যাচ্ছে না। এ বিষয়টি আমরা দলীয় হাইকমান্ডকে জানিয়েছি।’

আর সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান বলেন, ‘জেলা সভাপতি আমাকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মানেন না। তাহলে কীভাবে কমিটি পূর্ণাঙ্গ হবে। আমি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিষয়টি জানিয়েছি। এই কারণে জেলা রাজনীতিও তেমন একটা হচ্ছে না।’

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এই জেলার ৪টি উপজেলা ও ৫টি পৌরসভা বিএনপির সব কমিটির মেয়াদ শেষ। তবে জেলা সভাপতি বলেছেন, কমিটি মেয়াদ শেষ, তা কোনও সমস্যা নেই। তবে সব সাংগঠনিক ইউনিটের কার্যক্রম চলছে।     

গঠনতন্ত্র বহির্ভূত সিলেট জেলা বিএনপি

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা কমিটি হবে ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট। কিন্তু সিলেট জেলা বিএনপির কমিটি ২৩০ সদস্য বিশিষ্ট। গঠনতন্ত্র বহির্ভূত কমিটি করা নিয়ে জেলা কমিটির নেতারা বলছেন, সবার মন রক্ষা করতে গিয়ে কমিটির আকার বাড়াতে হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম বলেন, ‘সংগঠনের প্রয়োজনে গঠনতন্ত্র বহির্ভূত কমিটি করতে হয়েছে। আর তা আমরা কেন্দ্রীয় বিএনপিকে জানিয়ে করেছি।’   

সিলেট জেলার আওতাধীন ১৩টি উপজেলা ও ৪টি পৌরসভার বিএনপির কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আবুল কাহের বলেন, ‘গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কমিটির মেয়াদ দুই বছর। সেই হিসাবে এসব কমিটির মেয়াদ শেষ। কিন্তু গঠনতন্ত্র তো আর বাইবেল নয়। দলের প্রয়োজনে ও আগামী দিনের আন্দোলনের বিষয়টি চিন্তা করে নতুন করে কমিটি হচ্ছে না। সময়মতো সব কমিটি হবে।’

সিলেট মহানগর বিএনপিতে  দ্বন্দ্ব,  গঠনতন্ত্র বহির্ভূত কমিটি

২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি সিলেট মহানগর বিএনপির সম্মেলন হয়। যদিও ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এখানেও গঠনতন্ত্র বহির্ভূত কমিটি করা হয়েছে। বর্তমানে সিলেট মহানগর কমিটি ২৩৭ সদস্য বিশিষ্ট। এ বিষয়ে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসেন বলেন, ‘সংগঠনের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে খালেদা জিয়ার অনুমতি নিয়ে কমিটির আকার বাড়ানো হয়েছে।’

জানা গেছে, সিলেট মহানগর বিএনপির মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। এই দ্বন্দ্বের একটা অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছে মহানগর বিএনপির  সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী। তিনি নিজের বলয় নিয়ে আলাদা থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, ‘এটা ঠিক নয়। আমাদের মধ্যে তেমন কোনও দ্বন্দ্ব নেই।’

আর মহানগর সভাপতি নাসিম হোসেন বলেন, ‘এখানে তেমন কোনও দ্বন্দ্ব নেই দলের মধ্যে। ব্যক্তিগতভাবে হয়তো কেউ কেউ নিষ্ক্রিয় রয়েছেন।’

সিলেট মহানগর বিএনপির ২৭ টি সাংগঠনিক ইউনিট রয়েছে। তবে এসব ইউনিট কমিটির মেয়াদ শেষ। বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে নাসিম হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের আগে দলের মধ্যে কোনও বিভেদ যেন না হয়,  এজন্য এসব ইউনিটের কমিটি করা হচ্ছে না। তবে নির্বাচনের পরে কমিটি করা হবে।’

প্রসঙ্গত, সিলেট জেলায় ৬টি সংসদীয় আসন রয়েছে। এসব আসনে দলীয়ভাবে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা নিজেদের মতো প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সিলেট জেলার রাজনীতি প্রসঙ্গে জকিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘সিলেটে উচ্চ পর্যায়ে তেমন কোনও দ্বন্দ্ব নেই। তবে, সিলেট সিটি নির্বাচনের পরে ছাত্রদলের এক নেতা নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছুটা ক্ষোভ রয়েছে।’

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ