পাঁচ কারণে বৈধ প্রার্থীরও মনোনয়ন বাতিল চেয়ে আপিল

Send
এমরান হোসাইন শেখ
প্রকাশিত : ২২:২০, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২২, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৮

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৈধ প্রার্থীদেরও মনোনয়ন বাতিল চেয়ে নির্বাচন কমিশনে  (ইসি) আপিল করেছেন প্রতিপক্ষরা। গত তিন দিনে কমিশনে প্রায় অর্ধশত আপিল জমা পড়েছে। পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্য তাদের নিজের আসনের প্রতিপক্ষ বৈধ প্রার্থীর মনোনয়নও বাতিল চেয়েছেন।  আবেদনকারীর বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা তার জোটের সদস্য। যার মধ্যে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীও রয়েছেন। প্রার্থিতা বাতিল চাওয়া প্রতিপক্ষের মধ্যে যেমনি রয়েছেন নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থী, তেমনি রয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের প্রার্থীও। বৈধপ্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের দাবির ক্ষেত্রে মূলত পাঁচটি কারণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—প্রার্থীর তথ্যগোপন, ঋণখেলাপি, তাদের বিরুদ্ধে মামলা থাকা, রাষ্ট্রের লাভজনক পদে থাকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্টসংখ্যক ভোটারের সমর্থন না থাকা। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের প্রতিপক্ষ ছাড়াও সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও বৈধ প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে আপিল করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত তিন দিনে ৫৪৩জন প্রার্থী ইসিতে আপিল দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই রিটার্নিং অফিসারের বাতিল করা প্রার্থিতা ফেরত পেতে। তবে, রিটার্নিং কর্মকর্তার বৈধ ঘোষণা করা অর্ধশতকের মতো প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল চেয়ে আপিল করা হয়েছে।

রংপুর-৩ আসনের জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী ও দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রার্থিতা চালেঞ্জ করে আপিল করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি) মনোনীত প্রার্থী সাব্বির আহমেদ। তিনি তার আপিলে এরশাদের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন ও জালিয়াতির অভিযোগ এনেছেন।

সাব্বির আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিনি ভিআইপি প্রার্থী। তার বিরুদ্ধে আগেও আপিল করেছিলাম। কিন্তু রায় পাইনি। এবারও আপিল করেছি। এরশাদ সাহেব বিএ পাস কিন্তু তিনি কোনও শিক্ষা সনদ দেখাতে পারেননি। এছাড়া তিনি বিদেশে থাকা বড় অঙ্কের অর্থের তথ্য গোপন করেছেন। তার আবুধাবির ন্যাশনাল ইউনিয়ন ব্যাংকে ৩৭ লাখ ৩০ হাজার ৪৬৮ মার্কিন ডলার অর্থ গচ্ছিত রয়েছে। এই অর্থ তিনি হলফনামায় প্রকাশ করেননি।’

বৈধতা বাতিল চেয়ে আপিল হয়েছে পটুয়াখালী-২ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও বর্তমান সংসদের হুইপ আ স ম ফিরোজের বিরুদ্ধে।তাকে ঋণ খেলাপি উল্লেখ করে স্থানীয় সংক্ষুব্ধ সায়েম মল্লিক তার বিরুদ্ধে আপিল করেন।

বর্তমান সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও ঢাকা ৮ আসনে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী রাশেদ খান মেনন আপিল করেছেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে। বুধবার নির্বাচন কমিশনে মেননের পক্ষে আবেদনটি জমা দিয়ে আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম সাংবাদিকদের বলেন, ‘হলফনামায় তথ্য গোপন করার অভিযোগে মির্জা আব্বাসের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে রাশেদ খান মেননের পক্ষে নির্বাচন কমিশনে আপিল করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের খেলাপি ঋণের তথ্য মির্জা আব্বাস তার হলফনামায় গোপন করেছেন। এছাড়া মির্জা আব্বাস হলফনামায় লিখেছেন, তার স্ত্রী তার কাছে ৭৩ লাখ টাকার বেশি পাবেন। আবার স্ত্রী লিখেছেন, তিনি স্বামীর কাছে এক কোটি টাকা পাবেন। এটি বিভ্রান্তিকর তথ্য।’

বরিশাল-৬ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও বর্তমান এমপি নাসরিন জাহান রতনা একই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আলী তরফদারের (ফারুক) প্রার্থিতা বাতিল চেয়েছেন।

ঝালকাঠী-১ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও বর্তমান সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুন ওই আসনের বিএনপির প্রার্থী শাজাহান ওমরের মনোনয়নপত্র বাতিলের আবেদন করেছেন। এদিকে, ভোলা-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী নাজিমুদ্দিন আলম আপিলে একই আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও বর্তমান সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের মনোনয়নপত্র বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

পিরোজপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র এমপি ও এবার জাতীয় পার্টির প্রার্থী রুস্তুম আলী ফরাজী ওই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল আলমের মনোনয়নপত্র বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

বরিশাল-৪ আসনের বিএনপির সাবেক এমপি মেজবাহ উদ্দীন ফরহাদ ওই আসনের সরকার দলীয় এমপি পঙ্কজ নাথের মনোনয়নপত্র বাতিলের আবেদন করেছেন। এতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘পঙ্কজ নাথ এক মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত। কিন্তু তার ওই সাজা স্থগিত বা বাতিল হয়নি।’

টাঙ্গাইল-২ আসনের আওয়ামী লীগ মনোনীত খন্দকার মশিউজ্জামান একই দলের ছোট মনিরের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।’

মানিকগঞ্জ-৩ আসনের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহিদ মালিক স্বপন তার আবেদনে ওই আসনের বিএনপির প্রার্থী আফরোজ খান রিতার মনোনয়নপত্র বাতিল চেয়ে আপিল করেছেন।’

ফেনী-৩ আসনের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) শহীদউদ্দিন মাহমুদের প্রার্থিতা বাতিল চেয়েছে নাসিরউদ্দীন নামের এক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি।

ঋণ খেলাপির দায়ে প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে টাঙ্গাইল-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল কাশেমের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে আবেদন করেছে সোনালী ব্যাংক লিমিডেট। অন্যদিকে ফারমার্স ব্যাংক আপিল করেছে ময়মনসিংহ-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী আলী আজগরের বিরুদ্ধে।

প্রতিপক্ষ প্রার্থীর বাতিল চেয়ে ইসিতে আপিল করেছেন ফেনী-২ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি ও দল মনোনীত প্রার্থী নিজাম উদ্দীন হাজারী, কুমিল্লা-৯ আসনের তাজুল ইসলাম, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী, কক্সবাজার-৩ আসনের সাইমুম সারওয়ার কমল ওব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের জাসদ মনোনীত ও সাবেক এমপি শাহ জিকরুল।

বগুড়া ৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল মোমিন তালুকদারের প্রার্থীতা বাতিল চেয়ে আপিল করেছে এম সারওয়ার খানে এক সংক্ষুব্ধ।

এদিকে বিএনপির এক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল চেয়ে আবেদন করেছেন একই দলের আরেক প্রার্থী। দিনাজপুর-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী আখতারুজ্জামান মিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলের আবেদন করেছেন ওই আসনেরই দল মনোনীত অন্য প্রার্থী হাফিজুর রহমান সরকার।

সিলেট-২ আসনে জাতীয় পার্টির এমপি ও প্রার্থী ইয়াহইয়া চৌধুরী ওই আসনের বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর প্রার্থিতা বাতিল চেয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া স্বতন্ত্র দুই প্রার্থী মুহিবুর রহমান ও এনামুল হক সরদারের বিরুদ্ধে আপিল করেন, যেন তারা মনোনয়ন ফেরত না পান। এই দুই প্রার্থী নিজেদের প্রার্থিতা ফিরে পেতে ইতোমধ্যে ইসিতে আপিল করেছেন বলে জানা গেছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়ন জমা দেওয়া ৩ হাজার ৬৫ জন প্রার্থীর মধ্যে রিটার্নিং অফিসাররা ৭৮৬ জনের প্রার্থিতা বাতিল করেন। পরে ইসি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত তিনদিন আপিল গ্রহণ করে। এতে ৫৪৩ জন আপিল জমা দেন।  বৃহস্পতিবার থেকে তিনদিন এসব আপিলের ওপর পূর্ণাঙ্গ কমিশন শুনানি করবে।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ