বাংলা ট্রিবিউনকে মঈন উদ্দীন খান বাদল এক চাকায় গণতন্ত্র হয় না, বিরোধী দল লাগে

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ১৩:৪৭, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৩৮, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯

মঈন উদ্দীন খান বাদল

এক চাকায় গণতন্ত্র হয় না, বিরোধী দল লাগে; মন্তব্য করেছেন জাসদের একাংশের কার্যকরি সভাপতি মঈন উদ্দীন খান বাদল। বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে গণতন্ত্রকে ‘বাইসাইকেল’ আখ্যা দিয়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা মন্তব্য করেছেন, সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দল আর তাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থাই যে গণতন্ত্র— প্রধানমন্ত্রী তা অনুধাবন করেছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সমসাময়িক রাজনীতি, ১৪ দলীয় জোট ও  জাসদের ভাঙনসহ ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলেছেন তিনি। ১৮-১৯ শতকের জার্মান আইনপ্রণেতা রোজা লুক্সেমবার্গের উদাহরণ টেনে তিনি বলেছেন, যথার্থ বিরোধী দল হতে হলে সংসদে থাকা ১৪ দলীয় নেতাদের সত্য বলার সাহস থাকতে হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ নিয়ে তার মন্তব্য— স্রোতের বিপরীতে গিয়ে নির্বাচনে কারচুপি করা যায় না। মঈন উদ্দীন খান বাদলের সেই সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রত্যাশা ১৪ দলীয় জোট সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। আপনি কী মনে করছেন?

বাদল: ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে, এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাশা।  তার প্রত্যাশাকে নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করার কোনও যৌক্তিকতা নেই।  একে  টুইস্ট করারও কিছু নেই।  একটি ব্যাপার লক্ষণীয়, তা হলো  প্রধানমন্ত্রী  আসলে অনুধাবন (রিয়ালাইজ) করেছেন গণতন্ত্র মূলত দুই চাকার সাইকেল।  এখানে আস্থার প্রয়োজন আছে (ডেমোক্রেসি ইজ বেসিক্যালি বাই সাইকেল,নিড টু ট্রাস্ট)। এক চাকায় গণতন্ত্র হয় না। বিরোধী দল লাগে ( নিড অপজিশন)। এজন্য প্রধানমন্ত্রী জোট শরিকদেরই বিরোধী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। কারণ, সংসদ এখন একচেটিয়া (এক্সক্লুসিভ) হয়ে গেছে। তবে আরেকটা দিক হলো, সরকার বা কোনও ব্যক্তি প্রত্যাশা করলেই বিরোধী দল হওয়া যায় না। সারা দেশের মানুষের কাছে এরশাদ জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল দাবি করেছেন। মানুষ কিন্তু তা স্বীকার করেনি। সুতরাং আপনার  বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করবে,আপনার অবস্থান কোথায়।  ১৪ দলীয় জোটে আমরা যারা আছি,  সংসদে তাদের সত্য তুলে ধরলে, সরকারের ভুল ধরিয়ে দিলে, তখন  প্রমাণিত হবে কে সরকারি দল আর কে বিরোধী।

একটা উদাহরণ আমি বারবার সামনে আনার চেষ্টা করি। ১৮-১৯ শতকের দিকে জার্মান পার্লামেন্টের একটা ঘটনা।  পুরো পার্লামেন্ট ভোট দিচ্ছে একটা প্রস্তাবের ( রেজ্যুলুশনের) পক্ষে। আর সেই প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করে একজন নারী দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন তার বিপক্ষে। তিনি হলেন রোসা লুক্সেমবার্গ। তিনি বলেছিলেন- সংসদ  সংখ্যাগরিষ্ঠ (মেজরেটি) কিংবা সংখ্যালঘুর (মাইনরিটি) প্রশ্ন নয়।  সংসদ হচ্ছে সত্যের জায়গা। আমি একাই সত্যের পক্ষে। তোমরা সবাই মিথ্যা বলছো। সুতরাং মেনন-ইনু-বাদল। আপনারা সবাই সত্য কথা বলেন। কেউ কি বেঁধে রেখেছে? সারা বছর খাবেন, এই রকম তো কোনও কথা নাই। নিজের পায়ে দাঁড়ান।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল একাদশ সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ফল প্রত্যাখান করেছে। একইসঙ্গে আপনার দল থেকেও বলা হয়েছে প্রশাসনের অতি উৎসাহী অংশ নির্বাচনকে কলঙ্কিত করেছে...

বাদল: নির্বাচনের ফল প্রত্যাখান নতুন কিছু নয়।  বরাবরই এই তামাশা  দেখে আসছে দেশের মানুষ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ফল প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এই দেশে। একটা কথা কী; নির্বাচনে স্রোতের বিপক্ষে গিয়ে কারচুপি করা যায় না।  ভারত,বাংলাদেশ বা বিশ্বের যেকোনও দেশের ক্ষেত্রেই এটা বাস্তব। স্রোতের পক্ষে কারচুপি করা যায়। আর অনিয়মের সিদ্ধান্ত তো মানুষ দেবে। সারা দেশে লাখ লাখ মানুষ যদি রাস্তায় নেমে বলে— আমি ভোট দিতে পারি নাই। সরকার কয়জনকে ঠেকাবে?  এদেশে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় বাচ্চা ছেলেরা আমাদের নাক মাটিতে ঘষে দেয় নাই? দিয়েছে কিনা? সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত না মানুষ  রাস্তায় নেমে ফল  প্রত্যাখ্যান করবে,ততক্ষণ রাজনৈতিক দলের বিবৃতিতে কিছুই হবে না।

আর আমার দল (জাসদ) যেটা বলেছে, সেটা সরকারের প্রতি সর্তকবার্তা। জাসদ বলতে চেয়েছে, আমরা স্বাভাবিক পথেই জয় পেতাম। একটা কথা বলি... স্বাভাবিকভাবে নির্বাচনে যেভাবে প্রার্থী প্রচারণা করে, একাদশ নির্বাচনে আমি তা করতে পারিনি অসুস্থার কারণে। মাঝেমধ্যে গাড়িতে করে ঘুরেছি। কিন্তু রাত হলেই সবখানে শুনতে পেতাম- জয়বাংলা, জিতবে এবার নৌকা। এই স্লোগানের তালে ছেলে-বুড়ো সবাই উল্লাস করেছে। এই যে বাংলাদেশ আসবে বা জন্ম নেবে এই স্লোগান আমরা পাইলাম কখন? ৬৯-এ আমাদের মুখ থেকেই এসেছে জয়বাংলা। পাকিস্তান থেকে তখন স্লোগান তোলা হয়েছিল নতুন আরেকটি দেশের নামে। যে দেশ তখনও জন্ম নেয় নাই। এক স্লোগানেই তখন বোঝা গিয়েছিল, আন্দোলনের আগুন সব জায়গায় লেগে গেছে। কিন্তু বিএনপি তো নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটা স্লোগানও বের করতে পারে নাই। কী বিরোধিতা করবে তারা? তবে প্রশাসনের অতিউৎসাহী কিছু ব্যক্তি এই নির্বাচনকে  কোথাও না কোথাও প্রশ্নবোধক করে দিয়েছে। আমরা সরকারকে বলেছি— তাদের সম্পর্কে সর্তক থাকুন।

১৪ দলীয় জোট যদি বিরোধী দলের ভূমিকা যায়, তাহলে কি ভবিষ্যতে জোট থাকবে?

বাদল:  ১৪ দল কোনও নির্বাচনি জোট নয়। একটা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এই জোট গঠিত হয়েছে।  সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। পুরোদস্তুর জঙ্গিপনা এখনও আছে বাংলাদেশে। সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি এখনও আছে। গণতন্ত্র দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক পথ বাকি।  প্রধানমন্ত্রী ২ ফেব্রুয়ারি গণভবনে পিঠা খাইয়ে জোটের নেতাদের বলেছেন, জোট ছিল এবং থাকবে। আপনাকে মন্ত্রিত্ব না দিলেই জোট ভেঙে যাবে, এইভাবে দুঃখ প্রকাশ করলে তো হবে না।

জাসদ অনেকবার ভেঙেছে। সর্বশেষ আপনারা দল থেকে বের হয়ে ভাঙন সৃষ্টি করলেন। আপনাদের বের হয়ে যাওয়ার কারণ কী?  

বাদল: মূল ব্যাপারটা (ইস্যু) বলি। জাসদে বির্তকটা দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। বির্তকটা ছিল নেতৃত্বের প্রশ্নে। নেতৃত্ব বলতে জাসদের তিনটি পদকে বোঝায়। তা হলো সভাপতি, নির্বাহী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। আমি নির্বাহী সভাপতি ছিলাম। দল থেকে একটা প্রস্তাব উঠেছিল, কেউ মন্ত্রী হলে দলের দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। তখন বিরোধী মত আসলো ছেড়ে কেন দিতে হবে। শেখ হাসিনা দলীয় সভাপতি, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী। ভারতের ইন্দিরা গান্ধী দলীয় সভাপতি, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার পাল্টা কাউন্টার আসলো— আপনি (হাসানুল হক ইনু) খালি ইন্দিরা গান্ধী আর শেখ হাসিনাকে দেখলেন। শেখ হাসিনার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৬ সালে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে দলের দায়িত্ব পালন করেছেন। ইন্দিরা গান্ধীর বাবা উপমহাদেশে গণতন্ত্রের জন্মদাতা পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু দলীয় পদে ছিলেন না, তিনি শুধু প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটেনে ডেভিড ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রী, দলের কোনও পদে নেই।

এছাড়া, ১৯৭৫ সালে ইন্ধিরা গান্ধী যখন এটা করলেন, সর্বভূতে বিরাজমান, ভগবানের মতো। তখন তাদের দলই ভেঙে গিয়েছিল। কংগ্রেসের প্রতীক ছিল জোড়া বলদ, সেই জোড়া বলদ থাকলো না। একজন হাত, আরেকজন চাকা নিয়ে চলে গেল। বাংলাদেশে কী হবে তা আমি জানি না। কারণ, আমি তো মহাজাতক নই। ইনুর উদ্দেশে তখন আমাদের দলের একজন সদস্য বলেছিলন— যেটা শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সেটা আপনার ক্ষেত্রেও হবে, তা কেমনে বুঝলেন। ইনুর প্রশ্ন ছিল কেন হবে না।  তখন উত্তর এলো— আপনার বাবার নাম শেখ মুজিব নয়। আপনি (ইনু) শেখ হাসিনাও না। আর আমরা আওয়ামী লীগ নই।

জাসদ সারা জীবন বির্তক চর্চাকারী একটা রাজনৈতিক সংগঠন। আপনি তো ইনু, আমরা আ.স.ম আব্দুর রবকেও মানিনি। তিনি তো একটা কিংবদন্তীতূল্য ব্যক্তি (লিজেন্ডারি ফিগার) ছিলেন। আর ওই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর রক্তে গড়া। তারা রক্তের মূল্যায়ন করেছে। আমরা কীভাবে আপনার (ইনুর) মূল্যায়ন করবো?

প্রশাসনের অতি উৎসাহী অংশ নির্বাচনকে কলংকিত করেছ আপনার দলের এই রেজ্যুলুশন কি প্রধানমন্ত্রীকে লিখিত আকারে দিয়েছিলেন?

বাদল: এটা তো অলরেডি পাবলিক হয়েছে। এটা প্রধানমন্ত্রী জানেন। তারপরও ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে (মিটিং) আমরা এ নিয়ে কথা বলবো। আমি একটা কথা বলি— ছোট দল বলে এই মন্তব্য করায়, অনেকের মুখ থেকেই অনেক কথা আসছে। দুইটা (জাস্ট) বছর অপেক্ষা করেন। তখন আপনাদের কলম থেকে বের হবে, এইগুলো ঠিক না। কোথায় জিম্মি হয়ে যাবেন, তখন বোঝা যাবে।

১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন হতে যাচ্ছে, এরইমধ্যে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়েও নানা অভিযোগ আসছে....?

বাদল: যে যত তামাশা করুক, নির্বাচনটা হওয়া উচিত। আপনি একদিকে বলবেন নির্বাচন দেন। অন্যদিকে বলবেন, দাড়ি-কমা ভুল হয়েছে... এইগুলো করবেন না। একটা নমুনা বলি— নির্বাচন একটা আলাদা কথা। নির্বাচনের সঙ্গে ভোটার কিংবা জনগণ সম্পৃক্ত থাকে। এই যে বিএনপি বলে আমরা জয়ী হতে পারলাম না... আরে যতদিন যাচ্ছে, এই নির্বাচন যদি জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, লাভবান কে হবে? লাভবান তো তারাই (বিএনপি) হবে। এটা যেন মাথায় থাকে। সুতরাং নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন। তারপর যদি বির্তক থাকে, ছাত্রসমাজ সিদ্ধান্ত নেবে। 

/এএইচআর/বিএ/এপিএইচ/

লাইভ

টপ