মনসুর-মোকাব্বিরের শপথ: জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যে কারণে নির্ভার

Send
সালমান তারেক শাকিল ও আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ২৩:১৩, মার্চ ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৮, মার্চ ০৩, ২০১৯

গণফোরাম থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও মুকাব্বির খান

আগামী ৭ মার্চ শপথ নিতে স্পিকার বরাবর চিঠি দিয়েছেন একাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দুই সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খান। আগে থেকে শপথ গ্রহণ না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত থাকলেও গণফোরামের এই দুই নির্বাচিত প্রার্থীর আগ্রহের পেছনে ঐক্যফ্রন্টের কোনও পরিকল্পনা আছে কী না, এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। ফ্রন্টের নেতারা বলছেন, দুই প্রার্থী শপথ নিলেও ফ্রন্টের ঐক্যে কোনও প্রভাব পড়বে না।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম প্রধান শরিক বিএনপির দায়িত্বশীলরা বলছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের শপথ গ্রহণ এবং সংসদে অংশগ্রহণ করার জন্য নানামুখী চাপ আছে। বিএনপির বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্রগুলো চাইছে, রাজপথে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি সংসদে অংশগ্রহণ থাকুক। এক্ষেত্রে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের সঙ্গে গণফোরামের শীর্ষপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।

জানতে চাইলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয়ক ও গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এককভাবে শপথ নেবেন, আমাদের এই রকম কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি । আমরা যেটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, শপথ নিতে চিঠি দিতে হলে ঐক্যফ্রন্টের সবাই একসঙ্গে দেবো এবং আন্দোলনের অংশ হিসেবে একসঙ্গে যাবো ।’

ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘তাদের দুজনের শপথ নেওয়ার সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের কোনও সম্পর্ক নেই। এটা যেহেতু গণফোরামের ব্যাপার, তারা ঠিক করবে, কী সিদ্ধান্ত হবে। আমি মনে করি, এতে করে ঐক্যফ্রন্টে কোনও প্রভাব পড়বে না।’

ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গণফোরামের মনসুর ও মোকাব্বির খান শপথ নিলে করণীয় ঠিক করবে গণফোরাম। আমি জানি না, তারা কী করবে। সিদ্ধান্ত তো তারাই নেবে। তারা শপথ নিলেও ঐক্যফ্রন্টের ওপর কোনও প্রভাব পড়বে না।’

দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও মোকাব্বির খানের শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে রাজপথের পাশাপাশি সংসদেও এই দাবিটি উত্থাপনের পক্ষে ঐক্যফ্রন্ট। ফলে, শপথগ্রহণ করলেও ঐক্যফ্রন্টে ভাঙন বা ভুল বোঝাবুঝির কোনও কারণ নেই বলেও মনে করে দায়িত্বশীল এই সূত্রটি।

একইসঙ্গে বিএনপির নির্বাচিত ৬ জন বিজয়ীর শপথ গ্রহণের বিষয়টি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। ইতোমধ্যে যে সিদ্ধান্ত রয়েছে দলীয়ভাবে, তা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসার কোনও ইঙ্গিত এখনও মেলেনি। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য ও বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থীরা কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট- সকলের ব্যাপারেই আমাদের সিদ্ধান্ত আছেই যে তারা (সংসদে যোগ দেওয়ার) সিদ্ধান্ত নেবে না। আমি এর বেশি কিছু মন্তব্য করতে চাই না।’

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘বিএনপি থেকে নির্বাচিতদের শপথ নেওয়ার ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে দল সরে এসেছে কিনা সেই বিষয়েও আমার কিছু জানা নেই।’

গণফোরামের দু’জন শপথ নিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে কোনও প্রভাব পড়বে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা যে দলের সদস্য, সেই দল নিশ্চয়ই তাদের বিষয়ে একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। আর যোগাযোগ করলেও ফোন রিসিভ করেননি বিএনপির মহাসচিব ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে বগুড়া থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী হারুন উর রশীদ। তিনি বলেন, ‘শপথ নেওয়ার ব্যাপারে দলের কোনও সিদ্ধান্ত পাইনি। সময় আছে। দেখা যাক কী হয়।’

বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রের দাবি, সংসদে অংশগ্রহণের বিষয়ে দেশে ও দেশের বাইরে থেকেও পরামর্শ এসেছে। বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্রগুলো নিয়মিত বৈঠকেও সংসদে অংশগ্রহণের বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার হতে চাইছে।

সূত্রের দাবি, এ বিষয়টি এখনই খোলাসা করবে না বিএনপি। দলের ভেতরে পূর্ণাঙ্গ তাৎপর্য এবং আন্দোলন ও আগামী দিনের কর্মকৌশল ঠিক করার পরই প্রকাশ্যে বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।

ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলছেন, ‘বিদেশিরা তো একরকম বলেছেই যে, শপথ নেওয়া উচিত। কিন্তু সেটা ভিন্ন ব্যাপার। আমরা নির্বাচনে গেলাম। কিন্তু সরকার কী করেছে। নির্বাচন তো ডাকাতি হয়ে গেলো। বাকি নির্বাচনগুলো তো বয়কট করা হচ্ছে। সরকার তো সব পথ বন্ধ করে রেখেছে। ন্যূনতম যেটা করা দরকার, সেটাও তো সরকার করতে পারেনি। গ্রেফতার অব্যাহত রেখেছে। মামলা তুলে নেয়নি। সরকার চায় না, তারা মনে করছে ডান্ডা হাতে সবকিছু করবে। এ কারণে বিএনপি কী করবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার জানান, ‘নির্বাচনের পর শপথ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত ছিল। এখন নতুন কোনও উপলব্ধি এলো কী না, সেটা আমি বলতে পারবো না।’

অবশ্য, শপথ গ্রহণ করার বিষয়ে নির্বাচনের পর থেকেই ইতিবাচক অবস্থান জানিয়ে এসেছেন গণফোরামের দুই প্রার্থী।

সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত মোকাব্বির খান মনে করেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা গুণগত পরিবর্তন।  তারা ইতিবাচক রাজনীতি দেখতে চান।  সেদিক বিবেচনায় রেখেই আমরা সংসদে যেতে চাই। সরকার যে নির্বাচন করেছে, জনগণকে বাইরে রেখে, তাদের কোনও অংশগ্রহণ ছিল না। সেটা তো দেশে-বিদেশে সবাই জানে। সেই কথাগুলো আমরা সংসদে বলতে পারি, সংসদের বাইরেও বলতে পারি- তাহলে কিন্তু সংসদের বাইরে-ভেতরে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলার সুযোগ হবে।’

মোকাব্বির খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার তো মনে হয় ইতিবাচক রাজনীতির প্রক্রিয়ার শুরু হবে। এই কথাগুলোই সংসদে বলতে চাই, সরকারের ওপর কেন আস্থা নেই। অচিরেই যেন মধ্যবর্তী সুন্দর নির্বাচন দেওয়া দরকার, জনগণ যেন নিজের ভোট দিতে পারে, যে নির্বাচনে প্রশাসনের কোনও ভূমিকা থাকবে না। এই কথাগুলো সংসদে বলবো। ভেতরেও বলবো, বাইরেও বলবো। এই কৌশল এই নীতি যদি আমরা গ্রহণ করি, তাহলে তো ক্ষতির কোনও কারণ দেখছি না। আমরা সত্যিকারের নির্বাচিত, আমরা বাইরে থাকবো আর যারা বিনাভোটে নির্বাচিত তারা সংসদে থাকবে—এটা তো হতে পারে না।’    

মোকাব্বির খান জোর দিয়েই বলেন, ‘আমাদের শপথগ্রহণের বিষয়টি ঐক্যফ্রন্টের মূল মেজাজের বাইরে না এবং কোনও ধরনের ভাঙনেরও প্রশ্ন নেই।’

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর বলেন, ‘আমি ৭ মার্চ শপথ নেওয়ার জন্য সংসদ সচিবালয়ে চিঠি দিয়েছি। ঐদিন শপথ নেবো। শত প্রতিকূলতার মধ্যে জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন, তাদের ভোটের সেই মর্যাদা দিতে আমি শপথ নিচ্ছি।’

আরও পড়ুন:

৭ মার্চ শপথ নেবেন মনসুর-মোকাব্বির

 

/এসটিএস/টিএন/

লাইভ

টপ