ঐক্যফ্রন্ট ভাঙার প্ররোচনা বিএনপিতেই!

Send
সালমান তারেক শাকিল ও আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ২০:৩৩, এপ্রিল ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:০০, এপ্রিল ০৭, ২০১৯

একমঞ্চে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচনে পরাজয়ের পর ফ্রন্টের শরিক বিএনপির কয়েকজন নেতা ঐক্যফ্রন্টের লাভ-ক্ষতির বিষয়টি সামনে আনেন। এ বিষয়টি এখন রীতিমতো রূপ নিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট ভাঙার উসকানিতে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির একাধিক সদস্য জানান, ফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনকে উত্তেজিত করার কৌশল নিয়েছে বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয় কেন্দ্রিক ছাত্রদলের কিছু কর্মী। এতে ফ্রন্টের অন্য শরিকদের মধ্যেও অস্বস্তি বেড়েছে। শরিক নেতারা আশঙ্কা করছেন, ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যৎ কর্মসূচিগুলোকে ‘স্যাবোটাজ’ করা হতে পারে।

ঐক্যফ্রন্টের শরিক, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ধরনের উসকানি সব সময়েই থাকে। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকে উসকানি দেওয়ার অপচেষ্টা অব্যাহত আছে। তবে ফ্রন্টের ঐক্য এখনও অক্ষুণ্ন আছে এবং থাকবে।’

গত রবিবার (৩১ মার্চ) জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত ‘স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস’ উপলক্ষে ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করো' শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় ড. কামাল হোসেন বক্তব্য দেওয়ার সময় দর্শক সারি থেকে কয়েকজন ছাত্রদল কর্মী ‘জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, এ কথা বলতে হবে’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন। এতে কামাল হোসেন বিব্রতবোধ করে বক্তব্য দেওয়া বন্ধ রাখেন। ওই সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের হস্তক্ষেপে উপস্থিত ছাত্রদের শান্ত করা হয়।

বিএনপির দায়িত্বশীল ও ছাত্রদলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত ফ্রন্টের আলোচনা সভায় ছাত্রদল উত্তরের কয়েকজন কর্মী উপস্থিত ছিলেন, যারা বিএনপির দুজন যুগ্ম মহাসচিবের নির্দেশে উত্তেজনাকর স্লোগান দেন। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তাদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে।

জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেখানে কী হয়েছে তা আমি বলতে পারবো না। দেশে এটার চেয়েও বড় বড় ঘটনা ঘটছে। সরকার গোটা দেশকে একটা বন্দিশালায় পরিণত করেছে। সেগুলো নিয়ে সরকারকে প্রশ্ন করা যেতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘নয়াপল্টন থেকে তাদের (ছাত্রদল কর্মী) পাঠানো হয়েছে— আমি এটা আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। অন্য কোনও সাংবাদিক এ ব্যাপারে আমাকে কোনও প্রশ্ন করে নাই। আর এটাতো দলের কার্যালয়, এখানে দলের সব নেতাকর্মী আসবে এটাই স্বাভাবিক।’

ছাত্রদলের ঢাকা উত্তরের যুগ্ম সম্পাদক সায়মন কবির শাওন বলেন, ‘আমি সেদিন আলোচনা সভায় যাইনি, ফলে কিছুই বলতে পারবো না।’

ছাত্রদলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, ‘সাধারণত বিএনপির কোনও কর্মসূচি হলে ছাত্রদলের নেতারা অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু ফ্রন্টের কর্মসূচিগুলোতে দাওয়াত পেলে হয়তো কেউ কেউ অংশগ্রহণ করেন। সেক্ষেত্রে ফ্রন্টের সভায় নেতাদের উদ্দেশে কিছু বলা অস্বাভাবিক।’

এর আগে গত ২৪ মার্চ বিকালে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এক আলোচনা সভায় ছাত্রদলের কয়েকজন কর্মী মির্জা ফখরুলকে দলের কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন করেন। ওই সভায় ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য আসম আবদুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্নাও উপস্থিত ছিলেন।

স্টিয়ারিং কমিটির কয়েকজন সদস্য বলেছেন, ‘বিএনপির নিজস্ব সমস্যা ফ্রন্টের কর্মসূচিতে আনার বিষয়টি বিরক্তিকর। এতে কামাল হোসেন বিরক্ত হতে পারেন। এমনকি ফ্রন্টের ঐক্যেও সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের বিষয়টি মীমাংসিত। এ নিয়ে শুধু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে বিরোধ রয়েছে।’

বিএনপির স্থায়ী ও কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা বলছেন, স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য হলেও তারা বৈঠকে যান না। এছাড়া, দলের দুই যুগ্ম মহাসচিব একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার প্রচারণা চালান। এ নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও যে বিভক্ত, বাংলা ট্রিবিউন এ বিষয়ে প্রতিবেদনও করেছে (বিএনপিতে কী হচ্ছে?)।

বিএনপি নেতারা বলছেন, যে বাস্তবতার নিরিখে ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছে, তার সঙ্গে জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ মানা না মানার কোনও সম্পর্ক নেই। ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহচর ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার আনুগত্য নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। সেদিক থেকে তাকে উদ্দেশ করে জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক বলতে হবে’ এমন স্লোগানে কামাল হোসেন অপ্রস্তুতবোধ করেন। ৩১ মার্চের আলোচনা সভায় ছাত্রদল কর্মীদের এ ধরনের স্লোগানের পর তিনি গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টুর ওপর রাগ করেন।

ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোর নেতারা জানান, বিএনপি কর্মীদের এসব উসকানিমূলক স্লোগান ও মন্তব্য তাদের শীর্ষনেতারাও সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছেন না। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী, জেএসডি সভাপতি আসম আবদুর রব, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী—এরা প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের ওপরে জিয়াউর রহমানের বিষয়টি চাপিয়ে দেওয়ার মানেই হচ্ছে ফ্রন্টে সমস্যা সৃষ্টি করা।

ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘কামাল হোসেনের সামনে বসে যারা জিয়াউর রহমানের বিষয়ে বলতে বলেছেন, তারা ঠিক করেন নি। এরচেয়ে ফ্রন্টের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। এখন যে অনাচার চলছে, ৫০ হাজার কর্মী জেলে আছে, লাখ লাখ মামলা আছে। ড. কামাল হোসেনের মতো ব্যক্তিকে কি বলে দিয়ে বলানো যাবে? আমাকে যদি কেউ বলে, আমিও তো বলবো না।’

জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ভাষ্য—‘বিএনপি আন্দোলনে যায় না, অকারণে বিরক্তি সৃষ্টি করছে ড. কামাল হোসেনের সামনে।’

‘আমাদের কাছেও বিষয়টি খুবই বিব্রতকর’- বললেন জেএসডি সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন। তার ভাষ্য—‘বিএনপি বলতে চায় দুয়েকজন আবেগে এটা বলে ফেলেছেন। কিন্তু আমাদের সাত দফা দাবি ও ১১ দফার যে লক্ষ্য, তাতে তো জিয়াউর রহমানের প্রসঙ্গই নেই। এখন যদি সেটা বাড়াতে চায়, তার ফলাফল খুব ভালো হবে না।’

আবদুল মালেক রতন বলেন, ‘আমি শুনেছি ড. কামাল হোসেন এ বিষয়গুলোতে খুবই বিরক্ত।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ঐক্যফ্রন্টকে অটুট রাখার পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একদিকে, এরশাদের কিছু লোক দিয়ে। বাকি দেশ ঐক্যফ্রন্টের দিকে। সারা বাংলাদেশের বিরোধী শক্তির নেতৃত্ব দিচ্ছে বিএনপি। খালেদা জিয়া কারাগারে বলে এই বিরোধী ফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন। সেদিক থেকে ফ্রন্টকে টিকিয়ে রাখতে হবে।’

/এসটিএস/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ