খালেদা জিয়ার প্যারোলের বিষয়ে কার আগ্রহ

Send
সালমান তারেক শাকিল ও আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ০৩:৫৩, এপ্রিল ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০৮, এপ্রিল ০৮, ২০১৯

বিএসএমএমইউতে চিকিৎসার জন্য আসার সময় কারাবন্দি খালেদা জিয়া (ফাইল ছবি)

খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে বিএনপির দৃশ্যমান কোনও আগ্রহ নেই। দলটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে; দলীয় প্রধানের মুক্তির বিষয়ে নেতাকর্মীদের ওপর চাপ যেমন আছে, তেমনি প্যারোলের বিষয়টি সামনে আসার নেপথ্যে সরকারের ‘ভূমিকা’ রয়েছে।

এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে ‘রাজনৈতিক চাপ’ অব্যাহত রাখার কোনও পরিকল্পনা নেই সরকারের- এমন ইঙ্গিত প্রভাবশালী একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীও ইতোমধ্যে বলেছেন, খালেদা জিয়ার পক্ষে আবেদন করা হলে প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি ভাববে সরকার।

এই প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দলের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার প্যারোলের মুক্তি চাওয়া নিয়ে কোনও আবেদন করা হয়নি, সেটা পরিষ্কার। প্যারোলের বিষয়টি কেন সরকার সামনে এনেছে তা নিয়ে দলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনও আলোচনা হয়নি।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘বিএনপি কিংবা খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে প্যারোলের কোনও আবেদন করা হয়নি। তবে কেন সরকার এই বিষয়টি সামনে এনেছে, এর পেছনে তাদের উদ্দেশ্য কী, তা বলতে পারবো না।’

রবিবার (৭ এপ্রিল) রাজধানীতে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে অনশন কর্মসূচিতেও দলটির নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তারা প্যারোল চাইছেন না। তারা মনে করছেন, আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মুক্ত করতে হবে। তবে বিএনপির মধ্যে একমাত্র অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনই প্যারোলে মুক্তির পক্ষে। তার ভাষ্য, ‘দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তির বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক। আর এই কারণেই নির্বাহী আদেশে সরকার খালেদা জিয়ার প্যারোল দিতে পারে। এক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে খালেদা জিয়ার সম্মতি থাকতে হবে।’

বিএনপির নেতারা বলছেন, প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি নির্ভর করছে খালেদা জিয়ার ওপর। তিনি চাইলে বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে চাওয়া হলেই প্যারোলের বিষয়টি আসতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করেই সরকারের পক্ষ থেকে প্যারোলের প্রসঙ্গ আসায় নেতারা সন্দেহ পোষণ করছেন। 

তবে অন্তত ছয় মাস আগে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্যারোলের বিষয়টি প্রথম উত্থাপন করেছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি এখনও একই অবস্থানেই আছেন। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে রবিবার রাতে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ম্যাডামের বিরুদ্ধে তো অনেক মামলা আছে। এই মামলাগুলোয় পর্যায়ক্রমে জামিন করে বের করতে সময় লাগবে। এখানে সরকার জামিনগুলোকে দীর্ঘায়িত করার জন্য বিভিন্ন রকম পন্থা অবলম্বন করছে। আমরা প্রথম থেকে বলে আসছি- এটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মামলা। ফলে আইনি প্রক্রিয়ায় সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া তাকে জামিনে মুক্ত করা যাবে না। একটা কেসে জজকোর্ট জামিন না দিলে আমরা হাইকোর্টে আসি। হাইকোর্ট জামিন দিলে, তারা আপিল বিভাগে যায়। এসব করে সব মামলা তারা দীর্ঘায়িত করছে।’ 

তার ভাষ্য, ‘এক সময় আমি বলেছিলাম, যেহেতু ম্যাডাম অসুস্থ এবং আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে জামিনে বের করা দীর্ঘ সময়ের দরকার হবে। ফলে চিকিৎসার জন্য তিনি প্যারোলে বের হতে পারেন।’

প্যারোলের উদাহরণ দিয়ে খন্দকার মাহবুব আরও বলেন, ‘আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও এক-এগারোর সময় প্যারোলে মুক্তি নিয়ে চিকিৎসা করেছিলেন। আমাদের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও কিন্তু প্যারোলে মুক্তি নিয়ে চিকিৎসা করতে গেছেন। প্যারোল হলো একটা নির্বাহী আদেশ। এখানে কোর্টের কোনও ভূমিকা নেই। স্বরাষ্ট্র্র মন্ত্রণালয় ইচ্ছা করলে যে কোনও ব্যক্তিকে বিশেষ কারণে প্যারোলে মুক্তি দিতে পারে। এই কারণে আমি গত ৬ মাস আগে বলেছি, ম্যাডামকে প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে। তখন আমার পার্টি থেকে এটাকে সহজভাবে গ্রহণ করে নাই। তাদের ধারণা, প্যারোলটা হলো সরকারের কাছে সারেন্ডার।’

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাভাবিকভাবে খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে রাজনৈতিক প্রভাববিস্তার বন্ধ হলে তার জামিন হবে। প্যারোলের আবেদনের বিষয়টি তাদের কাছে অনুকম্পার মতো, রবিবার গণঅনশনেও এমন বক্তব্য রেখেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা।

দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার নওশাদ জমির বলেন, ‘আমাদের দলে প্যারোল নিয়ে কোনও আলোচনা নেই। আমাদের এই বিষয়ে কোনও চিন্তা নেই। এটা সরকারের দিক থেকে চিন্তা।’

দলীয় আইনজীবীরা বলছেন, বিএনপির চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে মাত্র দুটি মামলার জামিন আটকে আছে। এই দুটিতে জামিন পেলেই বেরুতে পারবেন খালেদা জিয়া।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘বেগম জিয়া খুব অসুস্থ। গণমানুষের চিন্তাকে কনজিউম করার জন্য তার প্যারোলের বিষয়টি তোলা হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ, তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কেরানীগঞ্জ কারাগারে নিতে চায় সরকার। আর এই কারণে বিএসএমএমইউ’কে ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করছে।’

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সর্বমোট ৩৪টি মামলা চলমান আছে জানিয়ে মাহবুব উদ্দিন খোকন জানান, আর মাত্র দুটি মামলায় জামিন বাকি আছে।

তিনি আরও বলেন, ‘প্যারোলের কথা তো টেলিভিশনে আলোচনা হয়। ওই বক্তব্য দিয়ে তো বেগম জিয়ার প্যারোল নিয়ে আলোচনা হবে না। বিএনপি সরকারের বক্তব্য পর্যবেক্ষণ করছে। ‘সরকার বেগম জিয়াকে কারাগারে নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বেড়েছে? ভোটকেন্দ্রে ভোটার বেড়েছে? বাড়েনি। তাহলে তো নিশ্চিতভাবেই তাদের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। এর কারণে বেগম জিয়া বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম রাজনীতিক।’ 

বিএনপির চেয়ারপারসন কার্যালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি মনে করছেন, খালেদা জিয়া কারাগারে থাকার কারণে বিএনপির শীর্ষনেতাদের ও সরকারের ওপর চাপ রয়েছে সমানভাবেই। বিএনপির নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি নিয়ে চাপে রেখেছেন শীর্ষনেতাদের। এই চাপ গত এক বছর ধরেই মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাদের। এই কারণে ছোটখাটো কর্মসূচি দিয়ে হলেও খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি সামনে রাখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারেও প্রথমবারের মতো খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। রবিবার অনুষ্ঠিত অনশনে ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর নেতারাও অংশগ্রহণ করেছেন।

এদিকে প্রভাবশালী দুটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র বলছে, খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এখন কারাগারে রাখার ‘রাজনৈতিক মূল্য’ প্রায় নেই। সরকারের উচ্চপর্যায়ে চিন্তা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহাবস্থান নিশ্চিত করা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য একটি অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সম্প্রতি তৃতীয় একটি পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চপর্যায়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের অফার দেওয়া হলে তা রিজেক্ট হয়। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে সবগুলো দলের যেন সহাবস্থান রাখার সুযোগ হয়, এই বিষয়টিকে সামনে রেখে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো। যদিও তা আমলে নেওয়া হয়নি।

বিএনপির রাজনীতি পর্যবেক্ষক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘সরকার নমনীয় কিনা, স্পষ্ট করে বলতে পারবো না। তবে সরকার খালেদা জিয়ার মুক্তি বা জামিন নিয়ে কিছু চিন্তা করছে, এটা বলতে পারি। কিন্তু কী, কেন, তা আরও পরে বলবো।’

তবে প্যারোলের বিষয়টি খালেদা জিয়ার ওপর নির্ভর করছে বলেও জানান এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার সঙ্গে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে রবিবার দুপুরেই বলেছি। এখন নতুন করে কিছু বলার নেই।’ রবিবার ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তির আবেদন করলে তা বিবেচনা করার সুযোগ আছে। তবে সরকার তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার কোনও চিন্তাভাবনা করছে, বিষয়টি এমনও নয় বলে জানান তিনি।

 

/এএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ