ফাঁসির দণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়া নেতাদের এখনও ‘শহীদ’ মনে করেন মন্জু

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ২৩:৫৬, এপ্রিল ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫১, এপ্রিল ২৮, ২০১৯

মজিবুর রহমান মন্জু

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতাদের এখনও ‘শহীদ’ বলেই মনে করেন মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ও নীতি পরিষ্কার করার আহ্বান জানানোর প্রস্তাব দিয়ে বহিষ্কার হওয়া ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মন্জু।

‘মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেওয়ার দায়বোধ থেকেই’ নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ ‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ ঘোষণা দিলেও চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে শাস্তি পাওয়া জামায়াত নেতাদের ব্যাপারে তার মনোভাব এখনও একইরকম। এ বিষয়ে আজ শনিবার (২৭ এপ্রিল) জানতে চাইলেও বাংলা ট্রিবিউনের কাছে বিষয়টি অস্বীকার করেননি তিনি।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘যেহেতু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন কার্যক্রম আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়েছে এবং বিচারকাজটি ঠিকভাবে হয়নি এবং নেতারা ন্যায়বিচার পাননি সেহেতু তাদেরকে ‘শহীদ’ই বলা যায়।’’ তবে এসব বিষয়কে ‘ক্ষুদ্র’ উল্লেখ করে ‘বিতর্ক’ করতে চান না তিনি।

মজিবুর রহমান মন্জু একাত্তর নিয়ে জামায়াতকে দলের অবস্থান পরিষ্কার করার দাবি জানিয়ে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি দলের আমির মকবুল আহমাদের কাছে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। সেই চিঠিতেও তিনি কামারুজ্জামান, মীর কাশেম আলীকে ‘শহীদ’ হিসেবেই উল্লেখ করেন।

জামায়াতের আমিরকে মন্জু তার চিঠিতে লিখেছেন, ‘‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রসঙ্গে জামায়াতের দ্বিমুখী নীতি ও অপরিচ্ছন্ন-ধোঁয়াশাপূর্ণ অবস্থানের অবসান ঘটানোর পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেছি। শুধু তাই নয়, ইতোপূর্বে জামায়াতের সিনিয়র নেতা ‘শহীদ’ কামারুজ্জামান, ‘শহীদ’ মীর কাসেম আলী, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকসহ অনেকে বহু আগেই কৌশলগত ও রাজনৈতিক সংস্কারের লিখিত দাবি জানিয়েছিলেন। সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ফোরামে তারা নিয়মানুযায়ী একাধিকবার প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। কিন্তু তাদের সেই যুক্তিকে শুধু অগ্রাহ্যই করা হয়নি বরং তাদেরকে সংগঠনে বিতর্কিত ও কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে।’’

এর দু’দিন পর তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

জামায়াতের সেই শীর্ষ নেতাদের এখনও ‘শহীদ’ মনে করেন কিনা প্রশ্নটি আজ আবারও তাকে করা হলে সরাসরি জবাব দিতে চাননি মন্জু। তিনি বিষয়টি একটু ঘুরিয়ে বলেন, ‘‘বিচার প্রক্রিয়াটি স্কাইপ কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন সাক্ষীদের বিষয়ে নানা কারণেই সমালোচনার মুখে পড়েছে। গ্যাপগুলো ও দুর্বলতার কারণে সুবিচার নিশ্চিত হয়নি। ‘শহীদ’ শব্দটি বাংলাদেশে অন্যায়ভাবে যাদের বিচার হয় তাদের বলা হয়। আমি মনে করি তারা সুবিচারটা পায় নাই, বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।’’

এখনও তাদের নাম লেখার সময় ‘শহীদ’ লিখবেন কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি তো একটা রাজনৈতিক দলে ছিলাম, তাদের দল থেকে বেরিয়ে আসিনি, আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। দল থেকে বের করে দেওয়ার পরে আমি আমার অবস্থান বদলালে মানুষ আমাকে খারাপ বলবে। ফলে এসব নিয়ে কথা বলা আমার জন্য বিব্রতকর। ফলে আগের দল নিয়ে আমি কোনও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে চাই না। যেহেতু প্রতিবাদমূলক অবস্থান নিয়েছি সেহেতু ক্ষুদ্র বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক করতে চাই না।’

শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে আড়ম্বরপূর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করে ‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’। জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ও নীতি পরিষ্কার করার আহ্বান জানানোর প্রস্তাব দিয়ে বহিষ্কার হওয়া দলটির নেতা ও ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মন্জু এর উদ্যোক্তা। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আবদুল হক, গোলাম ফারুক, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোস্তফা নূর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন, মাওলানা আবদুল কাদের, নাজমুল হুদা অপু, মো. সালাউদ্দিন, ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সেক্রেটারি ব্যারিস্টার জোবায়ের আহমেদ ভূইয়া, আবদুল হক এবং যুক্তফ্রন্টের নেতা সাবেক প্রতিমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন আল আজাদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, নুরুল ইসলাম ভূইয়া ছোটন, গৌতম দাশ, রুবী আমাতুল্লাহ, ২০-দলীয় জোটের শরিক একটি দলের নেতা সুকৃতি কুমার মণ্ডলসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

দলটির ঘোষণা দিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগে ধর্মভিত্তিক কোনও আদর্শ নেই বলে জানান মন্জু। তবে ঘোষণাপত্রের ১৩ নম্বর ধারায় এসে বলা হয়েছে, ‘আমাদের অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎসস্থল ইসলামের উদার ঐতিহ্য, সাম্যের দর্শন এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দায়িত্বানুভূতি।’

মন্জুর উদ্যোগে ‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ নামে একটি রাজনৈতিক উদ্যোগের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান

নতুন উদ্যোগে যুদ্ধাপরাধীদের আইনজীবী:

মজিবুর রহমান মন্জুর নেওয়া নতুন উদ্যোগের ঘোষণা অনুষ্ঠানে তার পাশে বসেছিলেন একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষনেতাদের অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম।

জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের হয়ে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেওয়া অন্যতম আইনজীবী তাজুল ইসলাম এই আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেহেতু (সংবাদ সম্মেলনে) উপস্থিত ছিলাম সহমত আছে উদ্যোগের সঙ্গে। যুদ্ধাপরাধের মামলায় জামায়াতের পক্ষে সক্রিয় আইনজীবী আজকের এই উদ্যোগে উপস্থিত থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি আইনজীবী হিসেবে সক্রিয় ছিলাম সেটা সত্য, কিন্তু আমি পার্টির প্রাইমারি মেম্বার কোনওদিন ছিলাম না। আমার সম্পৃক্ততা আইনজীবী হিসেবে আইনি লড়াইয়ের মধ্যেই। খেয়াল করে দেখবেন (ট্রায়াল চলাকালে) রাজনৈতিক প্রশ্নের কোনও জবাব আমি কোনওদিন দেইনি। মামলার মধ্যে যা কিছু ছিল সেগুলো নিয়ে কথা বলেছি।

কিন্তু সেদিনের অবস্থানের সঙ্গে আজকের অবস্থান কনফ্লিক্ট করে কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা এবং সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে কোনও রাজনীতি হতে পারে না। এটা তো জাতীয় ঐতিহ্যের, চেতনার একটি মৌলিক বিষয়। সেটার সঙ্গে আইনজীবী হিসেবে ভূমিকা কনফ্লিক্ট করে না। সেখানে আমি তাদের পক্ষে পেশাদারিত্বের সঙ্গে লড়াই করেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে এভিডেন্স যেগুলো দেখেছি, আইনজীবী হিসেবে আমাদের যতটা দেখার সুযোগ হয়েছে তাতে আমি দেখেছি এই লোকগুলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভূমিকার ব্যাপারে যাই বলা হোক না কেন, এই লোকগুলো ব্যক্তিগতভাবে রেপ করেছে, খুন করেছে বা যেগুলোর জন্য বিচার হয়েছে এগুলোর সঙ্গে তারা জড়িত না। এগুলোর সঙ্গে আসামিরা জড়িত ছিল মর্মে সাক্ষ্যপ্রমাণে আমার কাছে মনে হয়নি। সুতরাং ওই ভূমিকার (জামায়াতের আইনজীবী হিসেবে) সঙ্গে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা না-করা এটার মধ্যে কোনও কনফ্লিক্ট নাই। কারণ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার সুযোগ কারও নেই।

তাজুল ইসলাম ব্যাখ্যা করেন, ‘আমি আইনজীবী হিসেবে যেটা করেছি অনেস্টলি করেছি। সেখানে আমি বিশ্বাস করেছি যে, মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে দেখেছি এই লোকগুলো এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত না। সেজন্য আমরা অনেস্টলি তাদের পক্ষে ডিফেন্ড করেছি। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে তারা (যুদ্ধাপরাধের দায়ের সাজাপ্রাপ্তরা) যা কিছু করেছেন তার দায়-দায়িত্ব তাদের, এ ব্যাপারে আমার ইয়েস নো কোনও কিছু বলার সুযোগ নেই।’

সংবাদ সম্মেলনে তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, তিনি আগে জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। পেশাগত কারণে তিনি জামায়াত নেতাদের আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছিলেন।

মন্জুর উদ্যোগ ও তাজুলের অংশগ্রহণ: যেভাবে দেখছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলো

একাত্তরের ঘাতক ও দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির মনে করেন এই প্রক্রিয়া নতুন না। তিনি বলেন, ‘গত দুই মাস আগে যখন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক জাময়াতের নাম বদলানো, মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে ক্ষমা চাওয়ার মতো কথাগুলো নিয়ে গণমাধ্যমে হাজির হলেন আমি তখনই বলেছি এটা খোলস পাল্টানোর প্রচেষ্টা। স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াত নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান তাদের অনুমতি দিলে তারা নাম বদলে হাজির হয়েছিল। আমার কথা হলো খোলস পাল্টালেও কেউটে কেউটেই থাকে। কথা হলো তারা যদি সম্পূর্ণ সেক্যুলার নাম নিয়ে আসে তারপরও একাত্তরের দায় থেকে তাদের মুক্তি নাই। তাদের কর্মকাণ্ড নজরদারির মধ্যে রাখা জরুরি।’

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিকও মনে করেন এটি নতুন কিছু নয়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ঈশপের গল্পের মতো ভেড়ার লোম গায়ে দিলে নেকড়েকে লুকানো যায় না। ডাক দিলেই বোঝা যাবে, সেটি নেকড়েই। যারা এই উদ্যোগ নিয়েছে তারা ছোট থেকেই শিবির; সরাসরি পাকিস্তানের রাজনীতি করায় জনগণের সমালোচনার মুখে পড়ে এখন ভিন্ন নামে হাজির হতে চাইছে। এর উদ্যোক্তা মন্জু ‘রগকাটা নেতা’ হিসেবে পরিচিত এবং সকল রগ কাটার নৈতিক দায়িত্ব তাকে নিতে হবে। এদের কাছ থেকে নতুন কিছু আশা করার নেই। এসব অন্তর্দলীয় কোন্দলের কারণে আলাদা হয়ে যাওয়া।

এদিকে তাজুল ইসলামের এই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একই জিনিস পাত্র বদলে পরিবেশন ভিন্ন কিছু মনে করছি না। জামায়াত নিজেরাও নানা সময়ে নাম বদল করেছে। তাজুল ইসলাম জামায়াত সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করলেও তিনি মনে করেন বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ হয়নি এবং তিনি শীর্ষ জামায়াত নেতাদের হয়ে গণমাধ্যমের সামনে হাজির হয়ে জামায়াতের অবস্থানের প্রতিনিধিত্বও করেছেন। 

/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ