ভাঙনের মুখে বিরোধী জোট, তবু ‘চুপ’ বিএনপি

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ২২:২৬, মে ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫১, মে ০৯, ২০১৯





জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সমাবেশে বিএনপি নেতারাএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন সত্ত্বেও সংসদে যোগ দেওয়ার ঘটনায় বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকরা। উভয় জোটেরই নেতাদের অভিযোগ, শপথ নেওয়ার প্রশ্নে বিএনপি তাদের কারোর সঙ্গেই আলোচনা করেনি। এ পটভূমিতে গত সোমবার (৬ মে) ২০ দলীয় জোট ছাড়েন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ। আগামীকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়তে পারেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী। এছাড়া ২০ দলীয় জোটের একাধিক নামসর্বস্ব দলের নেতারাও জোট ছাড়ার হুমকি দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে ‘বিরোধী জোট’ পড়েছে ভাঙনের মুখে। তবে এ পরিস্থিতিতেও মৌন বিএনপি। শরিকদের ধরে রাখার দৃশ্যমান কোনও চেষ্টাও নেই তাদের।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, একাদশ নির্বাচনের পর বিএনপি দলীয়ভাবেই নানামুখী সংকট মোকাবিলা করছে। নির্বাচিত ছয় এমপির মধ্যে জাহিদুর রহমান জাহিদ দলের নির্দেশনা না মেনেই শপথ গ্রহণ করার পর মির্জা ফখরুল ছাড়া বাকি চারজন এমপি শপথ নিতে অনড় অবস্থান গ্রহণ করায় হাইকমান্ড শপথ গ্রহণের অনুমতি দেয়। এরপরই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা প্রকাশ্যেই এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান।

সুবিধাজনক অবস্থানে নেই বিএনপি 

সূত্র বলছে, শপথগ্রহণ প্রক্রিয়ায় কী ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে বিএনপিকে, তা শরিকদের অজানা থাকার কথা নয়। বিএনপি সাংগঠনিকভাবে ও রাজনৈতিকভাবে নানা ধরনের সংকটের মধ্যে আছে, এ বিষয়টিও শরিকরা জানেন। সেদিক থেকে বিএনপি কোনও সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। এ কারণে ফ্রন্ট বা জোটের যেকোনও শরিক বিএনপিকে ছেড়ে যেতে চাইলে বাধা দেওয়ার কোনও চেষ্টা করা হবে না।
গত বছরের নভেম্বরে সর্বশেষ শরিক হিসেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেন কাদের সিদ্দিকী। আগামীকাল (৯ মে) বৃহস্পতিবার তিনি জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন। একাধিক সূত্র মনে করছে, এদিনই ফ্রন্ট ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন তিনি। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ ইকবাল সিদ্দিকী জানান, এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না। তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন।
কাউকে ধরে রাখার চেষ্টা করবে না বিএনপি

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একজন প্রভাবশালী নেতা জানান, কাদের সিদ্দিকীর ফ্রন্ট ছেড়ে যাওয়ার বিষয় নিয়ে মির্জা ফখরুল ও কাদের সিদ্দিকীসহ কয়েকজনের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। মির্জা ফখরুল এ বিষয়ে কিছু করণীয় নেই বলে জানিয়েছেন।

বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা মনে করেন, রাজনৈতিকভাবে পুরো বিরোধী শিবিরে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা থেকে বের হতে আরও সময় লাগবে। এই মুহূর্তে যেসব দল বা ব্যক্তি জোট বা ফ্রন্ট ছেড়ে যাচ্ছে, তাদের ফেরানোর কোনও উদ্যোগ নেবে না বিএনপি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, রাজনৈতিকভাবে বিরোধী শিবিরে একধরনের অস্থিরতা আছে। নির্বাচনের পর এটাই স্বাভাবিক। এই মুহূর্তে পলিসি ঠিক করার আগে কোনও বিষয়েই মুখ খুলবে না বিএনপি।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘যেকোনও বিষয়েই কিছু বলতে হলে আগে দলের পলিসি ঠিক করতে হয়। আমরা বসবো। এরপর বলা যাবে ঠিক কী করবো। আর চলে যায়, তারা যাওয়ার। এখানে পরিস্থিতি কী, তা সবাইকে বুঝতে হবে।’
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, ‘আগামী শনিবার (১১ মে) স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বৈঠক করতে পারেন। ওই বৈঠকে বিষয়গুলো উঠবে। এরপর বলা যাবে দলের দৃষ্টিভঙ্গি কী।’
আগামীকাল বৃহস্পতিবার যৌথসভা ডেকেছে বিএনপি। এ সভায় দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী জিয়াউর রহমান জন্মবার্ষিকী পালনের জন্য বিস্তারিত পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে ঐক্যফ্রন্ট

সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’
২০ দলীয় জোটের গুরুত্বপূর্ণ শরিক দলগুলোর নেতারা মনে করছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি জোটের বৈঠক করা দরকার। অনেকেই মনে করেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কারণেই ২০ দলীয় জোটের গুরুত্ব কমেছে।
বিএনপির একাধিক সূত্র মনে করে, জামায়াতকে নিজ উদ্যোগে চলে যাওয়ার পথ তৈরি করতেই জোটকে আলোচনায় রাখা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে বিকল্প চিন্তা শুরু করেছে বিএনপির হাইকমান্ড। জোটের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ শরিক দলের নেতা, ঐক্যফ্রন্ট ও বাইরের আরও একাধিক দলের সমন্বয়ে একটি প্ল্যাটফরম করার চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ে।
জোটের শরিক কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকে ২০ দলের গুরুত্ব কমতে থাকে। এরও কারণ আছে। ২০ দলে এমন কিছু দল আছে যা নামমাত্র। বিএনপি এটাকে সংখ্যাতাত্ত্বিক জোট রেখেছে।’
আমিনুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, ‘এতে অনেক নেতাদের মান-অভিমান আছে, কিন্তু জোট ছেড়ে দিয়ে তাদের কী খুব লাভ হচ্ছে? নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি না বাড়িয়ে শুধু জোটের ওপর ভরসা কতটুকু যৌক্তিক? অতএব হটকারী সিদ্ধান্ত নয়, আলোচনা করেই সমস্যা সমাধান করা দরকার।’
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক একটি দলের সভাপতি বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘দল হিসেবে তাদের রাজনীতি করতে হলে আগে রাজনৈতিক পলিসি ঠিক করতে হবে। পরিস্থিতি আমাদের সামনেই ঘটছে। কিন্তু নিজেদের আগে ক্লিয়ার হয়েছে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বসা উচিত বৈঠকে। এতে করে দৃশ্যমান যে সংকট দেখা যাচ্ছে, তা দূর হতে সাহায্য করবে।’

/এইচআই/

লাইভ

টপ