মেয়াদ শেষেও থানা-ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়নি ঢাকা মহানগর আ. লীগ

Send
মাহবুব হাসান
প্রকাশিত : ১১:৫৮, মে ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫০, মে ০৯, ২০১৯

আওয়ামী লীগের দলীয় পতাকামেয়াদ পার হওয়ার পরও রাজধানী ঢাকার থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কোনও অংশই। দক্ষিণে কয়েকটি থানার আংশিক কমিটি হলেও বেশিরভাগ থানা এবং সবগুলো ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন চলছে শুধু সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দিয়েই। আর উত্তরে দুইবার কমিটি দেওয়া হলেও প্রতিবারই তা বাতিল হয়েছে। ফলে বছরের পর বছর পদ-পদবির অপেক্ষায় থাকা নেতাকর্মীদের অনেকের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চাপা ক্ষোভ ও হতাশা। দলে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন অনেকেই, অনুপ্রবেশ ঘটেছে সুবিধাবাদী ও হাইব্রিডদের।
তিন বছর মেয়াদি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে গত ১০ এপ্রিল। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বারবারের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে দু’বার পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা দেওয়া হলেও তা অনুমোদিত হয়নি। ফলে থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছেন রাজধানী ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশের দায়িত্বে থাকা নেতারা।
২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও কমিটি দিতে না পারায় দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাককে দক্ষিণ এবং কর্নেল (অব.) ফারুক খানকে উত্তরের কমিটি সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সম্মেলনের সাড়ে তিন বছরের মাথায় কমিটি ঘোষণা করা হয়।
থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসব কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার দায়িত্ব মহানগরের দুই অংশের। এ লক্ষ্যে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমাও পড়েছিল কিন্তু সেগুলো নিয়ে নানা অভিযোগ থাকায় অনুমোদন করা হয়নি। অনেক আগেই মহানগরের দুই অংশকে আবার নতুন করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
হানিফ-মায়া পরবর্তী যুগ
২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মহানগর উত্তরে এ কে এম রহমত উল্লাহ এমপি সভাপতি ও সাদেক খানকে সাধারণ সম্পাদক এবং দক্ষিণে হাজী আবুল হাসনাতকে সভাপতি ও মো. শাহে আলম মুরাদকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকার দুই অংশে কমিটি করে আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরের ৪৯ থানা ও ১০৩ ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নামও ঘোষণা করা হয় আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ স্বাক্ষরিত সেই প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। এর মাধ্যমে কার্যত ঢাকার প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ এবং সাবেক ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বলয় থেকে বের হয়ে আসে দলের গুরুত্বপূর্ণ এই শাখাটি। এ কমিটির মাধ্যমে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ভেঙে মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ নামে দুটি কমিটি হয়। পরবর্তীতে মহানগর পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলেও থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় এ দুটি শাখার নেতাকর্মীরা হতাশ। তাদের পাশাপাশি হতাশ মহানগর সংশ্লিষ্ট সাবেক শীর্ষ নেতারাও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগরের সাবেক একজন শীর্ষ নেতা বলেন, ‘মূলত থানা ও ওয়ার্ডে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য এর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি করেননি। আর এতে সায় ছিল মহানগরের দুই অংশের শীর্ষ নেতাদের।’ ঢাকা মহানগরের অন্তর্গত সব থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ২০১৭ সালের ৩১ মে’র মধ্যে ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না দেওয়ায় পরে আরও বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে মহানগর নেতাদের কমিটি ঘোষণার নির্দেশ দেন তিনি।
দুইবার বাতিল উত্তরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি
২০১৭ সালের ৫ জুলাই প্রথমবার মহানগর উত্তরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে নেতাকর্মীদের প্রতিবাদের কারণে কমিটি বাতিল হয়। এরপর গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় থানা ও ওয়ার্ডে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে মহানগর উত্তর। প্রতিটি থানায় ৭১ সদস্য এবং প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে ৬৯ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করে ‘প্রেস রিলিজ’ দেয় মহানগর উত্তর। কিন্তু উত্তরের থানা ও ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা না করা এবং এতে জামায়াত-বিএনপির লোকেরা স্থান পাওয়ায় তা আবারও বাতিল করা হয়। থানা ও ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটির বিষয়ে মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লাহ বলেন, ‘কমিটি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণে সময় পেরিয়ে গেছে। আর ২০১৮ সালে নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন দ্রুত কমিটি দেওয়া হবে।’
দক্ষিণে ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের পূর্ণাঙ্গ কমিটি আটকে আছে ত্রিমুখী দ্বন্দ্বে। নিজেদের অনুসারীদের কমিটিতে জায়গা দেওয়া নিয়ে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগে দীর্ঘদিন থেকে সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ এবং মেয়র সাঈদ খোকনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের এক নম্বর কার্যকরী সদস্য সাঈদ খোকন মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নিজেদের অনুসারীদের ঢোকাতে গিয়ে শাহে আলম মুরাদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব সামনে চলে আসে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দু’জন এক হয়ে বেশকিছু অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। এদিকে শাহে আলম মুরাদ দলের সভাপতিকে পাশ কাটিয়ে সব ধরনের দলীয় কাজ করেন বলে দক্ষিণের সভাপতি আবুল হাসনাত অভিযোগ করেছেন। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে শাহে আলম মুরাদ তার নিজের এলাকা বরিশাল এবং তার অনুসারীদের প্রতি বেশি দৃষ্টি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মেয়র সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তিনি তার অনুসারীদের, বিশেষ করে মহানগর ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের অনেক নেতাকর্মীকে কমিটিতে জায়গা দিতে চান। এসব দ্বন্দ্বের মধ্যে দক্ষিণে কিছু কিছু থানায় আংশিক কমিটি দেওয়া হয়েছে। যদিও মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহে আলম মুরাদ দাবি করেছেন, ইতোমধ্যে কদমতলী, শ্যামপুর, গেণ্ডারিয়া, সূত্রাপুর, ওয়ারী, কোতয়ালি, কামরাঙ্গীরচর, শাহবাগ, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, কলাবাগান ও নিউমার্কেট থানার পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি থানাগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি অচিরেই ঘোষণা করা হবে। তবে এ বিষয়ে এসব থানার একাধিক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘কমিটিতে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পদ দেওয়া হয়েছে।’

আরও পড়ুন: ঢাকা মহানগর আ.লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি: নতুনের কাছে ধরাশায়ী পুরনো

               ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আ.লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা

              শিগগিরই হচ্ছে না ঢাকা মহানগর আ. লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি

 

 

/ওআর/

লাইভ

টপ