নির্বাচন নিয়ে জনগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে: মেনন

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৭:৪৫, জুন ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৭, জুন ১৯, ২০১৯

রাশেদ খান মেনন

সদ্য সমাপ্ত উপজেলা নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে জনগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। উপজেলা নির্বাচনেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মসজিদে মসজিদে ঘোষণা দিয়েও ভোটারদের আনা যায় না। এটা কেবল নির্বাচনের জন্য নয়, গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।

বুধবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতা রাশেদ খান মেনন বলেন, রোগ এখন উপজেলা নির্বাচন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। পাঁচ দফা উপজেলা নির্বাচনে তার দল, এমনকি আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা করুণ। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বলেও কোনও লাভ হচ্ছে না। বরং তাদের যোগসাজশ রয়েছে। এর ফলে নির্বাচন ও সামগ্রিক নির্বাচনি ব্যবস্থা সম্পর্কে জনমনে অনাস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ভোট দেওয়ার ব্যাপারে জনগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশ যদি দেশের ওপর নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে তাহলে রাজনৈতিক দল শুধু নির্বাচন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায়ও প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলবে।

১৪ দলের শীর্ষ এই নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী ১৪ দলের শরিকদের নিজ পায়ে দাঁড়াতে বলেছেন। কিন্তু গণতান্ত্রিক স্পেস না থাকলে কেউ সংগঠন, আন্দোলন, ভোট নিয়ে এগুতে পারে না।

সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রার পথে কাঁটা হয়ে রয়েছে আর্থিক খাতের দুর্গতি। ব্যাংক খাতে লুটপাট, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা কারও অবিদিত নয়। ঋণখেলাপির দায়ে ব্যাংকগুলো ন্যুব্জ। চলছে তারল্য সঙ্কট। করের টাকা দিয়ে ব্যাংকের ঘাটতি মূলধন পূরণ করার জন্য বরাদ্দ এবারেও রাখা হয়েছে বাজেটে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন ভূমিকা দূরে থাক, ব্যাংকগুলোকে কার্যকর নজরদারি করতেও অক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। নিজের অর্থই তারা সামাল দিতে পারেনি এবং তার কোনও জবাবদিহিতা দেশবাসী পায়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক প্রদান, ব্যাংক মালিকদের আবদারে ব্যাংক আইন সংশোধন করে ব্যাংকগুলোকে পারিবারিক মালিকানার হাতে তুলে দেওয়া, একই ব্যক্তি একাধিক ব্যাংকের মালিক বনে ব্যাংক খাতকে নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যাংক মালিক অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক সিআরআর নির্ধারণ করা—এসবই ব্যাংক খাতে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন আর এক টাকাও ঋণখেলাপি হবে না। অথচ ওই প্রজ্ঞাপনের এক মাসের মধ্যে ঋণখেলাপির পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে যা এই বাজেটের পরিমাণের এক পঞ্চমাংশ। আর ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি কীভাবে নির্দিষ্ট হবে তা জানা নেই।

তিনি বলেন, কালো টাকা দিয়ে জমি ফ্ল্যাট কেনার বিশেষ সুবিধা দান, বিপুল পরিমাণ পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার কোনও প্রক্রিয়া না থাকা কেবল ধনীদের জন্য। আর দেশের বিকাশমান মধ্যবিত্ত এক্ষেত্রে বিশেষ চাপের মধ্যে থাকবে।

মেনন বলেন, জিয়া-এরশাদ প্রবর্তিত কালো টাকা সাদা করার বিধান ’৯০ পরবর্তীতে কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকলেও, পরে আবার তা চালু হয় শাসকশ্রেণির প্রয়োজনেই। বেগম খালেদা জিয়া, সাইফুর রহমানের কালো টাকা সাদা করার কথা তো আমরা সবাই জানি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন টাকা যাতে পাচার না হয় তার জন্য বিনিয়োগে স্ট্রিমিং করতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ যাবত এ ধরনের ব্যবস্থা থেকে বিশেষ সাফল্য পাওয়া যায়নি। এতে ফ্ল্যাট-জমির দাম মধ্যবিত্তের আওতার বাইরে চলে যাবে। আর অনৈতিকতাই উৎসাহিত হবে।

তিনি বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিবর্তনের জন্য জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নই আমাদের অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারত। হেফাজতে ইসলামসহ কিছু ধর্মবাদী দল এর বিরোধিতা করেছে। জানি না এখানেও আপস হয়েছে কিনা। কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে স্বীকৃতি দিলেও, তারা নিচের দিকে কোনও পরিবর্তন আনতে রাজি নয়। এমনকি জাতীয় সঙ্গীতকে রবীন্দ্র সঙ্গীত বলে আখ্যা দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ঠ্যাং ভেঙে দেবে বলে হুমকি দিয়েছে। দাবি করেছে বেফাক একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তারা তাদের হুজুরের কথা ছাড়া সরকারের কোনও নির্দেশ মানবে না।

মাদ্রাসা শিক্ষা প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমি নুসরাত হত্যা, ওই সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন, বালকদের ওপর বলাৎকারের যেসব খবর প্রকাশ হয় প্রতিদিন সে কথা বলবো না। কারণ, এটা কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নয় এখন এক চরম সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। কিন্তু এই সব ব্যক্তিরা যারা আমার কথার জন্য ফাঁসি চেয়ে বিক্ষোভ করেছে, আমাকে মুরতাদ ঘোষণা করেছে তারা প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কী ধরনের উক্তি করেন ইউটিউট খুলে তা শোনার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। শবে বরাতের রোজা হারাম, শাড়ি পরে নামাজ হয় না—ওয়াজ মাহফিলে এরকম ফতোয়া হরহামেশা দিচ্ছে। পঞ্চগড়ে খতমে নবুয়তের সম্মেলনে আহমদিয়াদের তো বটেই, আহলে হাদিস, পীরতন্ত্রী, তবলিগের সাদপন্থীদের সকলকেই কাফের ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ করে ইউটিউবে প্রতি মুহূর্তে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি ও সাম্প্রদায়িকতা প্রচার করছে।

এসময় নিজের কথার প্রমাণ হিসেবে ইউটিউবে প্রচারিত দেশবিরোধী, সরকারবিরোধী, সংস্কৃতিবিরোধী, সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কয়েকটি বক্তব্য সম্বলিত দুটি পেন ড্রাইভ স্পিকারকে ও তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেন রাশেদ খান মেনন।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি আক্ষেপ করে বলেন, সাইবার সিকিউরিটি আইনে সাংবাদিকসহ যে কাউকে গ্রেফতার করা হয়, কিন্তু এদের করা হয় না। জামায়াত রাজনৈতিকভাবে পরাজিত, বিচ্ছিন্ন, বিভক্ত। কিন্তু এদের মাধ্যমেই সমাজজুড়ে সাম্প্রদায়িক মানসিকতার বিস্তার ও একটি উত্তেজনাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করার বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ালে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অশান্তি সৃষ্টি হবে। বঙ্গবন্ধু এ কারণেই ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিযুক্ত করে সংবিধানের বিধান করেছিলেন। আমরা সেই জায়গায় থাকতে পারিনি।

/ইএইচএস/টিএন/

লাইভ

টপ