বিএনপিকে চাপে রাখতে কাদের পাশে পাচ্ছেন অলি?

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ২৩:৩৮, জুন ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:১৭, জুন ২৭, ২০১৯

সংবাদ সম্মেলনে যা থাকছে অলি আহমদের আলোচনায়বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনা করে কর্মসূচি দেবেন এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ। বৃহস্পতিবার বিকালে (২৬ জুন) এ বিষয়ে তিনি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করবেন। তার এই উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে সমর্থন রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর। সংবাদ সম্মেলনে দলটির প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। তবে জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে বিএনপির বাইরে অলি আহমেদের উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত এবং যৌক্তিক?

এলডিপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পর থেকে রাজনৈতিকভাবে ২০ দলীয় জোটের গুরুত্ব কমে। নিষ্ক্রিয় রাখা হয় জামায়াতে ইসলামীসহ পুরো জোটকেই। বিষয়টি নিয়ে অলি আহমেদ নিজেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিকবার। জানিয়েছেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে এবং এই তৎপরতায় বিএনপি নেতারা নেতৃত্ব দিতেও ব্যর্থ। এ কারণেই অলি আহমেদ রাজপথে সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

অলি আহমেদের ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতার দাবি, এলডিপি সভাপতি সক্রিয় হওয়ার পেছনে প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর সমর্থন রয়েছে। বিশেষ করে চায়না ইস্যুতে ক্ষমতাসীন সরকারকে চাপে রাখার কৌশল থাকতে পারে, এমন দাবিও করছেন এলডিপির কোনও কোনও নেতা। আর এক্ষেত্রে ইস্যু হিসেবে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টিকে সামনে আনা হলে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলবে বলে মনে করেন তারা।

এলডিপি সভাপতি অলি আহমেদ অবশ্য বলছেন, তার কর্মসূচি বা সংবাদ সম্মেলনের পেছনে ২০ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তই কারণ। বুধবার (২৬ জুন) রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমি তো সংবাদ সম্মেলনে খুল্লাম খুল্লাই বলবো। তবে এটুকু বলতে পারি, গত ১৩ মে ২০ দলীয় জোটের মিটিং হয়েছিল। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং বিএনপির পক্ষ থেকে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলকে বলা হয়েছিল, আপনারা মেহেরবানি করে নিজ উদ্যোগে, নিজ দল থেকে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি গ্রহণ করবেন। সুতরাং ওটাই করতেছি।’

২০ দলীয় জোটকে রেখে নতুন মঞ্চ তৈরি করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা তো কালকে (বৃহস্পতিবার) বলা যাবে। আমার কাছে তো এমন কোনও খবর আপাতত নেই।’

তার এই নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তো অফিসিয়ালি অলি আহমেদের উদ্যোগ সম্পর্কে কিছু জানি না। একটি দলের নিজস্ব স্বাধীনতা আছে। তিনি তার মতো করে সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন। এটা তার ও দলের স্বাধীনতা। সেখানে আমাদের তরফ থেকে কিছুই তো করার নেই। তবে অবশ্যই ২০ দলের ব্যাপারে আমরা সে ধরনের কোনও খবর পাইনি বা সে ধরনের আলামত পাইনি, তারা ২০ দল ভেঙে যাচ্ছেন নাকি ২০ দলে থাকছেন না। বিষয়টিকে আমরা সেভাবে দেখছি না।’

এলডিপির প্রভাবশালী এক নেতা জানান, বিতর্কিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সংসদে যোগ দেওয়ায় কার্যত বিরোধী রাজনীতি দেশে অনুপস্থিত। এ কারণেই নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করছেন এলডিপি সভাপতি। নেতা হিসেবে ‘বিকল্প’ হতে চাইছেন তিনি।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এক নেতার সন্দেহ, ‘অলি আহমেদের এই প্রকল্পে বিএনপি নেই, প্রতিবেশীদের ইশারা থাকতে পারে।’

অন্তত ১০টি রাজনৈতিক দলের উচ্চপর্যায়ের নেতারা মনে করেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে অলি আহমেদের সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। যেখানে মূল দল বিএনপি এ বিষয়ে কার্যকর কোনও উদ্যোগ গ্রহণ থেকে বিরত আছে, সেখানে অলি আহমেদ কেন সক্রিয়।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গুরুত্বপূর্ণ ও ২০ দলীয় জোটের সাবেক শরিক একটি দলের চেয়ারম্যান বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে জামায়াতে ইসলামী বরং কোণঠাসা অবস্থায় আছে। আর এ কারণে অলি আহমেদকে সামনে রেখে তারাই সক্রিয় হতে চাইছে। লোকবল, সাংগঠনিক পরিস্থিতি সব মিলিয়ে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্য হিসেবে এলডিপি সভাপতিকে সামনে রাখছে জামায়াতে ইসলামী।’

২০ দলীয় জোটের সাবেক একটি শরিক দলের নেতা বলছেন, জামায়াতের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়োজন। তারা নতুন নামে আসতে চায়। নতুন সংগঠন করতে চায়। যদি সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম ও অলি আহমেদকে জামায়াত পায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। দু’জন মুক্তিযোদ্ধা, জামায়াত তো লোক দেবে, সংগঠন আছে। জামায়াতের মতো একটি সংগঠন অধীনে আছে, তাহলে মাঠ তো তিনি ভরতে পারবেন। জামায়াতের রিহ্যাবিলিটেশন তো তার হাতেই হচ্ছে।’

২০ দলীয় জোটের এক নেতা বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি অলি আহমেদ চান, অথচ নেত্রী জেলে যাওয়ার পর থেকে এলডিপি সভাপতি একটা মিটিংয়েও কিন্তু আসেননি। তাকে ২০ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক করা হয়েছিল। এটার উদ্যোক্তা ছিলেন আন্দালিভ রহমান পার্থ।’

সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থের ভাষ্য, ‘আমি কোথাও যাচ্ছি না। দাওয়াত পাইনি, দাওয়াত পেলেও যেতাম না।’

বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি জানিয়েছেন, তিনি অলি আহমেদের সংবাদ সম্মেলনে যাচ্ছেন না।

২০ দলীয় জোটের সাবেক শরিক একটি দলের প্রধান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অলি আহমেদ বুঝতে পেরেছেন বিএনপি ২০ দলকে বেশি কার্যকর করবে না। কারণ, জামায়াত আছে। ২০ দল নিষ্ক্রিয় থাকলে তিনিও নিষ্ক্রিয়। কিন্তু তিনি ২০ দল ছাড়তে পারছেন না, ছাড়লে গালিগালাজ করবেন মানুষ। এ কারণে তিনি বলেছেন কর্মসূচি দেবেন। এখন তিনি কর্মসূচি দিলে যদি বিএনপি আসে তাহলে নেতৃত্ব তার। এটা তো বিএনপি করতে পারে না। বিএনপি ধীরস্থিরভাবে যাচ্ছে। বিএনপি তো জামায়াতকে সাইডে রেখেছে।’

সংবাদ সম্মেলনের আগের দিন আজ বুধবার বিকালে ২০ দলীয় জোটের কয়েকটি দলের প্রধানকে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বলা হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে না যেতে। বিএনপির জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, অলি আহমেদের দাওয়াত পেলেও তারা সেখানে যাচ্ছেন না।

এনপিপি নেতা অ্যাডভোকেট ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘যাবো না। যত কথাই বলি না কেন, ২০ দলীয় জোটে থেকে আরেকটি জোট করতে কেন যাবো?’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু জানান, তিনি অলি আহমেদের সংবাদ সম্মেলনে যেতে সাড়া পেয়েছিলেন। কিন্তু যেতে পারছেন না।

জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের মহাসচিব অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদের মনে করেন, ‘বিএনপির প্রতি জোট শরিকদের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করার পর কোনও যুক্তি ছাড়া সংসদে যোগদান করা এবং বৃহত্তর স্বার্থের কথা বলা হলেও শরিকদের সামনে পরিষ্কার কোনও ব্যাখ্যা না দেওয়ার কারণে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন হওয়ার পর কার্যকর কোনও পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারেনি বিএনপি। এসব কারণে অলি আহমেদ কর্মসূচি দেবেন। তবে জোট করা বা ২০ দলীয় জোট ভেঙে চলে যাওয়া, এসব নয়।’

জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা জানান, তার দলের প্রতিনিধি এই সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেবেন এবং সেখানে অলি আহমেদ কী বক্তব্য দেন তার ওপরেই নজর থাকবে জামায়াতের। তবে জোট ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি অনেকটা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন এই নেতা।

জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, ‘বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছে, জাতি কী পেলো? চারদলীয় জোট হওয়ার পর থেকে জোট বড় হয়েছে, শক্তি কমেছে। ১৮ দল হলো, শক্তি কমলো, ২০ দলীয় জোট হলো, শক্তি কমলো।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক একটি দলের প্রধান মনে করেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর জামায়াতকে বিএনপি একপাশে ঠেলে রেখেছে, এটাই তাদের চটিয়ে দেওয়ার কারণ। তারা চাপ তৈরি করার চেষ্টা করছে অলি আহমেদকে দিয়ে। কিন্তু বিএনপি যদি তাদের বাদ রাখতে চায়, তাহলে ব্যাখ্যা দিয়ে বাদ দিক। তারা তা করবে না। তারা আমাদের, বিদেশিদের দেখাচ্ছে, ‘এই দেখো, জামায়াত নেই আমাদের সঙ্গে। কিন্তু এভাবে তো জোটগত রাজনীতি হয় না।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক আরেকটি দলের জ্যেষ্ঠ এক নেতা বলেন, ‘অলি আহমেদের এই ঘটনার মধ্যে প্রথম থেকে জামায়াত আছে। জামায়াত যে শুধু আছে তা না। তারা বিএনপির সঙ্গেও আছে। কিন্তু এইখানে প্রোঅ্যাকটিভ। বিএনপির কিছু করার নেই। ধীরে ধীরে নিজেদের নিঃশেষ করার দিকে যাচ্ছে। ফ্রন্টের ছয় মাসব্যাপী বৈঠক নেই। শেষ বিচারে শেখ হাসিনা উইনিং অবস্থানে। কোনও দিকের খোঁচানো থেকেই অলি আহমেদ মাঠে নামছেন, যদিও এটা পরিষ্কার না। বিস্ময়কর লাগে। তবে তিনি কিছুই করতে পারবেন না।’

অলি আহমেদের সংবাদ সম্মেলন নিয়ে যখন রাজনীতিতে আলোচনা, ওই সংবাদ সম্মেলনের একদিন আগে তার দল ছেড়েছেন প্রেসিডিয়ামের তিন সদস্য। তারা হলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল করিম আব্বাসী, মো. আবদুল্লাহ ও মো. আবদুল গণি। এরা সবাই একাধিকবার বিএনপি থেকে মনোনীত হয়ে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এদের একজন মো. আবদুল্লাহ জানান, তিনি রাজনীতি থেকেই বিদায় নিয়েছেন।

 

আরও পড়ুন: 

অলিকে সামনে রেখে জামায়াতের নতুন মিশন?

/এএইচআর/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ