ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন চিন্তা অলিকে সামনে রেখেই সক্রিয় হচ্ছে জামায়াত

Send
সালমান তারেক শাকিল ও আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ২৩:২২, জুন ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৩০, জুন ৩০, ২০১৯

বিএনপি, অলি আহমদ ও জামায়াত

এলডিপি’র চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ সক্রিয় হওয়ায় চাপে পড়েছে বিএনপি। আর এই চাপ উত্তাপ ছড়াচ্ছে দলটির দুই জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটে। দুই জোটের শরিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। এ অবস্থায় দুই জোটকেই নতুন আঙ্গিক দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে বিএনপিতে। শুরু হয়েছে জোটগুলোর নেতৃত্বের কাঠামোতে পরিবর্তন আনার আলোচনাও।

২০ দলীয় জোটের শরিক ও বিএনপির নেতারা মনে করছেন, খালেদা জিয়ার ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে অলি আহমদ রাজনীতিতে ‘নতুন অবস্থান’ তৈরি করতে চাইছেন। এক্ষেত্রে ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ গঠনে তিনি প্রাথমিকভাবে ২০ দলীয় জোটের শরিক কল্যাণ পার্টি ও খেলাফত মজলিসের মৌন সম্মতি পেলেও জাগপা ও জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা পেয়েছেন।তবে কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম মঞ্চে অংশগ্রহণ করলেও পরবর্তীতে তিনি এ বিষয়ে আগ্রহ নাও দেখাতে পারেন,এমন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন তার দলের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা।

বৈঠকে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারাবিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের কয়েকটি শরিক দলের নেতারা বলছেন, ২০১১ সাল থেকে টানা আট বছর রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা অবস্থায় থাকার কারণে জামায়াতই অলি আহমদকে সামনে আনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। আর এই ভূমিকার বিষয়টি অলি আহমদের দলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা বাংলা ট্রিবিউনের কাছে স্বীকার করেছেন।

এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামী ১ জুলাই চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে অলি আহমদ আলোচনা সভা করবেন। তার এই সভাকে কেন্দ্র করে আমরা শোডাউন করবো। এতে জামায়াতের নেতাকর্মীরা থাকবেন।’

বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) ‘জাতীয় মুক্ত মঞ্চ’ যে ১৮টি দফা দিয়েছে, তার ভিত্তিতে জোটের পক্ষ থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে শুরুতেই কর্মসূচি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শাহাদাত হোসেন সেলিম।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, ২০ দলীয় জোটের টানাপোড়েনের মধ্যেই অলি আহমদের জাতীয় মুক্তি মঞ্চ গঠনকে কেন্দ্র করে চাপে আছে দলটির হাইকমান্ড।একইসঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অভ্যন্তরেও কাদের সিদ্দিকী ও মাহমুদুর রহমান মান্নাকে কেন্দ্র করে অস্বস্তি রয়েছে বিএনপির। দলটির সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে কাদের সিদ্দিকী এবং কোনও ধরনের কর্মসূচি না থাকায় মাহমুদুর রহমান মান্নার চাপা ক্ষোভ রয়েছে। তাদের ঘনিষ্ঠজনেরা বলছেন, বিএনপিই নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সক্রিয় প্রতিবাদ করেনি এবং এতে জনগণের কাছে ভুল বার্তা গেছে।

সূত্রের ভাষ্য, জোটগত রাজনীতির এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ২০ দলীয় জোট বা ঐক্যফ্রন্ট কোনও জোটকেই ভাঙতে চায় না বিএনপি।এক্ষেত্রে উভয়জোটের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে আগামী দিনে এর একটি সমাধান করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে দলটির হাইকমান্ডে।শনিবার (২৯ জুন) বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়মিত বৈঠক হবে। এই বৈঠকে ছাত্রদলের সংকট সমাধানের পাশাপাশি এ বিষয় দুটি আলোচনায় উঠবে, আগাম তথ্য সূত্রটির।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রের খবর, ২০ দলীয় জোটে অলি আহমদ ও জামায়াতে ইসলামীকে কেন্দ্র করে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে কাদের সিদ্দিকীর আল্টিমেটামের বিষয়টি মাথায় রেখেই ভিন্ন সমাধানের উপায় খুঁজছে বিএনপি।এক্ষেত্রে দুটো জোটেরই নেতৃত্বের ফরমেশনে পরিবর্তন আসতে পারে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে আলাপকালেও এ বিষয়ে সম্পর্কে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

একই মঞ্চে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, ফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং নেতৃত্ব নিয়ে তার নিজেরও আগ্রহ কম। গত বছরের শেষ দিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের প্রক্রিয়ার সময়ও তিনি একাধিকবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, তিনি যৌথ নেতৃত্বে বিশ্বাসী। এছাড়া, বিএনপির ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদসহ কয়েকজন নেতার আপত্তি আছে খ্যাতনামা এই আইনজীবীকে নিয়ে।

সূত্র বলছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নতুন ফরমেশনে কামাল হোসেনকে প্রধান উপদেষ্টা, কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে প্রধান নেতা (প্রতীকী অর্থে) হিসেবে রাখা হবে। এক্ষেত্রে কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মাহমুদুর রহমান মান্না, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, আবদুল মালেক রতনসহ প্রথম সারির নেতাদের মধ্য থেকে মুখপাত্র, সমন্বয়ক ইত্যাদি পদগুলো বিন্যাস করা হবে। বর্তমানে ঐক্যফ্রন্টে আহ্বায়ক কামাল হোসেনসহ মোস্তফা মোহসীন মন্টু প্রধান সমন্বয়ক ও মির্জা ফখরুল মুখপাত্র হিসেবে আছেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য আবদুল মালেক রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এমন চিন্তা ফরমালি বৈঠকে প্লেস করা হয়নি। খালেদা জিয়া নেতৃত্বে এলে মন্দ কী, ভালো। এই চিন্তাটা ব্যক্তি-ব্যক্তির চিন্তা হচ্ছে।’

নেতৃত্বের ফরমেশনে কারও সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল মালেক রতনের ভাষ্য— ‘প্রয়োজন জোটের, ড. কামাল সাহেবের প্রয়োজন দিয়েও জোট এগুবে না, অন্য কারও প্রয়োজনে এগুবে না। জোটের বিষয়, জোটের আলোচনাতেই ঠিক হবে।’

কামাল হোসেনের দল গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। তিনিও মনে করেন, ‘এগুলো কোনও ব্যাপারই না। কামাল সাহেব তো কখনও নেতা বা নেতৃত্ব দেবেন, এসব কোনও ব্যাপার না। তিনি এখনও ফ্রন্টের আহ্বায়ক, এসবও তিনি বলতে চান না। সবাই বলছে, তিনি ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা। আমার মনে হয়, এগুলো কোনও বিষয়ই না।’

বিএনপি জোটের কয়েকটি শরিক দলের নেতারা বলছেন, জাতীয় মুক্তি মঞ্চের নেতৃত্বে অলি আহমদকে রাখার নেপথ্যে সক্রিয় জামায়াতে ইসলামী।  ২০১১ সাল থেকে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নেই বলেই এ কৌশল হাতে নিয়েছে দলটির বর্তমান নেতৃত্ব। জামায়াতের রাজনৈতিক উইং হিসেবে নতুন একটি সংগঠনের কার্যক্রম ভেতরে-ভেতরে চলছে এবং জাতীয় মুক্তি মঞ্চের কর্মসূচিকে সামনে রেখে নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করা সহজ হবে বলেও মনে করেন কয়েকজন জামায়াত নেতা।

বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করছেন কর্নেল (অব) অলি আহমেদঅলি আহমদ নিজেও জামায়াতে ইসলামীকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছেন বৃহস্পতিবার। এদিন মঞ্চের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছেন, ‘৭১ এর জামায়াত এবং ১৯ এর জামায়াত এক নয়। এখনকার জামায়াত দেশপ্রেমী।’

বিএনপি জোটের শরিক দলের নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়া গ্রেফতারের পর অলি আহমদ বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে আসতে চেয়েছেন। এতে বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতারা খুব একটা গা করেনি। বিএনপির কাছে গুরুত্ব না পাওয়ার কারণেই তিনি খালেদা জিয়া মুক্তির ইস্যুটিকে সামনে রেখে পৃথক অবস্থান তৈরি করতে চাইছেন, যার পেছনে সক্রিয় সহযোগিতা দিচ্ছে জামায়াত। যারা গত আট বছর ধরে প্রকাশ্য রাজনীতিতে অনুপস্থিত।

অলি আহমদের উদ্যোগে অংশগ্রহণ করার বিষয়ে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা ‘আমন্ত্রিত' হিসেবেই যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছিলেন এ প্রতিবেদককে। যদিও শুক্রবার (২৮ জুন) রাতে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা ও ঢাকার একটি অঞ্চলের দায়িত্বশীল এক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী এখনও বিএনপির সঙ্গেই আছে। অলি আহমদও আছেন জোটে। সেক্ষেত্রে তার সঙ্গ দেওয়াটা স্বাভাবিক।’ তবে কোন পর্যায়ে, কীভাবে যুক্ত থাকবে জামায়াত, এজন্য আরও  কয়েকদিন পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দেন এই নেতা।

অলি আহমদের পেছনে জামায়াতের সহযোগিতার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘খুবই ভালো, অলি সাহেব যদি জামায়াতকে নিয়ে নিতে পারেন, তাহলে খুব ভালো। বিএনপির বুকের ওপর থেকে চাপটা কমবে।’

জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেন, ‘বিএনপির করণীয় হচ্ছে— নিজেদের ঝামেলা ও সংকট মিটমাট করে সক্রিয় হওয়া। এখানে সমাধান হচ্ছে— জামায়াত জামায়াতের প্লেসে থাকুক, আমরা আমাদের প্লেসে থাকি।এক জোট হলেই সমস্যা।’
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আজকে যারা জামায়াত করে তাদেরকে বলতে হবে যে, তাদের পূর্বসূরীরা ভুল কাজ করেছে। তাদের দর্শন ভুল ছিল। এর জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, দুঃখ প্রকাশ করতে হবে।’

জাফরুল্লাহ আরও  বলেন,  ‘অলি আহমদের বক্তব্যের প্রথম অংশ ঠিক আছে। কিন্তু কেন তিনি জামায়াতকে ক্ষমা চাইতে বলেন না, এটা আমি জানি না। অলি আহমদের চাইতে জামায়াতের শক্তি বেশি, রাজনৈতিকভাবে তিনি জামায়াতকে সঙ্গে নিলে তার লাভ হবে।’

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আগে ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে আলোচনা করেই করেছি। কিন্তু অলি আহমেদের এই উদ্যোগ নিয়ে জোটের বৈঠকে কোনও আলোচনা হয়নি। তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে। আর জামায়াতকে নিয়ে দেওয়া যে বক্তব্য, সেটা তার নিজস্ব বিষয়।’

আরও পড়ুন:

নতুন নির্বাচন ও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’র ঘোষণা অলির

অলির সংবাদ সম্মেলন ফেসবুক লাইভে দেখলেন শীর্ষ জামায়াত নেতা

অলিকে সামনে রেখে জামায়াতের নতুন মিশন?

 

১৯৭১ আর ২০১৯-এর জামায়াত এক নয়: অলি আহমদ

অলি আহমদের সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত কর্মীরা

বিএনপিকে চাপে রাখতে কাদের পাশে পাচ্ছেন অলি?

 

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ