দলীয় এমপিরা সংসদে যোগ দেওয়ায় কতটা লাভ হলো বিএনপির?

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ২৩:০২, আগস্ট ৩১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০৬, আগস্ট ৩১, ২০১৯

সংসদ-বিএনপিসংসদে কথা বলার ‘সীমিত সুযোগ’কে কাজে লাগিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সংসদে যোগ দেওয়া সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। কিন্তু যোগ দেওয়ার ৪ মাসের মাথায় দলটির ভেতের প্রশ্ন উঠছে—সেই ‘সীমিত সুযোগ’ কতটা ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া গেছে। সংসদ সদস্যদের সংসদে শপথ গ্রহণে কতটা লাভবান হলো দল? 

একাদশ সংসদ নির্বাচনের দিনে রাতেই (৩০ ডিসেম্বর) ফল প্রত্যাখ্যান করে সংসদে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। কিন্তু ২৯ এপ্রিল অনেক নাটকীয়তার মধ্যে দিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া শপথ নেন দলটির ৪ সংসদ সদস্য। শপথ নেওয়ার রাতে মির্জা ফখরুল বলেন,  ‘‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সংসদে কথা বলার ‘সীমিত সুযোগকে’ কাজে লাগিয়ে সংসদ ও রাজপথের সংগ্রামকে যুগপৎভাবে চালিয়ে যেতে  আমাদের দল সংসদে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’’

বিএনপির নেতারা বলছেন, সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণে দলের কোনও লাভ হয়নি। হয়তো সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন দিক থেকে লাভবান হচ্ছে। তাদের শপথ নেওয়ায় বরং খালেদা জিয়ার মুক্তি আরও পিছিয়ে গেছে। কারণ বিএনপির সংসদে যোগ দেওয়ার মধ্যে দিয়ে ‘৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের ভোট ২৯ ডিসেম্বর রাতে করে ফেলার অপবাদ’ থেকে মুক্তি পেয়েছে সরকার এবং সংসদে বৈধতাও পেয়েছে তারা। ফলে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে সরকার ইচ্ছে অনুযায়ী বিএনপিকে নিয়ে খেলছে। সরকারের মর্জির ওপর নির্ভর করে বিএনপিকে আন্দোলন ও দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা যতটুকু সম্ভব করছি। সংসদে যে বক্তব্য রাখা দরকার, যারা সংসদে গেছে তারা রাখছেন। আর সংসদের বাইরে জনসভা, মানববন্ধনের মধ্যে দিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিচ্ছি।’

এতে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন কতটুকু ত্বরান্বিত হয়েছে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আন্দোলন যতটুক ত্বরান্বিত হওয়া বা এগিয়ে নেওয়া দরকার তা আগাচ্ছে। আর তার মুক্তি তো আমাদের ওপর নির্ভর করছে না, এটা সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। যেন সরকারের ইচ্ছা পজেটিভ হয় বা করানো যায়, সেই আন্দোলনই আমরা করছি।’

দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘সরকারের আচরণ কোনও জায়গায়ই ভালো নয়। তারা রাজপথেও আমাদের দাঁড়াতে দেয় না। অথচ তারা আশ্বস্ত করেছিল যে, সংসদে কথা বলতে দেবে। কিন্তু কয়েকদিন আগে টিআইবি প্রকাশিত রিপোর্টে এসেছে, সংসদে বিরোধী দলকে অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করে  সরকারি দল বক্তব্য দিয়েছে ১৬ মিনিট। তার মধ্যে বিরোধী দল যতটুকু পেরেছে, কথা বলছে। স্বাভাবিকভাবে আমরা যতটা প্রত্যাশা করছি, সেই অনুযায়ী সংসদে ভূমিকা রাখা যায়নি এবং রাজপথেও রাখা যাচ্ছে না। তবে এ অবস্থায় দীর্ঘদিন চলবে না। আস্তে আস্তে এর পরিবর্তন হবে।’ 

তবে, শামসুজ্জামান দুদু বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. জাহিদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সংসদে কথা বলার ভালো সুযোগ পেয়েছি আমরা। তবে, সরকারি দলের বিরোধিতা ছিল। তারপর আমরা কথা বলে যাচ্ছি। খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে যাচ্ছি। এখন সরকার মুক্তি না দিলে আমাদের করণীয় একটাই, আন্দোলনের মাধ্যমে নেত্রীকে মুক্ত করা।’ 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে বিএনপির সংসদে যোগ দিয়েছে। এটা ছিল কথার কথা। মূলত দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জাহিদুর রহমান শপথ নিয়ে নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে তারেক রহমানের নেতৃত্ব না মানার অভিযোগ ওঠার আশঙ্কা দেখা দেয়। এমন অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই অন্যদেরও শপথের অনুমতি দিয়েছেন তারেক রহমান।’

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের শপথে খালেদা জিয়া কিংবা বিএনপির কোনও লাভ হয়নি। বরং  ক্ষতি হয়েছে। নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। বিএনপির নিজের সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত অটল থাকতে পারে না, সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। সর্বশেষ রুমিন ফারহানার প্লটের আবেদনের মধ্যে দিয়ে আমাদের নিয়ে অন্যদের সমালোচনার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একটি সূত্র বলছে, বিএনপির নেতৃত্ব বারবার সরকারের কৌশলের কাছে পরাজিত হচ্ছে। প্রথম, নির্বাচনের আগে সরকারের কৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কোনও সুরাহা ছাড়াই নির্বাচনের অংশ নেয়। নির্বাচনের পরে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের বিনিময়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি দিতে হবে, সরকাররে সঙ্গে এমন কোনও সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি দল।  কিন্তু সরকার বিভিন্নভাবে চাপ দিয়ে সংসদ সদস্যদের শপথ নিতে রাজি করতে পেরেছে। সেখানেও সরকারের কৌশলের কাছে পরাজিত হয়েছে বিএনপি।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জরিম উদ্দিন সরকার বলেন, ‘নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কোনও সুরাহা ছাড়া নির্বাচনে অংশ গ্রহণ হয়তো ভুল ছিল। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী সময়ে অনেক কিছু আমাদের হাতে ছিল না। আর এই সরকার তো আমাদের নয় শুধু, কোনও দলকেই দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে দিচ্ছে না। বিভিন্ন অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেন, ‘সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং আওয়ামী লীগের শরিকদের অনেকে প্রকাশ্যে বলেছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট আগের রাতে হয়ে গেছে। তখন সরকার এক ধরনের বেকাদায় ছিল। সেই সুযোগে বিএনপির নেতৃত্ব চাইলে সংসদ সদস্যদের শপথের বিনিময়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে একটা সমঝোতায় আসতে পারতো। কিন্তু দলটি তা করতে পারেনি। আসলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অনেকে তাদের রাজনীতির স্বার্থে চান না শিগগিরই খালেদা জিয়া মুক্তি পান।’ খালেদা জিয়ার মুক্তি তারেক রহমানও চান কি না, তার কথাবার্তায়ও তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে  বলেও মন্তব্য করেন এই নেতা।    

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ