ব্রিটিশ আইনজীবীর প্রতিবেদনেই অভিযুক্ত জামায়াত: ৪ বছর পর দলের তদন্ত কমিটি

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ২৩:৫৩, অক্টোবর ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৮, অক্টোবর ১৮, ২০১৯

রবার্ট

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রশ্ন তুলেছিলেন ব্রিটিশ আইনজীবী জিওফ্রে রবার্টসন। ওইদিন লন্ডনের ডায়েটি স্ট্রিটে এই আইনজীবীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘রিপোর্ট অন দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন তিনি। ওই প্রতিবেদনে ‘জামায়াত নেতারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি  স্বাধীনতারবিরোধিতা করেছেন’  তিনি উল্লেখ করেন।  চার বছর পর তার এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে জামায়াতে। ইতোমধ্যে গঠিত হয়েছে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটিও।

জামায়াতের উচ্চপর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল জানান, ২০১৫ সালে ব্রিটিশ আইনজীবী বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং এর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তার ওই প্রতিবেদনের প্রকাশের পর তা গ্রন্থ আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেয় জামায়াত।

দায়িত্বশীল একটি সূত্রের দাবি, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগে সমর্থন দেন এবং ফান্ড সংগ্রহের চেষ্টা করেন। ডা. শফিকুর রহমান গ্রন্থটি প্রকাশের অনুমতি দেন। পরে এ বছরের শুরুর দিকে নেতাদের কেউ-কেউ প্রশ্ন তোলেন, খোদ জামায়াতের বিরুদ্ধেই লিখেছেন ব্রিটিশ আইনজীবী। বিষয়টি সামনে আসার পরই দলের ভেতরে সমালোচনা শুরু হয়। দলের নির্বাহী পরিষদের একাধিক সদস্যও  প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের একাধিক সদস্য জানান, প্রথম থেকে এই প্রতিবেদনটি বই আকারে প্রকাশের পেছনে সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমানের ভূমিকার কথাই জানতেন তাদের অনেকে। এই বছর বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতরে সমালোচনা শুরু হওয়ার একপর্যায়ে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ। দুই সদস্যের এই তদন্ত কমিটিতে আছেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ ও মোবারক হোসেন।

দলের উচ্চ পর্যায়ের একজন নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্রন্থটি কীভাবে প্রকাশিত হলো, কোন পন্থায় কীভাবে অর্থ সংগ্রহ হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরার জন্যই তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।’ দলীয় নিষেধাজ্ঞার কারণে কোনও সদস্যই নিজের পরিচয় উদ্ধৃত করতে রাজি হননি।

জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে কথা বলতে বিব্রত হচ্ছি। এ নিয়ে কোনও কথা বলতে পারবো না।’

জামায়াত নিয়ে কী আছে রবার্টসনের প্রতিবেদনের ভূমিকায়?

ব্রিটিশ আইনজীবী জিওফ্রে রবার্টসন ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভূমিকাতেই উল্লেখ করেছেন, জামায়াত ১৯৭১ সালে পাকিস্তান আর্মিকে সহযোগিতার পাশাপাশি স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে।

প্রতিবেদনের ৯ নম্বর পৃষ্ঠায় তার ভূমিকায় রবার্টসন লিখেছেন, ‘সরকার ইস্যুটিকে পুনরায় সামনে নিয়ে আসতে খুব আগ্রহী ছিল না। যদিও ‘জনতার আদালতে’ কিছু প্রমাণ উঠে আসে এবং কয়েকজন পাকিস্তানি জেনারেল ও তাদের বাংলাদেশি সহযোগীকে তাদের অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এই জনতার আদালতের কোনও আইনগত প্রভাব ছিল না। কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশে জামায়াতবিরোধী স্মৃতি ও পুরনো স্থানীয় শত্রুতা নতুন করে সামনে আসে। জামায়াত নেতারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি  স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছেন। 

রবার্টসনের প্রতিবেদনের ভূমিকায় যেভাবে বলা আছে জামায়াত প্রসঙ্গে

২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি যে সংবাদ সম্মেলনে রবার্টসন এই প্রতিবেদন তুলে ধরেন, সেখানেই তিনি দাবি করেছিলেন, তার পেছনে জামায়াত বা বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক দল ছিল না। তার বক্তব্য ছিল, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিদেশি আইনজীবীদের একটি সংগঠনের অনুরোধে তিনি ‘রিপোর্ট অন দ্য বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল’ শীর্ষক প্রতিবেদন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করেন।

রবার্টসনের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, ‘ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ ব্যানারে। তার প্রতিবেদনের শুরুতেই সংস্থাটির ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া থাকলেও বাস্তবে তা অকার্যকর।

২০১৫ সালে ‘বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের ফাঁসি’ বন্ধ করার আহ্বান করেছিলেন ব্রিটিশ আইনজীবী রবার্টসন। তিনি এও দাবি করেছিলেন, ১৯৭১ সালে অনেক মুক্তিযোদ্ধাও মানবতাবরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার ওই বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে, মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত নেতাদের দল জামায়াতও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং তাদের দলীয় ওয়েবসাইটে তা প্রকাশও করে।

জামায়াতের ওয়েবসাইটে ব্রিটিশ আইনজীবীর সংবাদ সম্মেলনের বিস্তারিত তথ্য

মানবতাবিরোধী বিচার নিয়ে রবার্টসন ছাড়াও টবি ক্যাডম্যান নামে আরেকজন ব্রিটিশ আইনজীবী প্রশ্ন তুলেছেন। এই আইনজীবীরা পরামর্শের বিনিময়ে ফি নেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিও ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলার নেপথ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময় হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘রবার্টসনের প্রতিবেদনের সঙ্গে জামায়াতের কোনও সম্পর্ক ছিল না’ বলে দাবি করেন দলটির ইউরোপের  মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা। বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিওফ্রে রবার্টসনের বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, এর সঙ্গে জামায়াতের কোনও সম্পর্ক নেই। সারা পৃথিবীতে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বিচার কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রবার্টসনের সংবাদ সম্মেলনটিও সে রকমই।’

‘তাহলে জামায়াত তদন্ত কমিটি করেছে’ এই ব্যাপারে আপনি কী বলেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে ব্যারিস্টার আবু বকর বলেন, ‘এটা কেন করবে, সেটা আমার জানা নেই।’

প্রতিবেদনটি বই আকারে প্রকাশে ডা. শফিকুর রহমানের ভূমিকার দাবিটি অস্বীকার করে আবু বকর মোল্লা বলেন, ‘এই প্রতিবেদন বই আকারে প্রকাশ করতে ডা. শফিকুর রহমান জড়িত, এমন কিছু আমি শুনিনি। এ বিষয়ে তার কোনও ভূমিকা আছে বলে জানি না। ভূমিকা থাকারও কোনও কারণ থাকার কথা নয়। যেহেতু এটি জামায়াতের কোনো বিষয় নয়, যেহেতু রবার্টসন এটি স্বাধীনভাবে করেছেন।’

২০১৫ সালের ওই প্রতিবেদনের ওপর মিস্টার রবার্টসন পরবর্তী সময়ে কোনও ফলোআপ প্রকাশ করেননি বলে বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে এই প্রতিবেদককে জানান রবার্টসনের ব্যক্তিগত সহকারী সাবরিনা বোদরা (boudra). 

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ