আবার শাপলা চত্বরে জড়ো হওয়ার হুমকি হেফাজতের

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২১:২৪, অক্টোবর ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:১৪, অক্টোবর ২৩, ২০১৯

 বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে বক্তব্য পাঠ করছেন একজন নেতা

ভোলায় কথিত ‘ধর্ম অবমাননা’ ও ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনার বিচারের দাবিতে ডাকা প্রতিবাদ সমাবেশে কঠোর ভাষায় সরকারের সমালোচনা করেছে হেফাজতে ইসলাম। এ ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে দায়ীদের বিচার করতে না পারলে সরকারকে ক্ষমতা ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন হেফাজত নেতারা। একইসঙ্গে এ ঘটনার বিচার আদায়ে প্রয়োজনে আবারও মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।

মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে এ প্রতিবাদ সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম।

হেফাজতে ইসলামের জনসভায় প্ল্যাকার্ড দেখাচ্ছেন কিছু কর্মী

ঢাকা মহানগর হেফাজত নেতারা জোহরের নামাজের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে সমবেত হলে তাদের সমাবেশের কারণে দৈনিক বাংলা মোড় থেকে পল্টন মোড় পর্যন্ত যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সমাবেশে হেফাজতের নেতা-কর্মীরা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে কথিত ‘কটূক্তিকারী’ ও ভোলার সংঘর্ষের বিষয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

সমাবেশে ঢাকা মহানগর হেফাজতের সভাপতি মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, এ বেয়াদবি দেশের তৌহিদি জনতা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। যে সরকার আল্লাহ পাকের হাবিবের ইজ্জত রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের ক্ষমতায় থাকার কোনও অধিকার নেই। তাদের ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে অনতিবিলম্বে এ দেশের শান্তিপ্রিয় নিরপেক্ষ লোকের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক।

বায়তুল মোকাররমে হেফাজতে ইসলামের প্রতিবাদ সভা

ঢাকা মহানগর হেফাজতের সভাপতি মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী একইসঙ্গে ২০ দলীয় জোটভুক্ত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব।  সমাবেশে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। কোনও মুসলমান অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ে আঘাত করেননি। আমরা সম্প্রীতিকে রক্ষা করতে চাই। তবে নবী (সা.) এর বিষয়ে বেয়াদবি হবে এটাকে মেনে নেওয়া হবে না। যে সরকার নবী (সা.) এর মর্যাদা রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থ হবে, সে সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনও অধিকার নেই।

এসময় ভোলায় ‘তৌহিদি জনতার’ বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার ও গ্রেফতারদের মুক্তি দাবি করেন তিনি। একইসঙ্গে ওসি-এসপিসহ প্রশাসনের যারা এ অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানান তিনি।

এসময় সরকারের উদ্দেশে কঠোর ভাষায় তিনি বলেন, আপনারা (সরকার) যদি এসব করতে ব্যর্থ হন, আমরা বসে থাকবো না। আঙুল চুষবো না।

সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করেছেন এমন অভিযোগ করে এসব চুক্তি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী। তিনি বলেন, ‘এসব চুক্তি প্রত্যাহার করুন। তাতে যদি ব্যর্থ হন, তাহলে আপনার ক্ষমতায় থাকার কোনও অধিকার নেই।’

 হেফাজতে ইসলামের প্রতিবাদ সভা

সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ও হেফাজত নেতা মাওলানা মাহফুযুল হক বলেন,  আমরা হেফাজতে ইসলামসহ দেশের তৌহিদি জনতা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে প্রত্যাখান করছি।

তিনি আরও বলেন, যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের অতিসত্ত্বর বিচার করতে হবে। ভোলার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৪-৫ হাজার মানুষকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এ মামলা অতিসত্ত্বর প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যথায় আন্দোলনের মাধ্যমে শুধু মামলা প্রত্যাহার নয়, যে সরকার মামলা প্রত্যাহার করবে না, সে সরকারকে এ দেশে থেকে উৎখাত করা হবে।

ভোলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান হেফাজত নেতা মুফতি ফয়জুল্লাহ। তিনি বলেন, ভোলার পুলিশ সুপার ও বোরহানউদ্দিন থানার ওসিকে প্রত্যাহার করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। 

বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে হেফাজতে ইসলামের প্রতিবাদ সমাবেশ

হেফাজত নেতা মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আমাদের প্রতিবাদ কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়। কিন্তু, প্রশ্ন হলো ইমানি দাবির সঙ্গে যতটুকু রাজনীতির প্রসঙ্গ জড়িয়ে যায় আমরা চাইলেও তা এড়িয়ে চলতে পারি না। ভোলায় তৌহিদি জনতাকে গুলি করে হত্যা করা হলো। আর প্রধানমন্ত্রী গণভবনে প্রেস ব্রিফিং এ হুমকি দেন যারা পুলিশের ওপর আক্রমণ করেছে তাদের বিচার করা হবে। অভিযোগের কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর মমতা শুধু পুলিশের প্রতি, এদেশের তৌহিদি জনতাকে আপনি ভালোবাসেন না।’

এই নেতা বলেন, ‘পুলিশের জীবন যদি বিপন্ন হয়, গুলি যদি ছুড়তেই হয় তাহলে পায়ে গুলি করার বিধান। সে নিয়ম উপেক্ষা করে বুকে, পিঠে ও মাথায় গুলি করে তৌহিদি জনতাকে হত্যা করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় এটা সুপরিকল্পিত, ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড।

বায়তুল মোকাররমে হেফাজতে ইসলামের প্রতিবাদ সভা

মাওলানা মামুনুল হক আরও বলেন, যখন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কথা বলা হয়,  যখন আপনার (প্রধানমন্ত্রী) বিরুদ্ধে কেউ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয় ২৪ ঘণ্টাও পার হওয়া লাগে না, নিখোঁজ হয়ে যেতে হয় বাংলাদেশ থেকে।  আমাদের জিজ্ঞাসা, মহানবীর (সা.) ইজ্জত,  আপনার (প্রধানমন্ত্রী) এবং বঙ্গবন্ধুর চেয়ে কম না বেশি?

ভোলার ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে মামুনুল হক আরও বলেন, যদি যথাযথ বিচার করতে ব্যর্থ হন, আল্লামা আহমদ শফীর ডাকে মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে  আমরা আবার শাপলা  চত্বরে যাবো।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের দায়িত্বশীল হিসেবে সব হত্যাকাণ্ডের দায় আপনার ওপর বর্তায়। আল্লাহ ও নবীর ইজ্জতের নিরাপত্তা যদি দিতে না পারেন আপনার গদি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।

ঢাকা মহানগর হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনী বলেন, আমরা কোনও সরকার বুঝি না, পুলিশ বুঝি না, আর্মি বুঝি না। এ হত্যার বিচার যদি না করা হয়, তাহলে বাংলার মাটিতে লাখ লাখ মুসলমান ভাইয়েরা এ সকল দায়িত্ব পালন করার জন্য প্রস্তুত আছে। জনগণ যদি বিচারের দায়িত্ব হাতে নিয়ে নেয়, কোনও বাহিনী এ দায়িত্ব আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না।

মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী বলেন, শাপলা চত্বরে  আমরা রক্ত দিয়েছি।  আবার রক্ত দিতে হয়েছে ভোলায়। সরকারের কাছে জানতে চাই আরও  কী রক্তের প্রয়োজন আছে ?  আমার রসুলের বিরুদ্ধে যে কথা বলবে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার জন্য আমরা এক সাগর রক্ত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি।

খতমে নবুয়াতের মহাসচিব নজরুল ইসলাম বলেন, শহীদদের রক্ত বৃথা যায় না। শাপলা চত্বরে রক্ত দিয়েছি, বৃথা যায়নি। নাস্তিক মুরতাদরা বাংলাদেশ স্থান পায় নাই।

হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল লতিফ নিজামী বলেন, আজ ইসলামবিরোধী শক্তি মাঝে মাঝে পরীক্ষা করে ইসলাম এ দেশে টিকে আছে কিনা। তারা তৌহিদি জনতাকে ক্ষিপ্ত করে তুলতে চায়। তারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে আসছে। আমি তৌহিদি জনতাকে সতর্ক থাকার জন্য আহ্বান করছি।

বায়তুল মোকাররমের সামনে নবীকে (সা.) কথিক কটূক্তির প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলামের প্রতিবাদ সমাবেশ

ঢাকা মহানগর হেফাজত নেতা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ভোলায় নবী প্রেমিকদের ওপর যে আক্রমণ হয়েছে এটা নতুন বিষয় নয়।  আমরা লাগাতার কর্মসূচি চাই। যারা গুলি চালিয়েছে তাদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাতে হবে। এ প্রতিবাদ সভায় যদি কানে পানি না যায়, তাহলে আবার আরেকটি শাপলা চত্বরের অচিরেই ঘটবে।

হেফাজতের নেতা মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, সরকার প্রধানকে বলতে চাই, আপনি যত ভালো কাজ করেন না কেন, কিন্তু যদি আল্লাহ ও রাসুলের (সা.) সম্মান রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে আপনি কিছুই করেন নাই। জেনে রাখুন, এ অসম্মান করার কারণে আপনার পতন  অনিবার্য। যদি বাঁচতে চান, জান্নাতে যেতে চান ওলামাদের কথা মেনে নিন।

সমাবেশ শেষে মিছিল করার পূর্ব ঘোষণা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোনও মিছিল করেনি হেফাজত। সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন, মাওলানা  আব্দুল লতিফ নেজামী, মহিউদ্দিন রব্বানী, বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, জাফরুল্লাহ খান, মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস, নাজমুল আহসান, লোকমান মাজহারি, মাওলানা শফিক উদ্দিন, নজরুল ইসলাম, মুফতি সাখাওয়াত,   আতাউল্লাহ আমিন, মুফতি ফখরুল, মাওলানা আবুল কাশেম প্রমুখ।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর নবী (সা.) সম্পর্কে অপ্রীতিকর মন্তব্য করার অভিযোগ এনে কিছু ব্লগারের শাস্তির দাবিতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরের সামনে সমাবেশ করার ঘোষণা দেয় অরাজনৈতিক ইসলামি জোট হেফাজতে ইসলাম। তবে সমাবেশ শেষে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সেখানে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন হেফাজতের নেতা-কর্মীরা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ায় সরকার সেখান থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ৬ মে পল্টন, বায়তুল মোকাররমসহ মতিঝিল ও এর আশেপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।  পরে রাতে ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ নামে বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে তাদের শাপলা চত্বর থেকে হটিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে এখনও দুটি টেলিভিশন চ্যানেল এবং অধিকার নামের একটি মানবাধিকার সংগঠনের কার্যকলাপ বন্ধ করে দেয় সরকার।  

 

 

/সিএ/টিএন/

লাইভ

টপ