আমি বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়ি আসছি: কাজী জাফর

কুমিল্লা প্রতিনিধি।।২০:১২, আগস্ট ২৭, ২০১৫

কাজী জাফরমৃত্যুর আগের দিন বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কাজী জাফর আহমদ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে কর্মরত সাংবাদিকদের ফোন করে জানিয়েছিলেন, তিনি বৃহস্পতিবার নিজ গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়াতে আসছেন। ওইদিন বিকেলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে বসে চা পান করবেন। তিনি বলেছিলেন, ‘অনেক দিন তোমাদের সঙ্গে দেখা হয় না, আমি বৃহস্পতিবার সকালে বাড়িতে আসবো, তোমরা সবাই আসবে। আমি তোমাদের সঙ্গে বসে গল্প করবো।’ কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে তিনি আসলেন না, এলো তার না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার খবর।

তার ব্যক্তিগত সহকারী গোলাম মোস্তফা জানান, বাসার লোকজন বাড়ি আসার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। ট্রেনের টিকিটও কেটে রাখা হয়। ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস জুসও পান করেন তিনি। হঠাৎ শরীরটা একটু ক্লান্ত বোধ করায় তিনি বিশ্রামে যান। বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় কাজী জাফর আহমদকে কমলাপুর রেল স্টেশনে নেওয়ার জন্য সব প্রস্তুত করা হয়। তাকে ঘুম থেকে জাগানোর চেষ্টা করলে কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে তাকে গুলশান ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে তার মৃত্যুর সংবাদ শুনে নিজ নির্বাচনি এলাকা ও জন্মস্থান চৌদ্দগ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। সকাল ৮টায় কাজী জাফর আহমদের মৃত্যুর সংবাদ জানান তার ব্যক্তিগত সহকারী গোলাম মোস্তফা।

১৯৩৯ সালের ১ জুলাই কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজের্লা বিখ্যাত চিওড়া কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কাজী জাফর আহমদ। তার বাবা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কাজী আহমদ আলী ও মা তাহেরা বেগম। ছয় ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি মেঝো। তার তিন মেয়ে রয়েছে।

মেধাবী ছাত্র হিসেবে কাজী জাফর আহমদ খুলনা জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীকালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স ও এমএ (ইতিহাস) পাস করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে এমএ এবং এলএলবি কোর্স সম্পন্ন করা সত্ত্বেও কারাগারে চলে যাওয়ায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। কাজী জাফর আহমদ ১৯৫৯-১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি ১৯৬২-১৯৬৩ সালে অবিভক্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (এপসু) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসন ও শরীফ শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে কাজী জাফর আহমদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্রজীবন শেষে কাজী জাফর আহমদ শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন।

১৯৭২-১৯৭৪ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী তখন ছিলেন ন্যাপের চেয়ারম্যান। এরপর ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনাইটেড পিপলস্ পার্টির (ইউপিপি) প্রথমে সাধারণ সম্পাদক ও পরে চেয়ারম্যান হিসেবে সক্রিয়ভাবে পার্টির সাংগঠনিক দায়িত্ব ও জাতীয় রাজনীতিতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিপরিষদের শিক্ষামন্ত্রী হন।

১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির জন্মলগ্ন থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৬-১৯৯০ সালে তিনি জাতীয় পার্টির সরকারে পর্যায়ক্রমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বন্দর-জাহাজ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক উপদেষ্টা, ১৯৮৯-১৯৯০ সালে বাংলাদেশের অষ্টম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৬-১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের উপনেতা এবং ১৯৮৯-১৯৯০ সালে জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন। ১৯৮৬-১৯৯৬ পর্যন্ত পর পর তিনবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদান নিয়ে সৃষ্ট বিরোধে ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর কাজী জাফর আহমদকে দল থেকে বহিষ্কার করেন এইচ এম এরশাদ। এরপর দলের একাংশকে নিয়ে জাতীয় পার্টি নামে নতুন দল গঠন করেন কাজী জাফর। ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর বিশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর গত বছরের ২৫ জানুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজী জাফর আহমদ জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

/এমডিপি/এএইচ /

লাইভ

টপ