মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে খালেদার প্রশ্নে অনড় বিএনপি

আ.লীগকে চাপে রাখার কৌশল!মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে খালেদার প্রশ্নে অনড় বিএনপি

Send
সালমান তারেক শাকিল০৮:০১, জানুয়ারি ২৯, ২০১৬

খালেদা জিয়ামহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নিয়ে খালেদা জিয়ার প্রশ্নের স্বপক্ষেই অনড় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি।পাশাপাশি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের পরিচয় প্রকাশেও সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখবে দলটি।বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিরূপণ করা রাষ্ট্রের জন্য জরুরি।বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির দাবিদার আওয়ামী লীগের উচিৎ এই সংখ্যা নিরূপণ করা।এ লক্ষ্যে সরকারকে অব্যাহতভাবে রাজনৈতিক চাপে রাখার পক্ষে বিএনপি নেতারা।
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু মনে করেন, সরকার তো মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের পরিচয়ে বেশি জনপ্রিয়। তাদের তো বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ। দুদু এও বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলাটি দেওয়া হয়েছে হীনম্যনতার কারণে। সরকার ভয়ে আছে, ম্যাডামের কোন বক্তব্যে মানুষ জেগে উঠে। এ ভয়ে সরকার মামলা দিয়েছে।’
জানা গেছে, বিএনপি সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা, ৩০ লাখ শহীদসহ নানা প্রসঙ্গে চাপা পড়া বিষয়গুলো সামনে আনবে। এটি রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করবে দলটি। তবে বিএনপির সবাই আবার একরকম ভাবছেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন,‘মনে হয় না, এটা বিএনপির স্ট্যান্ড। এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখা ভালো।আমাদের এখানে অনেকে তো জিয়াউর রহমানকেও রাজাকার বলেছেন। অথচ তিনিই দেশের প্রথম সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা। তো যার যে সম্মান, সেভাবেই দেখতে হবে।’

বুধবার রাতে বিএনপির একাধিক শীর্ষ ও প্রভাবশালী নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, যে বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন আছে, কিন্তু উত্তর নেই-এমন বিষয়গুলোকে আলোচনার মধ্যে আনবে তারা। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার দুপুরে এক আলোচনা সভায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন,‘শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি। কীভাবে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে তিনি শুনেছেন। যুদ্ধে যাদের ভূমিকা নেই তাদের দিয়ে জাতির পিতা বা স্বাধীনতার ঘোষক বানাতে চাইলেই বানানো যায় না।’

আগের রাতে বিএনপির প্রভাবশালী এক উপদেষ্টা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার ভাতা দেয়। শহীদ পরিবারকেও ভাতা দেওয়া হচ্ছে। নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। তো, কাদের দেওয়া হচ্ছে সেটি তো প্রকাশ করতে হবে। বাংলাদেশের নাগরিকদের জানা জরুরি কারা ভাতা পাচ্ছে। বিষয়টি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যও সম্মানের। শহীদদের নাম প্রকাশ করা হলে সেটি ইতিহাস সংরক্ষণে কাজে লাগবে।’

যদিও এ নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাননি ওই উপদেষ্টা। এদিকে, বৃহস্পতিবার ও বুধবার বিকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের দেওয়া বক্তব্যেও দলটির অবস্থান পরিষ্কার বোঝা গেছে। গয়েশ্বর বুধবার বলেছিলেন, ‘তারা ৩০ লাখ হোক বা ৬০ লাখ হোক তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। তাদের তালিকা থাকবে না কেন? কী কারণে থাকবে না? এই শহীদদের নাম উল্লেখ করে এলাকায় এলাকায় স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করতে হবে।’

তবে গয়েশ্বর এবং রিজভীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে খালেদা জিয়ার আরেক উপদেষ্টা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘তাদের বক্তব্য যুতসই নয়। জিয়াউর রহমানই তো শেখ মুজিবুর রহমানকে ইনিশিয়াল দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন। তো যিনি মধ্যমনি, তাকেই বিতর্কিত করার চেষ্টা শুভ নয়।’

দলীয়ভাবে সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন, এমন আশঙ্কা থাকায় নিজের পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছা পোষণ করেন এই প্রবীণ নেতা। তিনি বলেন,‘জিয়াউর রহমান সাহেব ৩০ মার্চের ঘোষণাতেই পরিষ্কার হয়েছে বিষয়টা। সে ঘোষণায় শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে সরকার গঠন হয়েছে, সেই সরকারকে সমর্থন দিতে মানুষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এর আগে ২৭ শে মার্চের ঘোষণাতেও তিনি বঙ্গবন্ধুকে কোট করেছেন। তার ৩০ মার্চের ঘোষণায় নতুনত্ব এসেছিলো। তো, রিজভী ভূমিকা নেই বললে, সেটি তো জিয়াউর রহমান সাহেবের কনট্রাডিক্টরি।’

এই নেতা বলেন,‘রিজভীর বক্তব্য ইমোশনাল। তিনি জেনে বুঝে এমন বলতে পারেন না। রাজনৈতিক বিরোধিতা করার অনেক বিষয় আছে, মীমাংসিত বিষয়গুলোকে সামনে আনা নিজেদের জন্য লজ্জার।’

এ বিষয়ে বিএনপি নেতা আহমেদ আযম খান বলেন,‘যারা বলছেন, তারা জানেন কেন বলছেন।’

জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা করতে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ৭২ সালে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু মাসাধিককাল পর সেই প্রকল্পটি বন্ধ যায়। এটি খুব কঠিন এবং অসাধ্য কাজ।

 

আদালতে যাবেন খালেদা

এদিকে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হলেও বিচলিত নয় বিএনপি। দলটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া আদালতে যাবেন। এবং শেষ পর্যন্ত এ মামলা টিকবে না।

বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান খান দুদু বলেন,‘ম্যাডাম আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তিনি আদালতে যাবেন।’ আরেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন,‘ম্যাডাম রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা মোকাবেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।’

যদিও এর আগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন—মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে খালেদা জিয়ার বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে।

তার দাবি, গত ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশনেত্রী যে বক্তব্য প্রদান করেছেন, তার একটি ক্ষুদ্র অংশের বিকৃত ব্যাখ্যা করে এই মামলাটি দায়ের করা হয়। এ নিয়ে ক্ষমতাসীন মহলের কিছু সংখ্যক তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও নেতারা যখন বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন আমরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেছিলাম, যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।

ফখরুল বলেন, সেই বিবৃতিতে আমরা দৃঢ়ভাবে বলেছিলাম- তার বক্তব্যের উদ্ধৃত অংশটি ছিল- ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণের জন্য, যাতে করে শহীদদের প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা প্রদান করা যায়।’ বিএনপি চেয়ারপারসনের ২১ ডিসেম্বর প্রদত্ত বক্তব্যের কোথাও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হতে পারে এমন কোনও বক্তব্যের লেশমাত্র নেই বলেও দাবি করেছেন ফখরুল।

 

/টিএন/

/আপ-এএ/

লাইভ

টপ