আত্মজীবনীতে উপেক্ষিত সাবেক প্রেমিকারা বিদিশাকে লেখা এরশাদের প্রেমপত্র

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ০০:৪০, মার্চ ০২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:১৬, মার্চ ০২, ২০১৬

এরশাদের আত্মজীবনী ও স্বৈরাচারের প্রেমপত্র গ্রন্থের প্রচ্ছদপ্রায় নয়শ পৃষ্ঠার ‘আমার কর্ম আমার জীবন’ শীর্ষক আত্মজীবনীতে নিজের রাজনৈতিক ও শাসনকালের নানাধর্মী বিবরণ থাকলেও তার প্রেম ও প্রেমিকাদের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নিজের স্ত্রী বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদের সঙ্গে তার রাজনৈতিক ও দলের কর্মপদ্ধতিগত বিরোধ থাকলেও তার প্রতি অফুরান ভালোবাসার কথা আত্মজীবনীতে তুলে এনেছেন সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধান। তবে সযত্নে এড়িয়ে গেছেন আলোচিত প্রেমিকা-স্ত্রী বিদিশা, জিনাত মোশাররফ ও মেরিদের প্রসঙ্গ।
ঢাউস জীবনীতে বিদিশাকে লেখা তার প্রেমপত্র প্রসঙ্গ বাদ দিলেও সে চিঠিগুলো কিন্তু ছাপা হয়েছে বই আকারে। ২০০৯ সালে প্রকাশিত বিদিশার ‘স্বৈরাচারের প্রেমপত্র’ গ্রন্থে তার ২২টি চিঠি সন্নিবেশিত আছে।
গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ২০০০ সালের ২০ নভেম্বর এরশাদ গ্রেফতার হন। পরের বছরের ৯ এপ্রিল জেল থেকে মুক্তিলাভ করেন তিনি। ওই সময়টাতেই বিদিশার সঙ্গে জাপা প্রধানের সম্পর্ক তুঙ্গে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের থাকার সময় বিদিশা এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন নিয়মিত। জেলখানার পাশেই একটি বাড়ির ছাদে বসে এরশাদকে দেখা দিতেন তিনি। বিদিশার গ্রন্থমতে, এর আগে বিএনপি শাসনামলে ৫ বছর কারাগারে থাকাকালে এই বাড়ির ছাদে উঠেই জিনাত, নীলা চৌধুরীসহ আরও অনেক প্রেমিকা এরশাদের সঙ্গে দেখা করতেন।

‘স্বৈরাচারের প্রেমপত্র’ বই থেকে জানা যায়, জেলে থাকতে জাপা প্রধান প্রায় প্রতিদিনই তার প্রেমিকা বিদিশাকে প্রেমপত্র লিখতেন। ইংরেজি ভাষায় লেখা প্রতিটি চিঠি সুতা দিয়ে পেঁচানো থাকত। ওই চিঠিগুলোর বাহককে ৫শ’ টাকা করে বিনিময় দিতে হত বলেও বিদিশা গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেন।

বিদিশা তার ভূমিকায় লেখেন, ‘এরশাদের প্রতিটি চিঠিই ছিল ইংরেজিতে। আর সে ইংরেজি ছিল ভুলে ভরা।... আরেক জায়গায় বিদিশা জানান, প্রেমপত্রগুলোয় এরশাদ তার তৎকালীন জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অবস্থান, জেলজরিমানা, তার স্ত্রী রওশন, বর্তমানে বিএনপির চেয়ারপারসন উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন, মেজর খালিদসহ নানা প্রসঙ্গে লিখতেন। তবে বেশিরভাগ চিঠিতেই তার সম্পদের বিষয়ে ধারণা দেওয়া থাকত।

বিদিশা লিখেন, ‘এরশাদকে জিজ্ঞাসা করলেই সে সব সময় বলে থাকে, সে নাকি খুবই গরিব একজন মানুষ। ... অথচ আমার কাছে লেখা তার ওই চিঠিগুলোতে, বলার আনন্দে, তার অনেক সম্পদের কথাই বলে ফেলেছে।’

বিদিশা এক জায়গা লিখেছেন, ‘এরশাদের চিঠিগুলো এরশাদের চরিত্রের মতোই অস্থির।’

বইটিতে বিদিশা এরশাদের মূল ইংরেজি চিঠির প্রকাশ এবং বাংলা অনুবাদ করেছেন। পাশাপাশি চিঠির কোনও বিষয়ে এরশাদের মন্তব্যে ব্রাকেটবন্দি করে নিজের অভিমতও লিখে দিয়েছেন। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে প্রথম সপ্তাহে এরশাদ প্রেমপত্র লেখেন বিদিশাকে। ২১তম প্রেমপত্রটি তিনি লিখেন ৭ ফেব্রুয়ারি। শেষ চিঠিটিতে কোনও তারিখ নেই।

পুরো ২২টি চিঠিতে এরশাদ তার তৎকালীন প্রেমিকা বিদিশাকে বিদ, লাভ, মাই লাভ, মাই লাইফসহ নানা শব্দে সম্বোধন করেছেন। তৎকালীন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত শাহতা জারাবকে বাবা বলে সম্বোধন করতেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

গ্রন্থভূক্ত শেষ ২২তম চিঠিতে এরশাদ লেখেন, ‘বিদ, তোমার অসুস্থতার কথা জেনে খুবই দুঃখিত হলাম। আশা করি, তুমি আমার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছো। সকলের ব্যাপারেই খুব সতর্ক থাকবে। শেষ পর্যন্ত আমাকে ক্ষমতার সঙ্গে সমঝোতা করতে হচ্ছে। আমার আর কোনো উপায় ছিল না। পার্টি, লাঙ্গল, এবং সর্বোপরি নিজেকে রক্ষা করা আমার জন্য জরুরি ছিল। তারা আমার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে- আমার বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা হবে না, আর কোনো হয়রানি করা হবে না। কিন্তু তারপরও আমাকে এই পাঁচটি মাস থাকতে হবে, যাতে কেউ মনে না করে যে সরকারের সঙ্গে আমার কোনো ধরণের আঁতাত হয়েছে। আমরা যদি জরিমানার অর্ধেকও দিতে পারি, তাহলে হয়তো ফেব্রুয়ারির মধ্যেই আমি বের হতে পারবো।’ চিঠির শেষে বিভিন্ন শব্দে সম্বোধন থাকলেও এই চিঠিতে কোনও সম্বোধন ছিল না। 

এ নিয়ে জানতে চেয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ফোন করা হলে তিনি কোনও মন্তব্য করেননি।

জানা যায়, এরশাদ ২০০০ সালে আকস্মিকভাবে ঘোষণা করেন, প্রায় দুই বছর আগে বিদিশা নামের এক তরুণীকে বিয়ে করেছেন তিনি। তাদের এরিক এরশাদ নামে একটি ছেলে আছে। পুত্রের প্রথম জন্মদিনে বিয়ের কথা প্রকাশ্যে আনেন তিনি। বিদিশার সঙ্গে এই বিয়ের পর থেকেই গত ১৮ বছর রওশন ও এরশাদ পৃথক বাসায় থাকেন।

আত্মজীবনীতে উপেক্ষিত সাবেক প্রেমিকারা

আত্মজীবনী ‘আমার কর্ম আমার জীবন’ গ্রন্থে নিজের প্রথম প্রেম ও প্রেমিকার কথা অকপটে জানালেও বাকি প্রেমিকাদের সম্পর্কে কলম ধরেননি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নেই বিদিশা, জিনাত, নীলা চৌধুরী, মেরি বা অন্য কারও নাম। সম্প্রতি আকাশ প্রকাশনী থেকে বইটি বেরিয়েছে। এ নিয়ে একটি উন্মোচন সভাও করেছিলেন এরশাদ। ওই সভায় বহু প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়ে বলেছিলেন, ইচ্ছা থাকলেও অনেক প্রসঙ্গ আনতে পারিনি।

জীবনীতে ‘আত্মপক্ষ’ শিরোনামে ভূমিকায় এরশাদ লিখেছেন, ‘আক্ষরিক অর্থে এটি আমার আত্মজীবনী নয়, সুদীর্ঘ জীবনের খণ্ডাংশ মাত্র। ফলাও করে প্রচার করার মতো ঘটনা আমার জীবনে অনেকই ঘটেছে। কিন্তু তার সব কিছুই অর্থপূর্ণ নয়।’

প্রথম প্রেমিকার কথা জানাতে গিয়ে আত্মজীবনীতে ‘সেই চিঠি: ভালো লাগার প্রথম অনুভূতি’ অধ্যায়ে এরশাদ বলেছেন, ওই সময় রংপুরের কারমাইকেল কলেজে বিএ শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। তার নিজের ভাষায়, ‘আমার নিচের ক্লাসের একটি মেয়ে একদিন আমাকে একটি চিঠি লেখে। প্রতিদিন ও ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে কলেজে আসতো’। (পৃষ্ঠা: ৬৫)

এরশাদ জানিয়েছেন, প্রায় ৬৬ বছর আগের সেই সময়ে ছেলেমেয়ের মধ্যে কথা বলার রেওয়াজ ছিল না। চিঠির আদান-প্রদান ছিল অনেক দূরের ব্যাপার। বই দেওয়া-নেওয়া চলত। এরশাদের প্রথম প্রেমিকা চিঠিটি বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে দিয়েছিলেন। সাধারণ খামে করে দেওয়া চিঠির ভাঁজে ভাঁজে ছড়ানো ছিল গোলাপের পাঁপড়ি ও বকুল ফুল। এরশাদ লিখেছেন, ‘তরুণ বয়সে কোনও মেয়ের কাছ থেকে চিঠি পেলে হৃদয়ে যে কী রকম অনুভূতি ঢেউ খেলে যেতে পারে, তা কেবল ওই সৌভাগ্যের মুহূর্তটি যাদের জীবনে এসেছে, তারাই অনুভব করতে পারেন, অন্যেরা নয়।’ (পৃষ্ঠা: ৬৫)

১৯৫৫ সালে পারিবারিক পছন্দে গাইবান্ধার এসডিও খান সাহেব উমেদ আলীর বড় মেয়ে রওশনকে বিয়ে করেন সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট এরশাদ। বিয়ের পর প্রায় এক বছর বাবার বাড়িতেই ছিলেন তার স্ত্রী। এ সময়টাকে জীবনের ‘সবচেয়ে বিরহের সময়’ বলেছেন এরশাদ। স্ত্রী রওশনকে প্রতিদিন একটি চিঠি লিখতেন তিনি প্রেমময় সম্বোধনে। আত্মজীবনীতে এ সম্পর্কে লিখেছেন তিনি, ‘সেইসব দিনের কথা মনে করে নিজেকে এখন অপরিচিত মনে হয়।’

বিদিশাকেও রাজনীতিতে এনেছিলেন এরশাদ। ২০০৪ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। চুরির মামলা দিয়ে তিনি বিদিশাকে জেলেও পাঠিয়েছিলেন। এরশাদ-বিদিশার বিচ্ছেদ ছিল দেশজুড়ে তখন আলোচনা-সমালোচনার বিষয়। কিন্তু আত্মজীবনীতে এসব ঘটনার কিছুই যুক্ত করেননি তিনি। বিদিশার নাম উল্লেখ না করে এক স্থানে তিনি অবশ্য লিখেছেন, ‘আমার জীবনেও ওই বেদনাদায়ক ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর রওশন একটি বাক্যও উচ্চারণ করেনি কিংবা আমার কাছে কোনো কৈফিয়তও চায়নি।’ (পৃষ্ঠা: ৭০)

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিদিশা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এগুলো নিয়ে বলার মতো রুচি নেই এখন। তবে ভালো লাগছে রওশনকে অস্বীকার করেননি। এটা ভালো লাগছে আলহামদুলিল্লাহ। আমাকে স্বীকার করুক বা না করুক, একজনকে তো করেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, লোকটা কারু কথা শোনে না। তার এসব লেখার কোনও পাত্তা নাই।’

/এসটিএস/এজে/আপ-এনএস/

লাইভ

টপ