একান্ত সাক্ষাতকারে জাসদ (আম্বিয়া) সভাপতি নুরুল আম্বিয়াশিরিন আক্তারকে সাধারণ সম্পাদক রেখে কোনও ঐক্য নয়

এমরান হোসাইন শেখ২১:১৩, মার্চ ২৪, ২০১৬




আম্বিয়াশিরিন আক্তারকে সাধারণ সম্পাদক রেখে কোনও ঐক্য হবে না বলে জানিয়েছেন জাসদ ভেঙে বেরিয়ে আসা অংশের সভাপতি শরিফ নুরুল আম্বিয়া। বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানান।
তিনি জানান, জাসদ দলীয় প্রতীক ‘মশাল’ ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ দলের স্থায়ী কার্যালয় পেতে চায়। এজন্য তারা আইনি প্রক্রিয়াসহ সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে রয়েছে দাবি করে শিগগিরই তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করবেন। ঐক্যের সম্ভাবনা আছে কি না- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কাউন্সিল বাতিল করে শিরিন আক্তারকে না সরালে ঐক্যের কোনও সম্ভাবনা নেই।
দল বিভক্ত হওয়ার জন্য অন্য অংশের প্রধান হাসানুল হক ইনুকে দায়ী করে নুরুল আম্বিয়া বলেন, দলীয় প্রধানের একগুঁয়েমি ও বিশেষ ধারাকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার কারণে দল এই অবস্থায় পতিত হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: দেড় দশক একটি ঐক্যবদ্ধ ধারায় পরিচালিত হওয়ার পর হঠাৎ করে দলে ভাঙনের কারণ কী?

শরিফ আম্বিয়া: কাউন্সিল অধিবেশন অগণতান্ত্রিক ও রীতিনীতি বহির্ভূতভাবে পরিচালিত হওয়ার কারণে এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এর পেছনে কিছু রাজনৈতিক কারণও রয়েছে। সেটা হলো দলের একটি বড় অংশের জাসদের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে সরকারের সঙ্গে থাকার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। কিন্তু দলীয় প্রধানসহ ক্ষুদ্র একটি অংশ দলীয় স্বাতন্ত্র্য বাদ দিয়ে সরকারের লেজুড়ভিত্তি নীতি অনুসরণের কারণে দলের ভেতরে ক্ষোভ বিক্ষোভ ছিলো। এ অবস্থায় কাউন্সিলরদের মত উপেক্ষা করে বহুল আকাঙ্ক্ষিত একটি ভারসাম্যপূর্ণ কমিটির পরিবর্তে একধারার কমিটি গঠনের প্রচেষ্টার কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বিস্ফোরণের জন্ম দেয়। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করবার জন্য দলীয় প্রধানের নেতৃত্বে ও প্রশ্রয়ে কাউন্সিল অধিবেশনে অচলবস্থা, নিরাপত্তাহীনতা ও সিনিয়রদের ‍সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার ঘটনা ঘটে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী গোপন ব্যালটের পরিবর্তে তথাকথিত কণ্ঠভোটে ইনু-শিরিনের আগাম ঘোষণা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্ম দেয়। ফলে কাউন্সিলররা বিভ্রান্ত ও বিমূঢ় হন। বিক্ষোভ করে অনেকে বেরিয়ে যান। আমিসহ সিনিয়র কাউন্সিলরা এটা নিবৃত্ত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করি। কিন্তু দলীয় প্রধান তাতে কর্ণপাত করেননি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনও ভূমিকা তো পালন করেননি, বরং নিজেই একটা অবস্থান নিয়ে ফেলেন এবং সীমা লঙ্ঘনকারীদের আস্কারা দেন।

বাংলা ট্রিবিউন: মূল বিরোধটা কোথায় ছিলো?
শরিফ আম্বিয়া: কাউন্সিলে যেসব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল তাতে কোনও অংশের মতোবিরোধ ছিলো না এবং এখনও নেই। আমরা গঠনতন্ত্র সংশোধন করে ইনু সাহেবকে আবারো সভাপতি হওয়ার সুযোগ করে দিই। স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে ১৪ দলের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু সমস্যা বাদে সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে। আমরা গোপন ব্যালট চেয়েছি। কিন্তু দলীয় প্রধান ইনু-শিরিনের আগাম ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে ফেললেন। সভাপতির ব্যাপারে আমাদের কোনও আপত্তি ছিলো না। আপত্তি তো ছিলো সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে। কারণ শিরিন আক্তার হলেন তেমনই একজন যে ইনু যেটা বলবেন সেটা করবেন। এজন্য তিনি রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে নিজস্ব অনুসারীদের দিয়ে একটি পকেট কমিটি চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন। আর নিজস্ব মতবাদ চাপিয়ে দেওয়ার জন্য দলের ভেতরে তিনি অনুসারীদের সাহায্যে শক্তিপ্রয়োগ, মাস্তানি গুন্ডামি করান। আমরা মনে করি, শিরিন সাধারণ সম্পাদক হলে প্রকৃতপক্ষে দলের পৃথক কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। এটা সরকারি দলের লেজুড়ে পরিণত হবে।
তিনি বলেন, আমাদের দলের অনেক রকম চিন্তা ও স্রোতধারা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ১৫/১৬ বছর ধরে এসব ভিন্ন ভিন্ন স্রোতধারাকে একত্রিত করে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে স্বৈরচার, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী, জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামে পথ চলতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু এই কাউন্সিলে একটি বিশেষ ধারাকে পুরো দলের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হয়। কিন্তু অন্য সব ধারা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর রয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনারা কী মনে করেন দলের বড় অংশ আপনাদের সঙ্গে রয়েছে?
শরিফ আম্বিয়া: এটা মনে করার কিছু নেই। সর্বশেষ স্ট্যান্ডিং কমিটির মেজরিটি, দলীয় সংসদ সদস্যদের মেজরিটি ও কাউন্সিলরদের মেজরিটি আমাদের সঙ্গে আছে এবং দলীয় ঐক্যের যে ধারা সেই ধারা সঙ্গে আছে।

বাংলা ট্রিবিউন: শোনা যায়, দলীয় মতের বাইরে গিয়ে আপনাদের দলীয় প্রধান ইনু মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছেন। ঘটনা কতটুকু সত্য?
শরিফ আম্বিয়া: ঘটনাটি মোটেও অসত্য নয়। আমাদের দলের একটি অবস্থান ছিলো যে সরকার ও দল পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করার সুবিধার্থে দলের শীর্ষ দুই পদধারী অর্থাৎ দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সরকারের মন্ত্রিসভায় যাবেন না। আর গেলেও পদ ছেড়ে দিয়ে তিনি যেতে পারেন। কিন্তু সভাপতি সাহেবের একগুঁয়েমি ও অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করার জন্য দলীয় অবস্থান থেকে সরে গিয়ে তিনি মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। এই কাউন্সিলেও ওই বিষয়টি আলোচনায় আসে। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনিষ্পন্ন রেখেই আমাদের সামনের দিয়ে অগ্রসর হতে হয়।
এর পেছনে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন,‘আমাদের মতো ছোট রাজনৈতিক দলের পক্ষে সরকারের সব সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা সম্ভব নয়। এতে করে দলীয় বিকাশ ব্যাহত হয়। এসব বিবেচনায় এই বিষয়গুলো আলোচনায় ছিলো এবং এখনও আছে।

বাংলা ট্রিবিউন: বিরোধ মিটিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে কোনও উদ্যোগ হয়েছে কী না?
শরিফ আম্বিয়া: আমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে কোনও প্রচেষ্টা এখনও হয়নি। উনারা করছেন কী না সেটাও জানি না। তবে আমাদের দলের কিছু সিনিয়র সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষী ঐক্যের লক্ষ্যে আমাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। আমরা তাদের বলে দিয়েছি সর্বশেষ কাউন্সিল বাতিল ঘোষণা করে নতুন করে কাউন্সিলের উদ্যোগ নিতে হবে এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ কমিটি গঠন করে দলীয় ঐক্যকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের কথা স্পষ্ট, শিরিন আক্তারকে সাধারণ সম্পাদক রেখে কোনও ঐক্য নয়।

বাংলা ট্রিবিউন: ভবিষ্যতে দলের দুই অংশ একত্রিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন কী না?
শরিফ আম্বিয়া: রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। কাজেই এই ধরনের সম্ভাবনা যে নেই তা বলবো না। তবে এটা হবে এমন আশায় আমরা বসে থাকবো না। কারণ, দলের বড় অংশই আমাদের সঙ্গে রয়েছে। কাজেই আমরা গঠনতান্ত্রিকভাবে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাব। ছয়জন সংসদ সদস্যের মধ্যে মেজরিটি আমাদের রয়েছে। কাজেই সংসদে আমরাই দলের প্রতিনিধিত্ব করতে পারব এবং সেই অধিকারই আমাদের আছে।

বাংলা ট্রিবিউন: দলীয় প্রতীক ও কার্যালয়ের কী হবে?
শরিফ আম্বিয়া: নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের নির্ধারিত দলীয় প্রতীক রয়েছে। এই প্রতীক পেতে আইনি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার হবে আমরা সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখব। দলীয় প্রতীক ‘মশাল’ যাতে আমরা পাই তার জন্য আমরা কমিশনে আবেদন করবো। যেহেতু মেজরিটি আমাদের কাজেই আমরা আশা করছি এটা আমরাই পারবো। আর রাজনৈতিক বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে জাসদ অফিস বিভিন্ন জায়গায় ছিলো। পরে এই ভবনের তিন তলায় নিয়ে আসার পেছনে পুরো বিষয়টি আমি তত্ত্বাবধায়ন করেছিলাম। দলীয় কার্যালয় ‍আমি ও ইনু সাহেবসহ আমাদের ৪ জনের নামে হলেও এটা দলীয় ভবন। এই ভবনের পক্ষে ইনু সাহেবকে স্বাক্ষর করার সুযোগ তো আমরাই করে দেই। সেই সময় ইনু সাহেব এত বড় নেতা ছিলেন না। আজকে বড় নেতা হয়েছেন বলেই এটা তার ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়ে গেছে বিষয়টি তা নয়। আমি আপনাকে বলতে পারি আজকে আমরা এখানে নেই এটা সত্য কথা, কিন্তু কালকে (কালকে মানে নট টুমরো) আমরা সেখানে যাব। ওই অফিস থেকেই আমরা দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবো। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। চলে আসছি মানে ওই অফিস থেকে আমাদের উচ্ছেদ করা হয়নি। আমরা বাইরে আসছি মনে এটা নয় যে একেবারে চলে আসছি, তা নয়। আমরা লিগ্যাল, পলিটিক্যাল, স্যোশাল সব সাইড ঠিক করে ওই অফিসের দখল নেবো। কারণ কারও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। যে কোনও পরিস্থিতির ‍সৃষ্টি হলে আমরা তা মোকাবিলা করে অগ্রসর হবো।

বাংলা ট্রিবিউন: ১৪ দলে থাকার বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী হবে?
শরিফ আম্বিয়া: কাউন্সিলে পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন আলোচনা হলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে আমরা ১৪ দলের শরিক থাকবো। সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের আন্দোলনে বর্তমানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনুসরণ করবো।

বাংলা ট্রিবিউন: দলের পরিস্থিতি নিয়ে শরিকদের সঙ্গে কথা হয়েছে কী না?
শরিফ আম্বিয়া: আমরা ১৪ দলের শরিকদের পরিস্থিতি অবহিত করেছি। তারা বিষয়টি দেখার কথা বলছেন। সরকারের অনেকে এই ঘটনায় ব্যথিত হয়েছেন। শুভকামনা যতই করুন তাতে খুব একটা লাভবান হওয়ার সুযোগ কম। দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের কারও কিছু কথার সুযোগ খুবই সীমিত। যারা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন তারা চাইলেই কেবল ঐক্য সম্ভব আর যদি না চায় তাহলে ‌এই মুহুর্তে ঐক্যবদ্ধ হওয়া হয়তো সম্ভব হবে না। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে জাসদের কর্মীবাহিনী আবার দলকে ঐক্যবদ্ধ করবে।

বাংলা ট্রিবিউন: জনগণের প্রতি আপনার কী আহ্বান?
শরিফ আম্বিয়া: জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল একটি ঐতিহ্যবাহী সংগ্রামী দল। কাউন্সিলে যে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে আমরা তা অতিক্রম করতে সক্ষম হবো। দেশের ন্যায়সঙ্গত গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে সক্ষম হবে। দলের নেতাকর্মীদের আহ্বান জানাবো তারা যেন বিভ্রান্ত না হয়ে দলের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকেন।

/টিএন/

লাইভ

টপ