behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

মহাসচিব হয়েই কী করবেন ফখরুল?

বিশেষ প্রতিনিধি১০:৩৭, মার্চ ২৮, ২০১৬

ফখরুলমির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিব হচ্ছেন, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। কিন্তু মহাসচিব হয়ে তিনি কী করবেন বা কাজ করতে পারবেন কি না, এমন প্রশ্ন এখন বিএনপির পাশাপাশি দলটির শুভাকাঙ্খী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও উঠতে শুরু করেছে।
এ প্রশ্ন ওঠার প্রথম কারণ, ফখরুল দলের মধ্যে নিজের অনুগত নেতাদের বলয় সৃষ্টি করতে পারেননি। দ্বিতীয় কারণ, দফতর থেকে শুরু করে গুলশান কার্যালয় পর্যন্ত তার বিরোধী বলে পরিচিত নেতারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন।
তৃতীয় কারণ, লন্ডনে বসবাসরত দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভূমিকাও ততো অনুকূলে নয় ফখরুলের। চার নম্বর কারণ, চেয়ারপারসনকে বিভ্রান্ত করে সাড়ে তিন বছরের বেশি ফখরুলকে যারা ‘ভারপ্রাপ্ত’ রাখতে সক্ষম হয়েছেন, তাদের শক্তি কম নয়। আর সবশেষ কারণ হচ্ছে, মহাসচিবের পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব পদে যিনি আসছেন বলে মনে করা হচ্ছে, তিনিও ফখরুলের খুব একটা পক্ষে নন।
যতদূর জানা গেছে, মোহম্মদ শাহজাহান ও রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, এই দু’জনের মধ্য থেকে একজনকে দলের সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে শাহজাহান হলে ফখরুলের জন্য বিপদ কিছুটা কম। ফখরুল বিরোধীদের নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের সঙ্গে তার সদ্ভাব থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে তিনি কিছুটা নিরপেক্ষ। কিন্তু রিজভী সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব হলে সারাক্ষণই তিনি ফখরুলকে টেনশনে রাখবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

উত্তরাঞ্চলের অধিবাসী মির্জা ফখরুল এবং রিজভী আহমেদের মধ্যে ‘খারাপ সম্পর্কের’ বিষয়টি বিএনপিতে ওপেন সিক্রেট। ফখরুলের সব কাজের বিরোধিতা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে দু’ভাবেই করছেন রিজভী। কারণ মহাসচিব হওয়ার আকাঙ্খা তার মধ্যেও জেগেছে। তাছাড়া ইতোমধ্যেই তিনি ভিড়েছেন ফখরুলবিরোধী বলয়ে, অর্থাৎ গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের শিবিরে। প্রতিদিনই ফখরুলের কোনও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা থাকলে পাল্টা একটি বক্তৃতা দেওয়া চাই রিজভীর। উদ্দেশ্য হলো- ফখরুলের বক্তৃতা যেন কোনওভাইে মিডিয়াতে গুরুত্ব না পায়। এজন্য সপ্তাহে অন্তত ছয়দিন বিভিন্ন ইস্যুতে প্রেস ব্রিফিং করতে হচ্ছে তাকে। এ নিয়ে দলের সর্বস্তরে নানা আলোচনা-সমালোচনা আছে। খালেদা জিয়া নিজেও বিষয়টি সম্পর্কে জানেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত রিজভীকে এ বিষয়ে নিষেধ করা হয়নি।

শুধু তাই নয়, ঘনিষ্ঠদের রিজভী এও বলেছেন, পদোন্নতি হলেও তিনি দফতর ছাড়বেন না। কারণ দফতর নিয়ন্ত্রণে না থাকলে দলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে। সূত্রের দাবি, ফখরুলবিরোধী বলয় থেকেও রিজভীকে এমন পরামর্শই দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘দলে বলয় সৃষ্টি করা মহাসচিবের কাজ নয়। বরং সবাইকে অ্যাকোমোডেট করে সাংগঠনিক কাজ এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিএনপির রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়াই প্রধান কাজ।’

দলীয় সমর্থক বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ‘বিএনপির মতো বড় একটি দলের মহাসচিবকে সব সময়ই বৈরী পরিস্থিতি মোকাবেলা করে সামনের দিকে এগোতে হয়। মরহুম সালাম তালুকদার, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এমনকি সর্বশেষ খোন্দকার দেলোয়ারকেও দলের অনেকের বিরোধিতার মুখেও মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।’

তার মতে, আওয়ামী লীগ এমনকি জাতীয় পার্টির মধ্যেও মহাসচিব পদ নিয়ে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা আছে। ফলে দলের একটি অংশের বিরোধিতায় ফখরুলের মূল কাজ আটকাবে না।

উল্লেখ্য, মান্নান ভূঁইয়া মহাসচিব থাকাকালে দলের দফতর থেকে শুরু করে স্থায়ী কমিটি এমনকি যুগ্মমহাসচিবদের মধ্যে তার সমর্থকের সংখ্যা বেশি ছিলো। ওই সময় স্থায়ী কমিটির নেতা অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দাজা চৌধুরী, অলি আহমেদ, এম. সাইফুর রহমান, খোন্দকার দেলোয়ার, হোসেন; এমনকি তরিকুল ইসলাম পর্যন্ত তার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। এছাড়া দফতরের দায়িত্বে প্রথমদিকে নজরুল ইসলাম খান এবং পরে মফিকুল হাসান তৃপ্তিও তার সমর্থক বলে পরিচিত ছিলেন। যুগ্মমহাসচিবদের মধ্যে আশরাফ হোসেন ও আবদুল্লাহ আল নোমান এবং প্রায় প্রতিটি অঙ্গসংগঠনের নেতা ছিলেন মান্নান ভূঁইয়ার সমর্থক। ফলে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্বিঘ্নে মহাসচিব পদে বহাল ছিলেন তিনি।

এ সময়ের মধ্যে মূলত ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে মহাসচিব করার জন্য দলের তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মির্জা আব্বাস, প্রয়াত আনোয়ার জাহিদ ও ফেনীর মোশাররফ হোসেনসহ দলের বড় নেতারা বার বারই তৎপরতা চালিয়েছেন। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্বে হাওয়া ভবনের ক্ষমতার বলয়টিও সব সময় সমর্থন দিয়েছে মান্নান ভুঁইয়াকে। ফলে এক-এগারোর পর পরিবর্তিত পরিস্থিতির উদ্ভব না ঘটলে কখনওই মান্নান ভুঁইয়াকে সরানো যেতো না বলে এখনও মনে করা হয়।

পক্ষান্তরে মির্জা ফখরুলের বেলায় এসব অনুকূল পরিস্থিতির কোনওটিই নেই। তার সবচেয়ে বড় সমর্থক ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা গত দু’বছর ধরে বিদেশে। ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, শামসুজ্জামান দুদু ও মহিলা দলের নেত্রী শিরিন সুলতানাসহ কয়েকজন নেতা নীতিগতভাবে ফখরুলকে সমর্থন করলেও সারাদিন তারা এ নিয়ে সময় ব্যয় করতে রাজি নন। তাদের মতে, দিনরাত এ নিয়ে তৎপর থাকা সম্ভবও নয়।

এদিকে, গয়েশ্বরের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মওদুদ আহমদসহ সিনিয়র কয়েকজন সম্প্রতি মির্জা ফখরুলকে সমর্থন করছেন। কিন্তু এ নিয়ে দলের মধ্যে সারাক্ষণ লবিং-গ্রুপিং করা তাদের পক্ষেও সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ দলে সবচেয়ে সিনিয়র ওই নেতারা কেবল খালেদা জিয়া ডাকলে গুলশান কার্যালয়ে যান, না ডাকলে যান না।

ফলে নানা সমীকরণে সাড়ে তিন বছরের বেশি ফখরুল কাটিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত হিসেবে। দলের গুরুত্বপূর্ণ কোনও পদে তিনি নিজের সমর্থক নেতাদের পদায়ন করতে পারেননি। বরং দলে তৎপর এবং নিয়ন্ত্রণ লাভে মরিয়া অংশের মধ্যে গয়েশ্বর ও রিজভী আহমেদ ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, যুগ্মমহাসচিব বরকতউল্লাহ বুলু, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক আবুল খায়ের ভূঁইয়াসহ অনেকে সারাক্ষণই ফখরুলবিরোধী কাজে তৎপর। এ কারণে ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে তাদের সমর্থকরাই বক্তৃতার সুযোগ পেয়েছেন। যদিও কাউন্সিলের ব্যবস্থাপনার ত্রুটি খালেদার কাছে তারা আড়াল করতে পারেননি।

আর এখন ফখরুলবিরোধী কাজে তাদের সুবিধা হলো- গুলশান কার্যায়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তা চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসকে তারা হাতে পেয়েছেন। শিমুল সব সময়ই দলের ওই অংশকে খালেদার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দিচ্ছেন। এভাবেই বেশিরভাগ সময় তারা খালেদার ‘কান ভারী’ করতে পারছেন বলে অনেকের ধারণা। অনেকের মতে, নির্বাহী কমিটি গঠনেও শিমুলের প্রভাব থাকবে। কারণ খালেদা জিয়া কঠোর গোপনীয়তায় গত কয়েকদিন ধরে বাসায় বসে ওই কমিটি গঠনের কাজ করলেও সাহায্য নিতে হচ্ছে শিমুলের।

এদিকে, লন্ডনে বসবাসরত তারেক রহমানের সমর্থনও পুরোপুরি ফখরুলের পক্ষে নয়। কারণ সাংগঠনিক বিভিন্ন কাজ বা পদ পদবির ব্যাপারে তারেক সমর্থকদের তদবির মহাসচিব হিসেবে ফখরুল সব সময় রাখতে পারছেন না। বস্তুত তারেক সমর্থকরা নানাভাবে দলে নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা করলেও সব সময় এ হিসাবের সঙ্গে মিলছে না চেয়ারপারসন খালেদার হিসাব বা সিদ্ধান্ত। কিন্তু নতুন কমিটিতে প্রভাব বজায় রাখতে চাইছেন তারাও। সব মিলিয়ে লন্ডনের সঙ্গেও এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে ফখরুলের।

যদিও বৈশ্বিক রাজনৈতিক মেরুকরণের পাশাপাশি দলের ভাবমূর্তি ধরে রাখার প্রশ্নে মহাসচিব হিসেবে আপাতত ফখরুলই থাকছেন বলে সর্বস্তরে মনে করা হচ্ছে। এমনকি এ প্রশ্নে তারেকের আর দ্বিমত নেই। ফলে শিগগিরই তিনি পূর্ণ মহাসচিব হচ্ছেন। কিন্তু হলে কী? তিনি কি কাজ করতে পারবেন, নাকি আগের মতো চাপের মধ্যে থাকবেন? ঘুরে-ফিরে এ প্রশ্ন বিএনপির মধ্যেই উঠতে শুরু করেছে।

/এজে/

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune
টপ