সাইবার ক্রাইম আতঙ্কে ক্ষমতাসীনরা

Send
পাভেল হায়দার চৌধুরী
প্রকাশিত : ১০:৪৪, এপ্রিল ২১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:০০, এপ্রিল ২১, ২০১৬

সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে সরকারবিরোধী একটি মহল

ক্ষমতাসীনদের ভেতরে সাইবার ক্রাইম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর এ আতঙ্ক আরও বেড়েছে। তারা বলছেন, সরকারবিরোধী একটি বিশেষ মহল রাজপথে পেরে উঠতে না পেরে এখন সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে  সরকারও নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছে।

ক্ষমতাসীনদের মতে, যেকোনও দুর্ঘটনা ঘটার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে যেভাবে সরকারের বিরুদ্ধে নানা প্রচারণা চলে, তাকে সরকারবিরোধী শক্তির চক্রান্তের অংশ বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার মতে, প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়ে একটি বিশেষ মহল পরিকল্পিতভাবে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে মেতে ওঠে।

সূত্রের দাবি, সম্প্রতি বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন ভুয়া ছবি ও এডিটেড ছবি দিয়ে সরকারবিরোধী বিভিন্ন প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কাবা ঘরের ছবি পর্যন্ত বিকৃত করে সরকারবিরোধী প্রচারণায় লাগিয়েছিল একটি মহল। বিভিন্ন ব্লগেও সরকারবিরোধী প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো হচ্ছে।   

ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা মনে করেন, রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে ও আন্দোলন সংগ্রাম করে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ শক্তি ব্যর্থ হয়েছে। কিছুতেই তারা ঘায়েল করতে পারেনি সরকার ও আওয়ামী লীগকে। এখন তারা প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার কৌশল নিচ্ছে। এ জন্য একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে। ক্ষমতাসীন দলের নীতি-নির্ধারণী সূত্রগুলো জানায়, সরকার চক্রটিকে নির্মূল করতে তৎপর রয়েছে। 

আরও পড়তে পারেন:   সন্দেহভাজনদের বিষয়ে সিআইডিকে তথ্য দিয়েছেন তনুর বাবা

নীতি-নির্ধারণী সূত্রগুলো জানায়, কোনও একটি ঘটনা ঘটলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তোলপাড় সৃষ্টি করতে একটি মহল বেশ কিছুদিন যাবত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ছোটখাটো কিছু ঘটলেই ফেসবুক ব্যবহার করে একটি বিশেষ মহল ফায়দা হাঁসিল করতে চায়। ‘যা-তা’ লিখে একে-অন্যকে শেয়ার করে সরকারের বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়ে ওঠে। সম্প্রতি কুমিল্লায় তনু হত্যা ও  বাঁশখালীর ঘটনা থেকে দেখা গেছে, ফেসবুক ব্যবহার করে একটি মহল অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে যাচ্ছে।  

ফেসবুকে প্রচার-অপপ্রচারকে ছাড়িয়ে সরকারকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে  দেশের আর্থিক সিস্টেমে সাইবার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করাকে কেন্দ্র করেও। এর সঙ্গে দেশি-বিদেশি চক্রও জড়িত। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বেশ চাপে পড়েছে সরকার। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ২০ জন বিদেশিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগেও একটি ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতিতে একজন জার্মানকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সোমবার জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ডলার চুরির ঘটনায় জড়িত ২০ জন বিদেশি নাগরিককে শনাক্ত করা হয়েছে। ওই ২০ জন শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন্স, চীন ও জাপানের নাগরিক বলে সিআইডি সংবাদ সম্মেলনে জানায়। তবে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকরাও জড়িত বলে সিআইডি সন্দেহ করছে। তাদের সম্পৃক্ততা স্পষ্ট করার জন্য এখন কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শাহ আলম।

আরও পড়তে পারেন:   দেশীয় ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের বিক্রি বেড়েছেদেশীয় ব্যান্ডউইথের বিক্রি বাড়ায় সাফল্য উদযাপন করল বিএসসিসিএল!

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা হাতিয়ে নিতে হ্যাকাররা ব্যাংকের অনলাইন সিস্টেমে ঢুকে ‘সুইফট কোড’ হাতিয়ে পেমেন্ট অর্ডার পাঠান। তারপর টাকা গ্রহণ তোলেন ফিলিপাইন্সের একটি ব্যাংক থেকে। এ নিয়ে ফিলিপাইন্স ও শ্রীলঙ্কায়ও তদন্ত হচ্ছে। অন্যদিকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় জার্মান নাগরিক টমাস পিটারসহ চারজনকে আটক করা হয়। তারা এটিএম কার্ড ক্লোন করে ঢাকার বেসরকারি ইস্টার্ন, সিটি, ইউসিবিএল ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের আটটি এটিএম বুথ থেকে ৩৬ জন গ্রাহকের ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকা তুলে নেন। কার্ড ক্লোন করতে তারা ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসিয়ে গ্রাহকদের গোপন তথ্য চুরি করেছেন বলেও পুলিশ জানায়।

সূত্র জানায়, তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের কারণে আজকাল অনলাইনে কেনাকাটা করছেন অনেকে। এজন্য নাম, ঠিকানা, ই-মেইল, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য ইত্যাদি দিতে হয়। সমস্যাটা সেখানেই। যেসব ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো নয়, সেখানে এই তথ্যগুলো দিলে তা অপরাধীর কাছে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেক্ষেত্রে অপরাধী এসব তথ্য ব্যবহার করে ক্রেডিট কার্ড শূন্য করে দিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ। জনসেবা নিশ্চিত করতে সব ক্ষেত্রে সরকার প্রযুক্তি নির্ভর হয়েছে। প্রযুক্তির নতুন-নতুন দিক প্রতিনিয়ত উন্মোচিত হচ্ছে। কিন্তু একটি বিশেষ চক্র প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে। তিনি বলেন, বিষয়টি আমাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। প্রযুক্তির অপব্যবহারকারীদের ব্যাপারে আমরা সতর্ক।

আরও পড়তে পারেন:  ৩০ হাজার ডলারে এফবিআই-এর তথ্য কিনেছিলেন এক বাংলাদেশি সাংবাদিক

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সব কিছুর ভালোমন্দ দুটি দিক রয়েছে। ভালো মানুষের হাতে বন্দুক থাকলে ভালো কাজে ব্যবহৃত হবে, ডাকাতের হাতে বন্দুক থাকলে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত হবে। প্রতিটি বিষয়ের দুটি দিক রয়েছে। একটি ইতিবাচক, অন্যটি নেতিবাচক। তাই বলে প্রযুক্তিনির্ভর হওয়া ঠিক হবে না, তেমনটি নিশ্চয়ই নয়। এজন্য প্রযুক্তি ব্যবহারে মানুষকে আরও সচেতন করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য কাজি জাফরউল্যাহ বলেন, আমাদের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে, সরকারবিরোধী একটি মহল রাজনীতিতে ও রাজপথে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ হয়েছে। তারা এখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকারকে কিভাবে অস্থিতিশীল করে তোলা যায়, সেই পথে হাঁটছেন। তিনি বলেন, দেশে কোনও একটি ঘটনা ঘটলেই দেখা যায়, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে একটি মহল সরকারের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। একটি সেন্টিমেন্ট তৈরি করতে সরব হয়ে ওঠেন তারা। তিনি বলেন, সবকিছুরই দুটো দিক আছে। ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক। তাই প্রযুক্তির যেমন উন্নতি সাধন করতে সরকার বদ্ধ পরিকর, তেমনি প্রযুক্তির অপব্যবহারকারীদের দমন করতেও কঠোর।

/এমএনএইচ/আপ- এপিএইচ/

লাইভ

টপ