ওয়ানডেতেও লড়াইয়ের প্রত্যাশা পূরণ হলো না

Send
গাজী আশরাফ হোসেন লিপু
প্রকাশিত : ১১:৫৭, অক্টোবর ২৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৮, অক্টোবর ২৩, ২০১৭

দক্ষিণ আফ্রিকাতে আমাদের টেস্ট সিরিজটা যে এক পেশে হবে, সে ব্যাপারে অধিকাংশ ক্রিকেট অনুরাগীদের একটা স্পষ্ট ধারণা ছিল। তবে সিরিজ শুরুতে তাদের আহত বোলারদের তালিকার দিকে তাকিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ার ছোট্ট একটা আশার প্রদীপ মনের এক কোনায় স্থান পেয়েছিল ঠিকই। অন্যান্য দেশের ক্রিকেটারদের মতো আমাদের ক্রিকেটারও জানতো কঠিনতম বিষয়বস্তুর ওপর ক্রিকেটীয় বিদ্যাপাঠে এক মাসের অধিকাংশ সময় পার করতে হবে।

সাকিব ছাড়া ওয়ানডে দলের উপরের দিকের ব্যাটসম্যানই ছিল টেস্ট দলে। তাই ওয়ানডে সিরিজে এর আগে দুটি টেস্ট খেলে সবারই কন্ডিশন ও পিচের আচরণের সঙ্গে ধাতস্থ হওয়ার একটা বড় সুযোগ ছিল। যাতে করে সেই ফায়দা আমাদের ওয়ানডে সিরিজে কাজে লাগানো যায়। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে টেস্ট সিরিজে ব্যাটসম্যানদের হারানো ফর্ম ওয়ানডে সিরিজে তাদের যথাযথভাবে আর আস্থায় ফিরিয়ে আনেনি।

তাই প্রতিটি ওয়ানডে ম্যাচে এত বড় ব্যবধানে হার ছিল বিব্রতকর। ঘরের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর আনন্দটা রেকর্ডের খাতায় আবদ্ধ রয়ে গেল। পিচের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই তিনটি ম্যাচেই ৩৫০ রানের উপভোগ্য ম্যাচ হতে পারতো যদি বিশ্ব ক্রিকেটের প্রথম সারির ৪টি দল একে অন্যের বিরুদ্ধে খেলতো। তবে ২৯০ থেকে ৩০০ রান করার সামর্থ্য আমাদের দলের ব্যাটসম্যানদেরও ছিল। যদি তারা প্রথম ১০-১২টি ওভার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামাল দিতো তাহলে। আর এই না পারার অন্যতম কারণ হিসেবে ছিল-দক্ষিণ আফ্রিকার পরিকল্পনার কাছে আমাদের প্রস্তুতির কৌশল চরমভাবে মার খেয়েছে।

গতকাল তৃতীয় ওয়ানডের সম্ভবত প্রথম ১০ ওভার পর বিশ্লেষণ দেখাচ্ছিল-রাবাদা ও প্যাটারসন দুই প্রান্ত থেকে যথাক্রমে ৬৭ শতাংশ ও ৭৪ শতাংশ শর্টপিচ বল করেছেন। যার ফলে যা ঘটলো সেটা হলো ১. শর্টপিচ বল থেকে বড় শটস উল্লেখযোগ্যভাবে খেলতে না পারায় রানের চাকায় গতি পেল না। বোলার উপুর্যপুরী শর্ট বল করেই গেল। ডট বলের সংখ্যা বাড়লো। ২. নতুন শক্ত বলের বাড়তি বাউন্স থেকে উপরে বল করেই কিন্তু আউট করলো ইমরুল ও সৌম্যকে। গতানুগতিকভাবে একই স্টাইলে লিটন দাস এলবিডাব্লিউ হলেন। রিয়াদ, সাব্বির, মাশরাফি সবাই ওভার পিচড বলেই প্যাভিলিয়নের পথ ধরেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের এই ১৪০/১৪৫ কি.মি. গতিময় বোলার উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানদের ওপর পিচে প্রভাব ফেলেছে। যার ছোয়া কিছুটা হলেও প্যাভিলিয়নে বাকিদের চিন্তিত করেছে। বাংলাদেশে প্রায় ৭০ শতাংশ ওভারপিচ বল খেলে অভ্যস্ত ব্যাটসম্যানদের তাই এই সংকটে পড়তে হয়েছে। আবার যখন যারা ওভার পিচ বল পেয়েছেন তখন যেমন সৌম্য কাল দর্শনীয় অন ড্রাইভে চার পেয়েছেন, যেমনটি সাকিব মেরেছেন স্ট্রেইট ড্রাইভ ও দর্শনীয় এক্সট্রা কাভার ড্রাইভ। মূলত আমাদের ব্যাটসম্যানদের শক্তিতে তারা বল করেনি এবং আমাদের প্রস্তুতির অংশটুকুতে টিম ম্যানেজমেন্ট সন্তুষ্ট হলেও কার্যত তাদের নিরীক্ষণ যে ভুল ছিল তা মাঠেই প্রমাণিত হলো। দেশে সার্বিকভাবে পিচের উন্নয়নের জন্য একজন উঁচু মানের বিশেষজ্ঞ কারিগর নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে অন্তত দুই বছরের জন্যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া উচিত। শুধু টিম ম্যানেজমেন্টের পেছনে বছরে ৮ কোটি টাকা বেতন প্রদান পূর্ণাঙ্গ ফলাফল বয়ে আনবে না।

প্রতিটি ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকানদের দারুণ ব্যাটিং সূচনা আমাদের নতুন বলের দুর্বল ব্যবহারের দিকটি স্পষ্ট করে দিয়েছে। এর অবস্থায় ছেলেরা কোচদের কাছ থেকে অনুশীলনে তামিল নিয়ে ঘরোয়া ম্যাচে যেন বল করতে পারে, তেমন প্রাণবন্ত পিচ যেন তারা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পায়, এমনকি আন্তর্জাতিক ব্যস্ততার মাঝেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার সুযোগ যেন তারা পায় সেই ব্যবস্থা বোর্ডকে করে দিতে হবে।

ভালো ডেলিভারি অধিকাংশ সময় বোলারকে পুরস্কৃত করে। কাল তাসকিন ও রুবেলের নেওয়া তিনটি উইকেটের দৃশ্যটির রিপ্লে করলে দেখতে পাবেন তেমন ডেলিভারির সংখ্যা ছিল আনুপাতিকহারে অনেক কম এবং ক্রিজে সেট ব্যাটসম্যান থেকে গেলে ভালো ডেলিভারি সম্মানটুকু পায় কিন্তু উইকেট সচরাচর মেলে না।

তিনটা ওয়ানডের একটাও দিবা-রাত্রির হলো না দেখে বেশ অবাক হয়েছি। দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ড যখন সূচি পাঠিয়েছে, তাকি বোর্ডের তরফ থেকে কেউ লক্ষ্য করেনি? প্রথম টি-টোয়েন্টি সম্ভবত রাতে খেলবে বাংলাদেশ।

এসবের মাঝেই মাশরাফির ৫০তম অধিনায়কত্বের ম্যাচটি বড়-বাজেভাবে হেরে গেলাম। সম্ভবত দক্ষিণ আফ্রিকাতে তার আর ক্রিকেট খেলা হবে না দেশের জন্য। এতগুলি ব্যাটসম্যানদের মাঝে সাকিবের ব্যাটটা একটা টিউব লাউটের মতো ছোট পরিসরে আলো ছড়ালো- সেই কষ্ট ধারণ করেই দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ছেন মাশরাফি। যেখানে দলের কাছ থেকে তার প্রত্যাশা এই ধরণীতে নেমে আসলো না যথাসময়ে। তা রয়ে গেল তার ভাবনার রাজ্যেই! বহুল আলোচিত এই সিরিজকে ঘিরে তাই মাশরাফির পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শের একটি রিপোর্ট বোর্ডের কাছে তার জমা দেওয়া উচিত।       

/এফআইআর/

লাইভ

টপ