প্রাণবন্ত টেস্ট পিচে ব্যাটিং-বোলিংয়ে আমরা এখনও পিছিয়ে

Send
গাজী আশরাফ হোসেন লিপু
প্রকাশিত : ১২:৫৭, জুলাই ০৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩১, জুলাই ০৭, ২০১৮

গাজী আশরাফ হোসেন লিপুআমার মনে হয় যে দেশের বাইরে সিরিজ সব সময় চ্যালেঞ্জিং। এই ধরনের টেস্ট ম্যাচে ৮০-৯০ দশকে যে ঝাঁজটা ছিল সেটা প্রায় হারিয়ে গেছে। আমার মনে হয় সীমিত ওভারের উইকেট দেখতে দেখতে টেস্ট ম্যাচের আনন্দ লুফে নিতে আমরা ভুলে গেছি। তো এমন উইকেটে ঘাস যখন থাকে, আর্দ্রতা যখন থাকে, টসের সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ে। তখন যে কোনও দলের বোলাররা শকুনের চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকবেন অধিনায়কের দিকে। কারণ টস জিতে বোলিং নেওয়াটাই তখন তাদের আকাঙ্ক্ষায় থাকে। কালকে হোল্ডার সেটাই করতে পেরেছিলেন।

তাতে একটা বড় চ্যালেঞ্জর মুখোমুখি হতে হয়েছে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। যেটা তাদের হরহামেশা মোকাবেলা করতে হয় না। আর টেস্ট ক্রিকেটের এটাই মহিমা যে অনেক প্রতিকূলতার মাঝেই আপনাকে সংগ্রাম করতে হবে।

একই সময় বোলারদের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অনুকূল পরিবেশের সবটুকুই তাকে সদ্ব্যবহার করতে হবে।

আমাদের ব্যাটসম্যানরা খুবই আশাহত করেছে। উইকেট পড়ে যাওয়ার পর বড় জুটি গড়া, শট সিলেকশন থেকে সব কিছুতে তারা দারুণভাবে হতাশ করেছে সবাইকে। কারণ এমন উইকেটে লড়াই করাটা গুরুত্বপূর্ণ, বল ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই উইকেট অনেক প্রাণবন্ত উইকেট; যেখানে বল ঘুরছে, বলের মুভমেন্ট আছে। অত্যন্ত উঁচু মানের না হলেও আমি বলবো সমীহ আদায় করে নেওয়ার মতো বোলাররা এখানে বল করছে।

ভয়ানক যে বিষয়টা ছিল তারা তাদের বলের লাইনটা ধরে রেখেছিল। অফ স্টাম্পের বাইরে বল করে নতুন বলের অপচয় করেনি। তারা প্রতিটা বল ব্যাটসম্যানকে খেলতে বাধ্য করেছে, সুযোগ নিতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত টেস্ট খেলতে গেলে যে আলাদা দক্ষতার প্রয়োজন হয়, আলাদা অনুশীলন করতে হয় এবং সেই অনুশীলনের প্রয়োগটা সেরকম উইকেটে ম্যাচ খেলে রপ্ত করতে হয়। এই বিষয়টা আজকালকার টেস্ট ম্যাচ থেকে বিলুপ্ত হতে চলেছে। ক্রিকেটে এই কথা সব সময় বলা হয় প্রথম দুই ঘণ্টা সব সময়ই বোলারদের। সে কারণেই একটা সময় ছিল টস জিতলে অধিনায়করা বোলিং নিতো। কারণ সে ধরনের উইকেটে সচরাচর চতুর্থ ইনিংস অতটা হুমকিস্বরূপ হয় না। শুষ্ক উইকেটে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করাটা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু এমন আর্দ্র উইকেটে প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ে ফায়দা নিতে পারলে চতুর্থ ইনিংসে ঝুঁকি অনেক কমে আসে। সেই রকম পরিস্থিতি দেখতে পেরে আমার খুব ভালো লেগেছে। আমার মনে হয় যারা বাংলাদেশের খেলা দেখলেন, বাংলাদেশের খেলোয়াড়রাও বুঝলেন টেস্ট ম্যাচের প্রথম দুই ঘণ্টায় নতুন বলে খেলা অতটা সহজ নয়।

বল স্টাম্পের গন্ধ শুঁকে চলে যায়-এমন বল ছাড়ার দক্ষতাও প্রয়োজন হয়। তাই এটা একটা শিক্ষনীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। একই সঙ্গে তার জন্য চরম মূল্যও দিতে হলো। এক কথায় বেশ লজ্জাও পেতে হলো। টি-টোয়েন্টির চেয়েও কম ১৯তম ওভারে আমরা অলআউট হয়ে গেছি। অথচ এত বাজে দল আমরা নই।

আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে উইন্ডিজ যখন ব্যাট করতে নামলো তখন উইকেটে বোলারদের জন্যে যথেষ্ট প্রাণ ছিল। আমাদের বোলাররা কিন্তু নতুন বলের সদ্ব্যবহার ভালো করতে পারেনি। তারা বলের লাইন ঠিকমতো ধরে রাখতে পারেনি। ব্যাটসম্যানরা তাদের ইচ্ছেমতো খেলতে পেরেছিল, যেটা তারা চাচ্ছিল। তাদের স্ট্রাইক রেট দেখলেই সেটা বোঝা যায়। তারা উইকেটে পড়ে থাকতে চেয়েছিল। সেই ব্যাপারে তারা সমর্থ হয়েছে তবে আমাদের ব্যাটসম্যানদের সেই চেষ্টা করতে দেখিনি।

আমাদের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে লিটন ভালো করলেও আশা ছিল তিনি আরেকটু লড়াকু মনোভাব দেখাবে। মেহেদী মিরাজ, সোহান ওরা যেভাবে খেললো তাতে এমন বোলারদের বিপক্ষে এভাবে খেলা সহজ নয়। তাতে আমাদের শেখার জায়গাটার ঘাটতি চোখে পড়ছে। এসব জায়গায় আমাদের দ্রুত উন্নতি প্রয়োজন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্ষেত্রে আমি বলবো ওরা টেস্টের ক্ষেত্রে দলটাকে আলাদাভাবেই এগিয়ে নিযে যাচ্ছে। এই টেস্ট দলের দুই-একজনকে হয়তো অন্য ফরম্যাটে দেখা যেতে পারে। তবে এখনকার ক্রিকেটে ফরম্যাট অনুযায়ী খুব দ্রুত সক্ষমতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া মুশকিল।  আমাদের তুলনায় ওদের বেশ কয়েক জনকে যদি দেখি, ওরা খুব বেশি টেস্ট খেলেনি। সেই তুলনায় তারা অনভিজ্ঞ। সেই লক্ষ্যে তারা টেস্ট মেজাজ অনুযায়ী তাদের তৈরি করছে। তারা যেভাবে ব্যাট করলো বিশেষ করে তৃতীয় সেশনটা অনেক সহজ হয়ে গেছে ওদের জন্য। পাওয়েল যেভাবে ব্যাটিং করেছে তাতে বোঝা গেছে অন্য দুজনকে যেভাবে সংগ্রাম করতে হয়েছে পাওয়েলকে কিন্তু রান তুলতে সেভাবে সংগ্রাম করতে হয়নি।

আমরা জানি উইকেটের চরিত্র বদলায়। দ্বিতীয় দিনে হয়তো সেটা আরও ব্যাটিং বান্ধব হবে। তারা এর পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছে। তবে ওরা যেই সুযোগ দিয়েছে তাতে আমাদের বোলিং যদি আরও প্রাণবন্ত হতো তাহলে আরও বেশ কিছু উইকেট হয়তো আমরা তুলে নিতে পারতাম।

সেই সুযোগটা আমরা তৈরি করতে না পারার কারণ হিসেবে কিছুটা অনভিজ্ঞ বোলিং লাইন আপকে দায়ী করতে হবে। তুলনামূলক নতুন আসা আবু জায়েদ রাহী আমাকে খুব মুগ্ধ করেছে। রাব্বী কিছু সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে পর পর যেই বলে সে লেগ বিফোরের আবেদন করেছে, আমার মনে হয়েছে তাদের এই লাইনেই বল করা উচিত ছিল। কিন্তু আমরা দুটো বল ভালো করে ওদের চাপে ফেলে দিলেও তিনটা বল খারাপ করে সেই চাপ মুক্তির সুযোগ করে দিয়েছি।

আরেকটা দুর্ভাগ্য হলো এমন অবস্থায় ফিল্ডারদের কাছ থেকে সহযোগিতা চায় বোলাররা। কিন্তু মুশফিকের কাছ থেকে কিপিং গ্লাভস নিয়ে নুরুল হাসানকে দেওয়ার পর সেও কিছু ক্যাচ ফেলেছে। একই সঙ্গে মুশফিকও কঠিন ক্যাচ ফেলেছে। তারা সেভাবে এগিয়ে আসতে পারেননি। এক্ষেত্রে আমার মনে হয় টিম ম্যানেজমেন্ট কিছুটা ব্যর্থ হয়েছে। মুশফিক অথবা লিটনের কাছেই কিপিংটা থাকতে পারতো। আরেকটা বিষয় হলো এই উইকেটে আমরা আরেকটা সিমার সংযোজন করতে পারতাম। যদি টস জিততাম তাহলে সেটা আরও ভাইটাল হতে পারতো। এই তৃতীয় কিপার সংযুক্ত করার তেমন যৌক্তিকতা খুঁজে পাইনি। কারণ আমার মনে হয় পজিটিভ আঙ্গিকে খেলা উচিত।

টেস্ট ম্যাচ জিততে হলে, উইকেটের কথা চিন্তা করে পেসার সংযোজন করতে পারতাম। আমাদের তো আর হোল্ডারের মতো অলরাউন্ডার নাই। তাহলে একটা ব্যাটসম্যান কম হলে সবাই বুঝতে পারতো প্রত্যেককে তাদের দায়িত্বটা সুচারূ ভাবে পালন করতে হবে।

অধিনায়ককে অনুশীলনের ব্যাপারে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। বিশেষ করে ঢাকার উইকেটে অনুশীলন করা আর এমন ঘাসের উইকেটে অনুশীলন করার মাঝে অনেক পার্থক্য আছে। এমন উইকেটে দলের অনুশীলনের বিষয়টা বোঝার ব্যাপারটা হয়তো তার জানার বা বোঝারও সুযোগ হয়নি। কারণ তিনি দলের সঙ্গে ছিলেন না।

আমার বিশ্বাস আগামী দিন এই উইকেট অনেক প্রাণবন্ত হবে ব্যাটসম্যানদের জন্যে। এখন যত দ্রুত ভালো বল করে ওদের আউট করা যায়। আমি অবশ্যই আশা রাখি বাংলাদেশ হয়তো দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো ব্যাট করবে। কিন্তু ওদের দ্রুত আউট করা না গেলে সেটা হয়তো যথেষ্ট হবে না।

/এফআইআর/

লাইভ

টপ