হ্যাটট্রিক কন্যার গল্প

Send
মাজহারুল হক লিপু, মাগুরা
প্রকাশিত : ১৪:২১, জুলাই ২২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৫, জুলাই ২২, ২০১৮

ফাহিমা খাতুন।মেয়েদের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দেশের হয়ে প্রথম হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন মাগুরার মেয়ে ফাহিমা খাতুন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে হ্যাটট্রিক করে তিনি এখন ইতিহাসের পাতায়। সাকিব আল হাসানের মতো একই জেলার কৃতি সন্তান। এমন সাফল্যে এখন খুশির বন্যা ফাহিমার পরিবারে। ক্রিকেট তাদের মেয়েকে দেশ-বিদেশে এমন পরিচিতি এনে দেবে- এমনটি ভাবেনি ফাহিমার পরিবার।

মাগুরা শহরের স্টেডিয়াম পাড়ায় ফাহিমাদের বাড়িতে বসে একান্ত আলাপচারিতায় নিজের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার একেকটি অধ্যায় তুলে ধরেন ফাহিমা। সঙ্গে ছিলেন তার বাবা-মা।

সেই কথোপকথনেই জানা গেলো, ছেলেবেলা থেকে খেলাধুলার প্রতি দারুণ আগ্রহ ছিল বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের এই তারকার। এমন খেলার নেশা তার লেখাপড়ায় বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি। বর্তমানে সে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে স্নাতক শেষবর্ষের পরীক্ষার্থী।

ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে ফাহিমা জানালেন তখন থেকেই তার খেলার সঙ্গী ছিল ব্যাট আর বল। বাকি মেয়েরা যেখানে পুতুল নিয়ে বায়না ধরতো সেখানে ব্যতিক্রমী ছিলেন ফাহিমা, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার খেলার সামগ্রী ছিল ব্যাট-বল। অন্য মেয়েরা যেমন পুতুলের বায়না ধরতো আমি তা না করে ব্যাট-বল চাইতাম। বাবা পুলিশের চাকরি করতেন তাই ব্যস্ততার কারণে আমার প্রতি সেভাবে খেয়াল তার ছিল না।’

ক্রিকেটার ফাহিমা এক সময় ব্যাডমিন্টনও ভালো খেলতেন। এরপর থেকে ধীরে ধীরে তার ক্রিকেটার হয়ে ওঠা। যদিও তাকে উৎসাহ দিতে নির্ভরতার হাত বাড়িয়ে দেয়নি কেউ, ‘স্কুল জীবনে আমি ব্যাডমিন্টনে ভালো করতে থাকলাম। তাতে বাড়ির সবাই খুশিই হতো। এরপর যখন পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা শুরু করলাম তখন বাড়ি থেকে খুব উৎসাহ দেয়নি। বরং আমার বড় ভাই এতে বাধা দিত। বাড়ির পাশেই স্টেডিয়াম ছিল। জানতে পারলাম ওখানে মেয়েদের জন্য ক্রিকেট কোচিং হবে। যোগ দিলাম সেই ক্যাম্পে। প্রথম পর্যায়ে পঞ্চাশটা মেয়ে যোগ দিলেও শেষ পর্যন্ত টিকে ছিলাম আমি একা।’ সেই থেকে মাগুরা স্টেডিয়ামে অনুশীলন করা শুরু ফাহিমার। ছেলেদের সঙ্গে একই মাঠে অনুশীলন করেন এখন, ‘আমি এখনো মাগুরা স্টেডিয়ামে ছেলেদের সঙ্গে অনুশীলন করি। আমার কোচ সাদ্দাম হোসেনসহ ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা খুব ভালো। তাদের জন্যই এখনো ধৈর্য্য নিয়ে খেলে যাচ্ছি।’

নেদারল্যান্ডসে বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে আরব আমিরাতের সঙ্গে হ্যাটট্রিক প্রসঙ্গে ফাহিমা জানান, ‘বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করলো আর আমি সে দলের একজন সদস্য। এটা অবশ্যই গর্ব করার বিষয়। সবচেয়ে ভালো লাগে ভাবতে যে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় আমি শ্রেষ্ঠ খেলাটা খেলতে পেরেছি।’

মা ও বাবার সঙ্গে ফাহিমা খাতুন।ফাহিমার বাবা আলতাফ হোসেন সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি জানালেন, ফাহিমাকে নিয়ে তার আলাদা স্বপ্নের কথা। চেয়েছিলেন মেয়েটা সীমাবদ্ধ থাকবে সংসার আর চাকরিতে, ‘সত্যি কথা বলতে কি আর দশজন পিতার মতো আমারও চাওয়া ছিল মেয়ে ভালো পড়া লেখা শেষ করে ভালো চাকরি করবে। সংসার করবে। ক্রিকেটার হবে এমনটা ভাবিনি। তবে এখন ভালোই লাগে এই ভেবে যে ও দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছে। আর পড়াশুনাটাও চালিয়ে যাচ্ছে।’

ফাহিমার মা ফরিদা বেগম অবশ্য মেয়ের কৃতিত্বে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তবে তার সঙ্গে অতৃপ্তিও জুটে ছিল সমাজের সংকীর্ণতায়, ‘আমার মেয়ে ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছে এটা নিয়ে বাইরে বা ভিতরে অনেকে অনেক কিছু বলেছে। তবে আমার আত্মাবশ্বাস ছিল ও এমন কিছু করবে যা সবার জন্য সম্মান বয়ে আনবে।’

/এফআইআর/

লাইভ

টপ