এশিয়া কাপে বাংলাদেশের অন্যতম অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মাশরাফি মুর্তজা। ২০০১ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হওয়ার পর কেবল ২০০৪ সালের টুর্নামেন্ট খেলা হয়নি তার। ২০১২ সালে মুশফিকুর রহিমের নেতৃত্বে প্রথমবার ফাইনাল খেলেন তিনি, কিন্তু সেটা শেষ হয় পাকিস্তানের কাছে ২ রানে হারের বিস্বাদে। গতবার টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের এশীয় যুদ্ধে অধিনায়ক হিসেবে খেললেন ফাইনাল, যেখানে ভারতের কাছে হারে আবারও ব্যর্থতার গ্লানি। দুই বছর বাদে টানা দ্বিতীয় এশিয়া কাপ ফাইনাল, প্রতিপক্ষ আবারও ভারত। এবার সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠবে বাংলাদেশ- বিশ্বাসটা দৃঢ় হচ্ছে মাশরাফি আছেন বলে।
বিশ্বাস দৃঢ় হওয়ার কারণ আছে, মাশরাফির অসাধারণ নেতৃত্বে গত চার বছরে বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটে বিশাল রূপান্তর ঘটেছে। যদিও এশিয়া কাপ ফাইনালের ক্ষত সারিয়ে তোলার কঠিন চ্যালেঞ্জ তার সামনে। অবশ্য ২০১৪ সাল থেকেই নানা প্রতিকূলতায় নানা চ্যালেঞ্জ জয় করে আসার অভিজ্ঞতা হয়েছে মাশরাফির।
২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজেই মাশরাফি নতুন স্বপ্নযাত্রার শুরু। তারপর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে নতুন বাংলাদেশের আর্বিভাব হয়। এরপর নিয়মিতভাবেই মাশরাফির নেতৃত্বে জয়রথ ছুটেছে টাইগারদের।
মাশরাফি আছেন বলেই এশিয়া কাপে শিরোপ খরা কাটানোর স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। ভারতীয় এক সাংবাদিক ম্যাচের আগে টিম হোটেলের লবিতে বসে মাশরাফিকে নিয়ে আলাপ করছিলেন। কান পেতে বাংলাদেশ অধিনায়ককে নিয়ে প্রশংসাই শোনা গেল, ‘যে দলে মাশরাফির মতো অধিনায়ক থাকে, সেই দলের বিপক্ষে জেতা কঠিন হবে। মাশরাফি বীরের মতো খেলে। শেষ বল পর্যন্ত পুরো দলকে উজ্জীবিত করে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারতকে আগামীকাল (শুক্রবার) বেশ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই পড়তে হবে।’
মাশরাফি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে বলা চলে। একের পর এক প্রতিকূল সেই পরিস্থিতি পেরিয়ে বাংলাদেশ ফাইনালে উঠেছে। উদ্বোধনী ম্যাচে মুশফিক-মিঠুনের ব্যাটিং দৃঢ়তার পর মাশরাফির বোলিং ও তুখোড় অধিনায়কত্বে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সহজ জয় আসে। ওই ম্যাচে তামিমকে হারানোর পর টানা দুই ম্যাচ খেলার চিন্তায় মুশফিক-মোস্তাফিজকে বিশ্রাম দিয়ে আফগানদের বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। সুপার ফোরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তাদের। তবে মাশরাফি যে এসব কঠিন পরিস্থিতিতেও দলকে উজ্জীবিত রাখার মন্ত্র জানেন। তাতেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা জয় পায় লাল-সবুজ জার্সীধারীরা এবং সবাইকে অবাক করে উঠেছে ফাইনালে।
শুধু দলের খেলোয়াড়দের নয়, নিজেকেও বারবার সাহস জুগিয়ে মাঠে দৃঢ়তার সঙ্গে পারফরম্যান্স করে যাচ্ছেন দুই পায়ে অস্ত্রোপচারের ঝক্কিতে বারবার হোঁচট খাওয়া মাশরাফি। এই বিস্ময় ছুঁয়ে গেছে তার অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক ডেভিড ইয়াংকেও। তাই তো ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মাশরাফি খেলছে এটা ভাবাই এক বিস্ময়। তার ক্রিকেটের প্রতি প্রেম, দেশের প্রতি ভালোবাসাটাই তাকে খেলার সাহস যোগাচ্ছে।’
অবাক করা ব্যাপার, ইনজুরি নিয়েই ফাইনালে নামছেন মাশরাফি। ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুল ফুলে গেছে। তারপরও মাঠে নামবেন তিনি, কারণ দলে যে তাকে বড্ড প্রয়োজন। চাইলেই বিশ্রামে যেতে পারতেন, কিন্তু লড়াই করার মানসিকতা তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে। তাইতো সাকিবকে ছাড়াই পাকিস্তানের বিপক্ষে নেমে সবাইকে বলে দিলেন, ‘যুদ্ধে নামলে হারানোর কিছু নেই। হয় মারবে, নয়তো মরবে।’ এমন কথা শুনলে তো উজ্জীবিত না হয়ে পারা যায় না। বল করুক বা না করুক, মাশরাফি মাঠে থাকলেই দল দারুণ আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।
এমন লড়াকু মানসিকতা নিয়ে যিনি দিনের পর দিন বাংলাদেশকে সাফল্য এনে দিচ্ছেন, তার হাতে তো একটা ট্রফি থাকা চাই। এবারই হয়তো মাশরাফির জন্য সেই শেষ সুযোগ। দর্শক-সমর্থকরাও অধীর অপেক্ষায় আছেন তার হাতে ট্রফি দেখার। কিন্তু মাশরাফি কেবল নিজের জন্য নয়, দেশের জন্য চান এটা, ‘একটা ট্রফি দিয়ে আমি নিজেকে বিচার করি না। একটা ট্রফির জন্য খেলিনি ক্রিকেট, বাংলাদেশের জন্য একটা ট্রফি দরকার। আমার বিশ্বাস হয়তো কোনও একদিন ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ পারবে। ব্যক্তি মাশরাফিকে ট্রফি দিয়ে বিচার করবেন কিনা সেটা আপনাদের ব্যাপার। কিন্তু আমি নিজেকে এত সস্তা ভাবি না।’
আজ মাশরাফির জাদু দেখার অপেক্ষায় বাংলাদেশের সমর্থকরা। পুরো টুর্নামেন্টে দলকে অনুপ্রাণিত রাখা মাশরাফি ফাইনালেও হয়তো এমন কিছু করবেন, যাতে নতুন ইতিহাসই গড়বে বাংলাদেশ।








