ভুলের মাশুলে ইতিহাস গড়া হলো না বাংলাদেশের

Send
রবিউল ইসলাম, নটিংহ্যাম থেকে
প্রকাশিত : ০১:০১, জুন ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৭, জুন ২১, ২০১৯

দারুণ জুটি উপহার দেন ‍মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ।

ট্রেন্টব্রিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জিততে হলে ইতিহাস গড়তে হতো বাংলোদেশকে। কিন্তু ইতিহাস গড়া হয়নি। আক্ষেপ বাড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ৪৮ রানে ম্যাচ হেরেছে বাংলাদেশ। কঠিন এই ম্যাচে হারলেও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে নিজেদের সর্বোচ্চ সংগ্রহ দাঁড় করাতে পেরেছে মাশরাফিরা। ট্রেন্টব্রিজে বাংলাদেশি হাজার দশেক সমর্থক হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়লেও তাদের চোখে মুখে তৃপ্তিও ছিল!

ম্যাচটি যে বাংলাদেশ দুই ইনিংসের শুরুতেই হেরে গেছে, তা নিয়েও ছিল আলোচনা। ভুলের মাশুলটা যে দিতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত তার প্রমাণ এই হার। তামিম-সৌম্যর বাজে শুরুর পর, ওয়ার্নারের ১০ রানের ক্যাচ মিসকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে সবচেয়ে বেশি!

শেষ ৩০ বলে ৮২ রান প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের। কঠিন এই লক্ষ্যে নাথান কোল্টার নাইলের বলে আক্রমণে গিয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ। কিন্তু নাথানের তৃতীয় বলে স্কয়ার লেগে কামিন্সকে ক্যাচ দিয়ে থেমে যেতে হয় মাহমুদউল্লাহকে। অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যানের আউটের পরই আসলে ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়ে বাংলাদেশ। সাব্বির বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সুযোগ পেয়ে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। প্রথম বলে নাথানের বলে ক্লিন বোল্ড হয়ে ফিরেছেন বিস্ফোরক এই ব্যাটসম্যান। হ্যাটট্রিক হতে পারতো নাথানের। সেটা ঠেকিয়ে দেন তরুণ অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান।  সবমিলিয়ে ৩৩৩ রানে গিয়ে থামে বাংলাদেশের স্কোর! 

এই হারে সেমিফাইনালে যাওয়ার পথটা অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে লাল-সবুজ জার্সিধারীদের। আফগানিস্তান, ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে আগামী তিন ম্যাচে জিতলেও অনেক সমীকরণের মধ্যে পড়তে হবে বাংলাদেশকে। ট্রেন্টব্রিজে খেলা দেখতে আসা দর্শকরা হতাশা নিয়েই বাড়ি ফিরেছেন!

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ হারের মূল কারণ অবশ্য ফিল্ডিংয়ের ব্যর্থতা। অস্ট্রেলিয়াকে আটকাতে হলে ফিল্ডিংয়ে ভালো করার বিকল্প নেই। আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফি এমনটা বলেছিলেন। কিন্তু মাঠে এর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ে এলোমেলো বাংলাদেশকে দেখা গেছে। যার প্রমাণ ব্যক্তিগত ১০ রানে সাব্বিরের হাতে জীবন পেয়েছিলেন ডেভিড ওয়ার্নার। ওই জীবনের বিনিময়ে ওয়ার্নার খেলেছেন ১৬৬ রানের ইনিংস।

মাশরাফির করা পঞ্চম ওভারে পয়েন্টে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন ওয়ার্নার। কিন্তু দলের সেরা ফিল্ডার হয়েও এই ক্যাচটি লুফে নিতে পারেননি তিনি। আর তাতেই যা হওয়ার তাই হলো। ওয়ার্নারের ১৬৬ রানের ওপর ভর করে অজিরা ৩৮১ রানের পাহাড় গড়েছে। সেই পাহাড়ে চড়তে গিয়ে পা হড়কেছেন তামিম ইকবাল ও সৌম্য সরকার।

এতো বড় রান তাড়ায় ওপেনিংয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তামিম-সৌম্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলেন। শুরুতে রান আউটে কাটা পড়েন সৌম্য সরকার। তামিম-সাকিবকে নিয়ে জুটি গড়ার চেষ্টা করলেও ছিলেন না আগ্রাসী ভূমিকাতে। সাব্বিরের ওই ক্যাচ মিসের পর তামিমের খোলসবন্দী হয়ে ব্যাটিং করা আরও ডুবিয়েছে বাংলাদেশকে। ৮৩.৭৮  স্ট্রাইকরেটে ৭৪ বলে ৬২ রান করেছেন তামিম। কিন্তু সেখানে তার ডট বলের সংখ্যা চমকে যাওয়ার মতো! ৭৪টি বল খেলা তামিম ডট বলই দিয়েছেন ৩৬ বলে! ৬টি বাউন্ডারিতে ২৪ রান করে বাকি ৩৮ রান করতে খেলেছেন ৬৮ বল!

দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে জাতীয় দলে খেলা একজন ওপেনারের স্ট্রাইকরেট এমন হলে যে কোন দলের জন্যই ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন! টিম ম্যানেজমেন্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তাকে লাইসেন্স দিয়েছে ধরে খেলার। কিন্তু এই লাইসেন্সে দলের কতটা উপকার হচ্ছে ভাবার সময় এসেছে দল সংশ্লিষ্ট সকলের।

ম্যাচ হারলেও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই ম্যাচে বাংলাদেশের প্রাপ্তি অবশ্য কম নয়। অজিদের বিপক্ষে বাংলাদেশ তাদের ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান করেছে। ওভালে চলতি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৩০ রান করেছিল বাংলাদেশ। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সেটাকে টপকে গেছে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এর আগে ২৯৫ রান করার অভিজ্ঞতা থাকলেও বৃহস্পতিবার সেটাকে ছাড়িয়ে ৩৩৩ রানে নিয়ে গেছে মাশরাফিরা। এমন হার কিছুটা কষ্ট দিলেও আনন্দের কারণও আছে। প্রতিপক্ষকে ভয় না করে বুক চিতিয়ে লড়াই করার মধ্যেও একটা আনন্দ আছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। তবে প্রত্যেকবারেই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে মাশরাফিদের। এবারো এর ব্যতিক্রম হয়নি।

গত চার ম্যাচে ধারাবাহিক ভাবে রান করা সাকিবকে নিয়ে বিস্তর পরিকল্পনা এঁটেছিল অস্ট্রেলিয়া। সাকিবকে তার মতো করে খেলতে দেয়নি অজিরা। মার্কাস স্টোইনিসের স্লোয়ারে ওয়ার্নারকে মিড অফে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নিয়েছেন সাকিব। ততক্ষণে মুশফিক ক্রিজে জমে গেছেন, লিটনকে নিয়ে দ্রুত রান তোলার চেষ্টা করছিলেন। যদিও লিটন সাজঘরে ফেরেন লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ে। মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ অবশ্য ৪০ ওভারের পর ম্যাচ জমিয়ে তুলে ছিলেন। কিন্তু মাহমুদউল্লাহ ৫০ বলে ৬৯ রানে আউট হওয়ার পরই ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে যায় বাংলাদেশ।

ক্রিজের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুশফিকের সেঞ্চুরি করা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সপ্তম সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে শেষ পর্যন্ত ৯৭ বলে ১০২ রানে অপরাজিত থাকেন এই উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান।

/এফআইআর/

লাইভ

টপ