ঐতিহ্যের ধারক লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড

Send
রবিউল ইসলাম, লন্ডন থেকে
প্রকাশিত : ১১:০১, জুলাই ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:০৬, জুলাই ১৪, ২০১৯

লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড।বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অভিজাত ক্রিকেট স্টেডিয়াম লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড। লন্ডনের এই স্টেডিয়ামকে কেউ কেউ ক্রিকেটের তীর্থস্থান হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮১৪ সালে। মাঠের প্রতিষ্ঠাতা টমাস লর্ডসের নামানুসারেই নামকরণ করা হয়েছে অভিজাত এই স্টেডিয়ামের।

টমাস লর্ডস তিনটি মাঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত তিনটি মাঠের মধ্যে তৃতীয় মাঠটিই বর্তমানে লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড হিসেবে পরিচিত। লর্ডসের প্রথম মাঠটি ওল্ড গ্রাউন্ড, বর্তমানে ডরসেট স্কয়ার নামে পরিচিত। দ্বিতীয় মাঠটি লর্ডস মিডল গ্রাউন্ড হিসেবে পরিচিত। ১৮১১ থেকে ১৮১৩ সালের মধ্যে এটি নির্মিত হয়। যা রিজেন্ট’স ক্যানেলের জন্যে পরিত্যক্ত করা হয়েছে।

ঐতিহ্যবাহী লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের চোখে পড়ার মতো আইকনই হচ্ছে সাদা চকচকে মিডিয়া বক্সটি। গ্যালারির ওপর সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই মিডিয়া বক্সটি লর্ডসের আইকনিক প্রতিচ্ছবি। লন্ডনের সেন্ট জন’স উড এলাকায় অবস্থিত স্টেডিয়ামটি ক্রিকেটের হোম অব ক্রিকেট নামে পরিচিত।

ঐতিহ্যবাহী এই স্টেডিয়ামটির দুইশত বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ একটি ম্যাচ আয়োজন করা হয় ২০১৪ সালে। ৫ জুলাই সেই ম্যাচে এমসিসি একাদশের অধিনায়ক ছিলেন শচীন টেন্ডুলকার। অন্যদিকে বিশ্ব একাদশের নেতৃত্বে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন।

পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মধ্যে এটি অন্যতম। বয়সও হয়ে গেছে প্রায় ২০৫ বছর। ইতিহাস-ঐতিহ্যে সব দিক দিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে লর্ডস সমাদৃত। বহু স্মরণীয় ঘটনারও সাক্ষী হয়ে আছে এই ভেন্যু।

লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে চোখে পড়ার মতো আইকনই হচ্ছে সাদা চকচকে মিডিয়া বক্সটি। বিশ্বের একমাত্র ভেন্যু হিসেবে লর্ডসে ৫টি বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৫, ১৯৭৯, ১৯৮৩, ১৯৯৯ সালের পর ২০১৯ সালের ফাইনালটিও এই ঐত্যিহাসিক ভেন্যুতে হচ্ছে। আজ স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচ দিয়েই পর্দা নামবে বিশ্বকাপের দ্বাদশ আসরটির।

এই মাঠে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি), ইউরোপীয় ক্রিকেট কাউন্সিল (ইসিসি) ও মিডলসেক্স কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের অফিস অবস্থিত। ২০০৫ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সদর দফতরও এখানে ছিল। পরে সেটির স্থানান্তর হলেও ক্রিকেট সাংবাদিকতা করে এমন একটি সংগঠনের দপ্তর এই ভেন্যুতেই।

লর্ডসের প্রবেশ মুখে রয়েছে কিংবদন্তি ইংলিশ ক্রিকেটার ডব্লিউ জি গ্রেসের ভাস্কর্য। শশ্রুমণ্ডিত চেহারার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন তিনি৷ তাকে ক্রিকেটের অমর বুড়ো বলেও ডাকা হয়। লর্ডসে ঢোকার মুখে গ্যালারির বাইরে চোখে পড়বে কিংবদন্তি এই ক্রিকেটারের এই ভাস্কর্য৷

কিংবদন্তি ইংলিশ ক্রিকেটার ডব্লিউ জি গ্রেসের ভাস্কর্য। লর্ডসে রয়েছে মোট আটটি স্ট্যান্ড বা গ্যালারি। দ্য প্যাভিলিয়ন, ওয়ার্নার স্ট্যান্ড, গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড, কম্পটন স্ট্যান্ড, মিডিয়া সেন্টার, এডরিচ স্ট্যান্ড, অ্যালান স্যান্ড, ট্যাভার্ন স্ট্যান্ড ও মাউন্ড স্ট্যান্ড। প্রতিটি স্ট্যান্ড নির্মিত হয়েছে বিখ্যাত স্থপতিদের করা নকশায়। 

লর্ডসের মাঠের বিশেষত্ব হলো এর স্লোপ বা ঢাল৷ পুরো মাঠেই শেষ প্রান্তটা একটু ঢালু৷ দক্ষিণ পূর্ব দিকের চেয়ে উত্তর পশ্চিম দিকটা ২ দশমিক ৫ মিটার উঁচু৷

ক্রিকেটের মক্কায় ভিআইপি দর্শকদের বসার জায়গায় সেই বিখ্যাত ছাই রাখা আছে। তার পেছনে খেলোয়াড়দের ড্রেসিং রুম। টমাস ভেরাইটি এই প্যাভিলিয়নটি নির্মাণ করেন৷ ১৮৯০ সালে হয় এর উন্মোচন৷ দুটি ব্যালকনিতে বসে খেলোয়াড়রা খেলা দেখেন। এমন ব্যালকনি পৃথিবীর কোন মাঠেই আর নেই। খেলোয়াড়রা মাঠে নামার আগে এখানেই তৈরি হয়ে বসে থাকেন, খেলা দেখেন৷ ম্যাচের পরিস্থিতি নিয়ে পরিকল্পনা করেন।

এ ছাড়া ভিআইপিদের জন্য লং রুম, লং রুম বার সুবিধাতো আছেই। লং রুমের অবশ্য ছবি তোলা নিষেধ৷ ড্রেসিং রুম থেকে লং রুমের মধ্য দিয়েই খেলোয়াড়রা মাঠে প্রবেশ করেন৷

লর্ডসে আছে দুটি ড্রেসিং রুম৷ আছে ইংল্যান্ডের রানীর খেলা দেখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। প্রেসবক্সের উপরের দিকে একটি ঘরের জানালা দিয়ে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ খেলা দেখেন৷ তার জন্য রয়েছে একটি বিশেষ চেয়ার।

লডর্স স্টেডিয়ামে রয়েছে একটি অনার্স বোর্ড। এখানে ম্যাচে সেঞ্চুরি কিংবা ৫ উইকেট নিলে খেলোয়াড়দের নাম লিখে রাখা হয়। ২০১০ সালে লর্ডস টেস্টে সেঞ্চুরি করে তামিম প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে লর্ডসের অর্নাস বোর্ডে নাম লেখান। ব্যাটসম্যান তামিমের পর বোলার হিসেবে শাহাদাত হোসেন রাজিব অর্নাস বোর্ডে নাম উঠিয়েছেন। চলতি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে মোস্তাফিজও তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে ৫ উইকেট নিয়ে এই কীর্তি গড়েছেন।

এছাড়া খেলার সামগ্রী বিক্রয়ের জন্য আছে একটি স্যুভেনির শপ। এখানে ক্রিকেট বল থেকে শুরু করে জার্সি, খাতা, কলম, সোয়েটার– ক্রিকেটের নানা সরঞ্জাম পাওয়া যায়। দোকানটি স্টেডিয়ামের এক কোনায় অবস্থিত।

শুধু তাই নয় মাঠের পাশাপাশি মাঠের বাইরে শুয়ে বসে খেলা দেখার ব্যবস্থা রেখেছে এমসিসি কর্তৃপক্ষ। ম্যাচ চলাকালীন সময়ে মেরিলেবোন ক্রিকেট একাডেমির একপাশে বড় স্ক্রিনে খেলা দেখার ব্যবস্থাও রাখা হয়। গ্যালারি ছেড়ে কিছুটা রিলাক্স সময় কাটাতে এখানে বসে দর্শকরা খেলা দেখতে পারেন। গ্যালারির পাশাপাশি এখানে খাবার-দাবার বা পানীয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

/এফআইআর/

লাইভ

টপ