বিপিএল কি জনপ্রিয়তা হারাতে যাচ্ছে?

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২৩:০৪, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:২৭, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

বিপিএল লোগো২০১২ সালে জমজমাটভাবেই যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)। এর মাধ্যমে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ক্রমবর্ধমান বাজারে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয় বাংলাদেশ। কিন্তু শুরুর দুই আসরে নানা অনিয়ম ও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কারণে হঠাতই স্থগিত হয়ে গিয়েছিল বিপিএল। এক বছর বন্ধ থাকার পর পুনরায় নতুন নিয়মে শুরু হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ঘরোয়া আসর।

তৃতীয় আসরে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে চার বছরের চুক্তি করে বিসিবি। আবার বিপিএলের চতুর্থ আসরে নাম লেখানো খুলনা টাইটানস ও রাজশাহী কিংসের সঙ্গে বিসিবির চুক্তি হয়েছিল তিন বছরের। চলতি বছর চার বছরের চক্র শেষ হলে নতুন করে ফ্র্যাঞ্চাইজি ও বিসিবির মধ্যে চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। সেই পরিকল্পনা পূরণ করার জন্য বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের আলাদা আলাদা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেইসব বৈঠকে বেশিরভাগ ফ্র্যাঞ্চাইজিদের দাবি দাওয়াগুলো মনঃপুত না হওয়ায় চলতি বছর নতুন আঙ্গিকে বিপিএল আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নামে চলতি বছরের ডিসেম্বরে সপ্তম আসর আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে বিসিবি। চমকের এখানেই শেষ নয়। এই আসরে কোনও ফ্র্যাঞ্চাইজিকেই রাখছে না তারা। নিজেদের অর্থায়নে বিসিবি নিজেই অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে পরিচালনা করবে বলে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে জানান বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন, ‘বিপিএলের প্রথম পর্বের চুক্তি শেষ হয়ে গেছে। আমাদের সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের নতুন চুক্তি করার কথা। কিন্তু ওদের অনেক দাবি-দাওয়া আছে। সেগুলোর সঙ্গে আমাদের পরিকল্পনার মিল নেই। সবকিছু চিন্তা করে আমরা এবার ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে চুক্তিতে যাচ্ছি না। আগামী বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। তার নামে আমরা বঙ্গবন্ধু বিপিএল আয়োজন করবো। এবারের বিপিএলের দলগুলোর ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বেও বিসিবি। ক্রিকেটারদের খাওয়া-দাওয়া, টাকা পয়সা- সব আমরা দেখব।’

অথচ বিপিএলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বেশিরভাগ ফ্র্যাঞ্চাইজি। খুলনা টাইটানস থেকে শুরু করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স, রংপুর রাইডার্স, ঢাকা ডায়নামাইটসহ সবগুলো ফ্র্যাঞ্চাইজিই আলাদা আলাদা ব্র্যান্ড ভ্যালু সৃষ্টি করেছে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা সমর্থক গোষ্ঠিও তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থায় ফ্র্যাঞ্চাইজি ছাড়া বিপিএল হলে ভক্তদের মাঝে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। প্রশ্নের মুখে পড়বে বিপিএল- এমনটা মনে করেন ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের চেয়ারপার্সন নাফিসা কামাল জানালেন তেমনটাই, 'প্রত্যেকটা ফ্র্যাঞ্চাইজি বড় অবদান রাখে। একটু একটু করে আমরা প্রত্যেকে ব্র্যান্ড ভ্যালু অ্যাড করেছি। গতকাল যখন ঘোষণা করা হলো, আমাদের দল মাঠে থাকবে কিন্তু আমরা এর কোন অংশ নই। এটা শোনার পর তা মেনে নেওয়া কঠিন। আমরা যে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছি। এরফলে আমাদের এতদিনের কষ্ট সব বৃথা হয়ে যাবে।'

কয়েক সপ্তাহ আগে নাফিসা কামালের সঙ্গেও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল। সেই বৈঠক শেষে নাফিসা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘আমাদের আলোচনার মূল বিষয় ছিল লভ্যাংশ ভাগ করা। আমরা সাত বছর ধরে বিপিএল খেলছি (নাফিসা প্রথম তিন বিপিএলে সিলেটভিত্তিক দলের অংশীদার ছিলেন)। সুতরাং মালিক হিসেবে আমি সবচেয়ে পুরনো। কুমিল্লার আগে সিলেটের সঙ্গে ছিলাম। এখন পর্যন্ত ব্রেক ইভেনে (ব্যয়ের সমান আয়) আসতে পারিনি। কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজিই পারেনি। এটা আমাদের সবার জন্য লস প্রজেক্ট। আমি চিন্তা করছি, আগামী বছর বিপিএলে থাকব কি না। এখন শুধু বিসিবিই লাভবান হচ্ছে। অবশ্যই আমরা তার অংশ হতে চাই। আমরা অনেক বড় অংশীদার। এখানে পুরোপুরি একপক্ষীয় টুর্নামেন্ট হচ্ছে। আমরা কিছুই পাচ্ছি না, শুধু দিয়েই যাচ্ছি।’

ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে লভ্যাংশ ভাগ নিয়ে যে বোর্ড প্রধানের একরকম আপত্তি আছে, তা তার কথাতেই স্পষ্ট, ‘লভ্যাংশ ভাগ করা সম্ভব নয়। ফ্র্যাঞ্চাইজিরা আমাদের ৮০ কোটি টাকা দিক, আমরা ৪০ কোটি টাকা দিবো। সব ছেড়ে দিয়ে, তাদের কাছ থেকে মাত্র এক কোটি টাকা নিচ্ছি। বিপিএল ব্যবসায় জায়গা নয়, এখানে আসলে খেলোয়াড়দের উন্নয়ন করতে হবে।’

বলা হচ্ছে শুধু যে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের লভ্যাংশ চাওয়ার কারণেই বিসিবি বঙ্গবন্ধুর নামে বিপিএল করছে বিষয়টি তেমন নয়। ঘটনার সূত্রপাত আরও আগে। সাকিবের রংপুর রাইডার্সে যোগ দেওয়ার পর থেকে। গত তিন মৌসুম সাকিব ঢাকা ডায়নামাইটসে খেলেছেন। কিন্তু সপ্তম আসর শুরু হওয়ার আগে চার কোটি টাকার প্রস্তাবে দল বদল করে রংপুর রাইডার্সে যোগ দেন সাকিব।  আর তাতেই ক্ষুব্ধ হওয়ার খবর পাওয়া যায় ঢাকা ডায়নামাইটস কর্তৃপক্ষের।
অবশ্য শুধু সাকিবই নন, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মুশফিক রহিমও আগের দল ছেড়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সে যোগ দিয়েছেন। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল তাদের এই দল বদলকে অবৈধ ঘোষণা করে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের রায় দিয়েছে। নতুন চুক্তি হওয়ার আগে কিভাবে দলগুলো নতুন খেলোয়াড় দলে নেয়; এমন প্রশ্নও তোলে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল।

বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল হাসান পাপনও অনেকটা একই সুরে কথা বলেছেন, ‘একটি দল থেকে চাইলেই খেলোয়াড় নিয়ে নেওয়া যায় না। একটা নিয়ম আছে, সেই নিয়ম মেনেই সবাইকে চলতে হবে। ৮০ লাখ টাকার খেলোয়াড়কে ৪ কোটি টাকা দিয়ে কারা নেয়। লস হলে কি নিতো? অবশ্যই লাভ হয় বলেই নিচ্ছে।’

ফ্র্যাঞ্চাইজিবিহীন নতুন নিয়মে স্বাভাবিকভাবেই জৌলুস হারাতে যাচ্ছে বিপিএল। কারণ কুড়ি ওভারের ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক এই টুর্নামেন্টকে আকর্ষণীয় করতে মালিকপক্ষ সব সময়ই ছিল তৎপর। গত আসরেও রংপুর রাইডার্স, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স, খুলনা টাইটানস, ঢাকা ডায়নামাইটস বিদেশি ভালো মানের অনেক ক্রিকেটারদের দলে ভিড়িয়েছিল। সপ্তম আসর শুরু হওয়ার আগে সেভাবেই আগোনোর চেষ্টা ছিল এই দলগুলোর। খুলনা টাইটানস বিদেশি কোটায় শেন ওয়াটসনের সঙ্গেও চুক্তি করেছিল। রাজশাহী কিংস চুক্তি করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকার জেপি দুমিনির সঙ্গে। কিন্তু সেই সব চুক্তির আর কোন বৈধতা থাকছে না এখন আর। নিজস্ব অর্থায়নে বিপিএল চালালে স্বাভাবিকভাবেই বিসিবি ভালো মানের বিদেশি খেলোয়াড় ও কোচের দিকে ঝুঁকবে না। যা জৌলুসহীন একটি বিপিএলের ইঙ্গিতই দিচ্ছে। অবশ্য শেষ চমক হিসেবে এবারের বিপিএলের মডেলেও আসতে পারে পরিবর্তন!

তবে এতসব বিপত্তি থাকার পরেও আগামী বিশেষ এই আসরে যোগ দিতে চান বিপিএলের সাবেক চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের মালিক নাফিসা। সম্প্রতি বলেছেন, জাতির জনকের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে বিপিএল আয়োজনের যে সিদ্ধান্ত বিসিবি নিয়েছে, তাতে তিনি তার দল নিয়ে অংশগ্রহণ করতে চান এবং বিপিএলের গৌরমবয় এক অধ্যায়ের অংশ হতে চান। বৃহস্পতিবার সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘ বঙ্গবন্ধুর নামে বিপিএল হচ্ছে। বোর্ড প্রধানকে ধন্যবাদ জানাই চমৎকার একটি উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিপিএল আমরাতো এর বাইরে থাকতে পারি না। অনেক বছর ধরে বিপিএল করে আসছি। ৬ বছর ধরে এখানে আছি। অন্য দলেও ছিলাম। আমি যেহেতু লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। আজ যখন বিপিএল সবচেয়ে সুন্দর ও গৌরবময় একটি জায়গায় এসে পৌঁছেছে। বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিপিএলটি আয়োজিত হচ্ছে, আমি কখনোই এর বাইরে থাকতে পারি না।’

/আরআই/এফআইআর/

লাইভ

টপ