ক্রিকেটারদের সংবাদ সম্মেলনে যা বলা হলো

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২২:৪৭, অক্টোবর ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০১, অক্টোবর ২৩, ২০১৯

73472520_1369667503209098_798291385030541312_nবাংলাদেশের ক্রিকেটে চলছে অনিশ্চয়তা। ১১ দফা দাবিতে ধর্মঘটে গেছেন তারা। সাকিব-তামিমদের এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করে মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করেন বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। তারই প্রেক্ষিতে নিজেদের অবস্থান জানাতে গুলশানে সাংবাদিকদের সামনে হাজির হন ক্রিকেটাররা। সেখানে তাদের মুখপাত্র হিসেবে কথা বলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান। পুরো সংবাদ সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে দেওয়া হলো বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের জন্য-

আমি মোস্তাফিজুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। বাংলাদেশের পেশাদার ক্রিকেটারদের মুখপাত্র হিসেবে আমি হাজির হয়েছি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আমাকে সরাসরি নিয়োগ দিয়েছে।

আমি আজ বিকাল ৪টার দিকে ডাকযোগে, কুরিয়ারযোগে এবং ইমেইলযোগে বিসিবিকে একটা চিঠি দিয়েছি। সেই চিঠিতে ক্রিকেটারদের তরফ থেকে ১৩টা দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে। সেই ১৩ দাবি এখন আমি তুলে ধরছি।

১. ক্রিকেট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) বর্তমান সদস্যদের পদত্যাগ করতে হবে। আমাদের আন্দোলন কারও বিরুদ্ধে নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পেশাদার ক্রিকেটারদের সংগঠন আছে; ওইসব সংগঠনের একটা স্বাধীনতা থাকে, স্বতন্ত্রতা থাকে। যাদের প্রতিনিধিত্ব করছে সংগঠন তাদের  স্বাধীনতা-স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করতে চায়। যেহেতু কোয়াবের বর্তমান দায়িত্বশীলরা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অন্যান্য পদে অসীন আছেন, যেহেতু তাদের কেউ কেউ হয়তো ক্লাবের সাথে সংশ্লিষ্ট, যেহেতু তাদের কেউ কেউ স্পন্সরদের সাথে সংশ্লিষ্ট, এ কারণে ক্রিকেটাররা মনে করেন, তাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটা অসুবিধা আছে। এক্ষেত্রে কোয়াবের বর্তমান দায়িত্বশীলদের স্বার্থের ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে চলে আসে। এটা তাদের ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, এটা তাদের অবস্থানের কারণে হয়। এ কারণে ক্রিকেটাদের দাবি হচ্ছে, কোয়াবের দায়িত্বশীলরা পদত্যাগ করবে। সেইসঙ্গে প্রফেশনাল ক্রিকেটার অ্যাসোসিয়েশন নামে আরেকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। পেশাদার ক্রিকেটাররা এর সদস্য হবেন। প্রতি বছর তারা নির্বাচন করবে। এর মধ্যদিয়ে দায়িত্বশীল ঠিক করা হবে, যারা পেশাদার ক্রিকেটারদের স্বার্থ নিয়ে তারা কাজ করবে।

২. ঢাকা প্রিমিয়ার লিগসহ ঢাকার অন্য লিগগুলো আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে হবে। বর্তমানে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে একটা ড্রাফট সিস্টেম আছে এবং ক্রিকেটারদের পেমেন্টের বিভিন্ন স্টেপ নির্ধারণ করা আছে। এবং একজন ক্রিকেটার কোন ক্লাবে খেলবে, কী টাকা পাবে তা তার নিয়ন্ত্রণে নাই। আগে ক্রিকেটাররা কোনও ক্লাবে খেলবে তা চয়েজ করতে পারতো। এবং একজন ক্রিকেটারের মান-মর্যাদা অনুযায়ী বাজার তার একটা মূল্য নির্ধারণ করতে পারতো। ক্রিকেটাররা মনে করে, এই ব্যবস্থা ফিরে আসা উচিত।

৩. বিপিএল আগামী বছর থেকে আগের নিয়মে নিতে হবে। ক্রিকেটারের মান-মর্যাদা অনুযায়ী এখানেও তাদের মূল্য ঠিক করতে হবে। আর বিদেশি ও দেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে যে বৈষম্য আছে তা দূর করতে হবে। এই বৈষম্য একটা স্বাধীন দেশে দৃষ্টিকটু।

৪. প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ম্যাচ ফি অন্ততপক্ষে একলাখ টাকা করতে হবে। এবং প্লেয়ারদের যে বেতন তা বাড়াতে হবে এবং প্রতি বছর রিভিউ করতে হবে। সারাবছর ধরে কোচের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং ফিজিও দিতে হবে।

৫. সারাবছর ধরে যাতে ক্রিকেটাররা প্র্যাকটিস করতে পারে, সে অনুযায়ী অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

৬. চুক্তিভুক্ত ক্রিকেটারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বর্তমানে মনে হয় চুক্তিভুক্ত ক্রিকেটার আছেন ১২-১৩ জন; এই সংখ্যা অন্ততপক্ষে ৩০ জন করতে হবে। এটা ক্রিকেটারদের ফিন্যানশিয়াল সিকিউরিটি নিশ্চিত করবে।

৭. লোকাল স্টাফ, গ্রাউন্ডসম্যান ও কোচিং স্টাফদের বেতন ও সুযোগসুবিধা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে বিদেশি গ্রাউন্ডসম্যান ও কোচিং স্টাফদের বেতন ও সুযোগসুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে। যথেষ্ট উপার্জন না হওয়ার কারণে গত এক-দেড় মাসে ১৬ জন গ্রাউন্ডসম্যান রিটায়ার্ড করেছে। বিদেশি কোচ আসলে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের কোচিং স্টাফদের ট্যাগ করতে হবে। এতে লোকাল কোচিং স্টাফদের উন্নয়ন হবে।

৮. লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেট ম্যাচ ও ফার্স্ট ডিভিশন, সেকেন্ড ডিভিশন, থার্ড ডিভিশন ম্যাচ-টুর্নামেন্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এবং অন্ততপক্ষে আরও একটা ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট বাড়াতে হবে। কারণ বিপিএলের মতো টুর্নামেন্টে সবাই অংশ নিতে পারে না।

৯. ঘরোয়া ক্রিকেটে ক্যালেন্ডার করে তা মেনে খেলতে হবে। ক্যালেন্ডার এখনও আছে, তবে তা মানা হয় না। একটা ক্রিকেটসূচি থাকবে এবং তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একটা ক্রিকেটার যাতে তার পারিপার্শ্বিক জীবনটা ঠিক মতো চালাতে পারে, সেক্ষেত্রে এই ক্যালেন্ডার ক্রিকেটারদের সাহায্য করবে। ক্যালেন্ডার থাকলে সে অনুযায়ী একজন ক্রিকেটার প্ল্যান করতে পারবে।

১০. বিপিএলের পাওনা টাকা সময়ের মধ্যে দিতে হবে। বিপিএল ছাড়া অন্য ক্লাবের ক্ষেত্রেও খেলোয়াড়দের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে সময়মতো। ফার্স্ট ডিভিশনের ক্রিকেটারদের বছরের পাওনা বছরে দেওয়া হয় না, এটা থামাতে হবে।

১১. আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ দুটোর বেশি খেলা যাবে না, ক্রিকেটারদের জন্য করা এই বাধা তুলে দিতে হবে। একজন ক্রিকেটাদের যদি ডিমান্ড থাকবে, তবে তিনি তার ইচ্ছেমতো যে কয়টা পারেন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলবেন। তবে শর্ত থাকবে জাতীয় দলের খেলা থাকলে একজন ন্যাশনাল প্লেয়ার ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলতে পারবেন না।

১২. ক্রিকেটের ব্যবস্থাপনায় আমরা স্বচ্ছতা চাই, জবাবদিহিতা চাই। ক্রিকেটে যে কমার্শিয়াল রেভিনিউ জেনারেট হচ্ছে এর একটা ন্যায্য হিস্যা ক্রিকেটারদের দিতে হবে। কারণ এই রেভিনিউটা জেনারেট হচ্ছে ক্রিকেটারদের শ্রমের কারণে।

১৩. বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দল ভালো করছে। নারীদের বেলায়ও ওই একই দাবি প্রযোজ্য হবে। নারীদের ক্ষেত্রেও তাদের ন্যায্য হিসাব দিতে হবে। পুরুষ ক্রিকেটার ও নারী ক্রিকেটারদের বেতন ও অন্য সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রে কোনও বৈষম্য থাকবে না। বাংলাদেশের পুরুষ ক্রিকেটাররা মনে করে নারী ক্রিকেটাররাও একই শ্রদ্ধার দাবিদার।

অনিশ্চয়তার ঝুঁকিতে থাকেন ক্রিকেটাররা

চিঠির শেষে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই। এই যে বলা হচ্ছে, ক্রিকেটাররা বেশি টাকা চাচ্ছে। আমি দুজন ক্রিকেটারের কথা বলবো। আক্ষরিক অর্থে নয়, আলঙ্করিক অর্থে বলবো। একজন ক্রিকেটার যে শুধু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে, নিয়মিত লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেট খেলে। কিন্তু জাতীয় দলের জন্য তেমন ভালো নয়, যার বয়স ২৪-২৫। আরেকজন ক্রিকেটার যার বয়স ১৬-১৭, যে খুব ভালো খেলে, কিন্তু তার পরিবার তাকে খেলতে দিচ্ছে না। কারণ এখানে তার ক্যারিয়ারের কোনও নিশ্চয়তা নেই। আমাদের দাবি হলো একজন ক্রিকেটার কী পরিমাণ ত্যাগ করে, তাকে ঠিক কতটা রেস্পেক্ট করে। একটা ক্রিকেটার অনেক ত্যাগ করে, তারা ১৬-১৭ বছর বয়সে পড়াশোনা বাদ দিয়ে পুরোপুরি ক্রিকেট খেলে। ২৩-২৪ বছর বয়সে গিয়ে কর্পোরেট ক্যারিয়ার বাদ দিয়ে ক্রিকেটে মনোযোগ দেয়। আমি অনেক ক্রিকেটারের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা অনেক বেশি প্রতিভাবান। তারা যদি মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতো, তাহলে বুয়েটে পড়তে পারতো, ব্যাংকে চাকরি করতে পারতো। অথচ তারা ঝুঁকি নিয়ে ক্রিকেট খেলে যায়। ঝুঁকিটা কী? ফর্ম আর ইনজুরি। আজ যে খেলছে, সে এমন এক চোটে পড়লো হয়তো বাকি জীবন আর খেলতে পারবে না। অথচ সে তার উজ্জ্বল ক্যারিয়ার গড়া বাদ দিয়ে খেলতে এসেছিল। আরেকজন ক্রিকেটার শুধু ফর্মের ঘাটতির কারণে বাদ পড়লো। তারও কিন্তু আয়-উপার্জন করার অধিকার আছে। সেই আয়-উপার্জনের নিশ্চয়তা আমরা চাই। উন্নত দেশে ক্রিকেটারদের জন্য ওয়েলফেয়ার ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের একটা কমপেনসেশন ফান্ড আছে। যেখানে ক্রিকেটার ইনজুরি হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, বাংলাদেশে যে দেওয়া হয় না তা নয়। কিন্তু ইনজুরি পাওয়া খেলোয়াড়ের বোর্ডের সদিচ্ছা বা দাক্ষিণ্যের প্রয়োজন হয়। আমরা মনে করি এখানে একটা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি থাকতে হবে। তাদের জন্য একটা ওয়েলফেয়ার ফান্ড হবে, যেখানে বোর্ডের রেভিনিউ থেকে কিছু অংশ দেওয়া হবে এবং পেনশন সিস্টেম থাকবে, একজন ক্রিকেটার অবসর নেওয়ার পর পেনশন পাবে। ইন্স্যুরেন্স সিস্টেম থাকবে। বাংলাদেশ কিন্তু এরকম রেভিনিউ  তৈরি করতে পারছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের উপার্জন ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের পরই।

দাবির প্রতি সমর্থন পাওয়ার আশা

ক্রিকেটারদের যে এই আন্দোলন, এটা কারও বিরুদ্ধে না। এটা তাদের দাবি আদায়ের স্বপক্ষে। তাদের বিশ্বাস এই দাবিটা যৌক্তিক। তাদের বিশ্বাস, এই দাবিগুলো জনগণ ও সমর্থকদের সামনে উত্থাপন করলে তাদের সহানুভূতি পাবে।

বিসিবির সঙ্গে বৈঠকে বসতে চান ক্রিকেটাররা

ক্রিকেটারদের আন্দোলন তাদের দাবি আদায়ের স্বপক্ষে। ক্রিকেটাররা বিশ্বাস করেন আপনাদের মাধ্যমে জনগণকে নিয়ে তাদের দাবি আদায় করা সম্ভব। এই দাবিগুলোর ব্যাপারে বোর্ডে সুস্পষ্ট ধারণা পেলে তারা ক্রিকেটে ফিরে আসবে। আজকেই তারা আলোচনায় বসবে, এখান থেকে আলোচনায় যেতে পারে। এটা ওদের পেশা। ক্রিকেট থেকে দূরে থাকলেই তো ক্ষতি। বোর্ড স্পষ্ট করলে তারা ক্রিকেটে ফিরে আসবে। বোর্ডের সঙ্গে আলোচনার পর বোর্ড সভাপতির সঙ্গে কথা বলবেন তারা, যদি সময় থাকে।

দেড়দিন সময় নেওয়ার কারণ তারা চেয়েছেন সব কিছু গুছিয়ে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করা। তারা আজকে আলোচনা করবেন বোর্ডের সঙ্গে।

আন্দোলনের পেছনে উসকানি নেই

ব্যক্তিগতভাবে কারও সঙ্গে কোনও রেষারেষি নেই। তারা (ক্রিকেটাররা) কারও উসকানিতে কাজ করছে না, কারও প্ররোচনাতেও তারা কাজ করছে না।

যে দাবিগুলো আপনাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে মনে প্রশ্ন আসতে পারে— কেন এখন তারা এই চরম উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে? গত ৪-৫ বছর ধরে আমরা (ক্রিকেটাররা) এই দাবিগুলো আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেট বোর্ডের সামনে উপস্থাপন করেছি। ক্ষেত্র বিশেষে যে টুকটাক সমাধান হয়নি, তা নয়। বিভিন্ন সময়ে তাদের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো এর কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই। সেটা পাওয়ার জন্যই এই দাবি।এরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করে ক্রিকেট খেলে। ১০-১৫ বছরে পুরো জীবনের অর্থ উপার্জন করতে হয় তাদের। এর মধ্যেও নানা প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয়।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিসিবির সাক্ষাত

ক্রিকেটাররা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনেক শ্রদ্ধা করেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন ভালো খেলেন, তখন উনি সবসময় মাঠে ছুটে যান। উনার একনিষ্ঠ সমর্থন সবসময় বাংলাদেশ দলের জন্য থাকে। এজন্য তারা খুব কৃতজ্ঞ। আর প্রধানমন্ত্রী যদি এই বিষয়ে আগ্রহ দেখান, তাহলে তারা অনেক কৃতজ্ঞ হবেন।

/আরআই/এমএ/এফএইচএম/

লাইভ

টপ