behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

ক্রীড়া সাংবাদিকদের 'ভারত বিড়ম্বনা'

রবিউল ইসলাম, ভারত থেকে ফিরে০০:৪১, এপ্রিল ০৩, ২০১৬

বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ৬ মার্চ এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ-ভারত মুখোমুখি হয়। ম্যাচটি শেষ হতে না হতেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শুরু। সময় না থাকায় বাংলাদেশ দল নির্ধারিত দুটি প্রস্তুতি ম্যাচও খেলতে পারেনি। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের অনেক ক্রীড়া সাংবাদিক ফাইনাল ম্যাচের আগেই রওয়ানা দেন ভারতের উদ্দেশে।

এশিয়া কাপ খেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের উদ্দেশে রওয়ানা দেয় বাংলাদেশ জাতীয় দল। খেলোয়াড়দের সঙ্গে-সঙ্গে এশিয়া কাপ কাভার করে তড়িঘড়ি ভারতের পথ ধরেন সাংবাদিকদের প্রায় ৫০ জনের একটি বহরও। এর মধ্যে ৭ মার্চ রাতে ৮ জনের একটি দল বেনাপোল হয়ে কলকাতার উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। ওই দলে ছিলাম আমিও। বেনাপোল বাস স্ট্যান্ডে পাওয়া গেল টাইগার শোয়েবকে। আরও ছিলেন জাতীয় দলের টিম বয় নাসিরউদ্দিন।

আমাদের আট সংবাদকর্মীর সফরের শুরুটা খারাপ ছিল না। সবার মধ্যেই বিশ্বকাপ কভার করার আলাদা রোমাঞ্চ। বিশেষ করে যারা তরুণ সাংবাদিক তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই ছিল ভিন্নরকম উত্তেজনা। রাত এগারোটায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বাসটি সকাল সাড়ে আটটায় বেনাপোল এসে পৌঁছয়। কোনও ঝামেলা ছাড়াই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ইমিগ্রেশন বিভাগের কাজ শেষ করে আমরা হরিদাসপুর দিয়ে পৌঁছে গেলাম ভারতে।

বাংলাদেশি ক্রীড়া সাংবাদিকদের একটি দল

প্রয়োজনীয় চেকিং শেষ করে চলে গেলাম ভারতীয় ইমিগ্রেশন বিভাগে। সেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে আমাদের মধ্য থেকে সিনিয়র এক সাংবাদিক পাসপোর্ট দেওয়া মাত্র ইমিগ্রেশন অফিসার জানতে চাইলেন, কী কারণে ভারত যাচ্ছেন? তিনি জানালেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো কাভার করতে। সেখানে ইমিগ্রেশনের এক বড়কর্তা অন্য কোনও কাজে হাজির হয়েছিলেন। কথোপকথন শুনতে পেয়ে হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি সবাই বাংলাদেশি সাংবাদিক?

কতজন এসেছি, সেটাও তাকে জানানো হলো। এরপর তিনি আমাদের পাশের রুমে যেতে বললেন। আমরা তার কথামতো সবাই ওই রুমে গেলাম। এবার তিনি যার-যার কাছে ভারতে যাওয়ার অনুমতি আছে কিনা, তার খোঁজ নিতে থাকলেন।

আমরা ভারতের অ্যাম্বাসিতে দেওয়া সব কাগজপত্র দেখালাম। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে আইসিসির দেওয়া ভিসা লেটার, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের দেওয়া লেটার ও নিজস্ব অফিসের লেটার। কিন্তু বড় কর্তা খুশি নন। তিনি বললেন, ভারত সরকার যে আপনাকে এখানে আসার অনুমতি দিয়েছে সেই চিঠি কোথায়?

আমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। ভিসার পর ফের কিসের অনুমতিপত্র! কী হবে এখন! আমার কাছে আইসিসির ইমেইলের ফটোকপিও নেই। যখন এটা ভাবছিলাম, তখনই আমাদের আরেক সিনিয়র বড় ভাই তার মেইলের কপি এগিয়ে দিয়ে বললেন, এতে হবে?

বড় কর্তা জবাবে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন। কিন্তু আটজনের মধ্যে কেবল দুজনের কাছেই ওই ফটোকপি আছে। বাকি ৬ জনের কারও নেই। এর মধ্যে ইনকিলাবের বিশেষ সংবাদদাতা শামীম চৌধুরী এগিয়ে এসে ব্যাপারটি বোঝাতে চাইলেন। তার সঙ্গে যোগ দিলেন মানবকণ্ঠের স্পোর্টস এডিটর মহিউদ্দিন পলাশও।

ধর্মশালার প্রেসবক্স। কিছুক্ষণ পর পর নেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া যেন রুটিন ওয়ার্ক .

কিন্তু কে শোনে কার কথা! ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তা কোনওভাবেই তা মানতে রাজি নন। এবার আমাদের চূড়ান্ত অপমানের পালা। ওই বড় কর্তা রুম থেকে চলে যাওয়ার পর ওই বিভাগের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হাজির। উঁচুস্বরে তিনি আমাদের ধমকালেন, ‘গেট আউট ফ্রম হেয়ার। গেট লস্ট। গেট আউট, আউট। ব্লাডি রাসকেল্স বাংলাদেশি।’

অবাক দৃষ্টিতে আমরা সবাই তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। নিজেরাও একে-অন্যের দিকে তাকাচ্ছি। যেন প্রতিবাদ করার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। প্রায় একঘণ্টা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার পর আমরা ইমিগ্রেশন থেকে ছাড়পত্র পেলাম।

এরপর আমাদের গন্তব্য কলকাতা বিমানবন্দর। রাত ১১টা থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার জার্নি শেষ করে তখন আমাদের আরও তিনঘণ্টার জার্নি করতে হবে। টিকিট কেটে উঠে পড়লাম বাসে। মাঝপথে আর কোনও সমস্যা হলো না।

বিমানবন্দরে প্রবেশ করেই দ্রুতই দিল্লি যাওয়ার টিকেট কেটে ফেললাম। অভ্যন্তরীণ রুটের ইমিগ্রেশনে কোনও সমস্যার মুখে পড়তে হয়নি। দিল্লিতে বিমান থেকে নেমেই আমাদের গন্তব্য ধর্মশালা। বিমানে প্রায় ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের জার্নি শেষে আমাদের যেতে হচ্ছে ধর্মশালায়।

নয়নাভিরাম হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় এসে পুরোপুরি মুগ্ধ আমরা। শান্ত মাহবুবও প্রথমবারের মতো বিদেশ ট্যুরে বের হয়েছে। মুগ্ধতা তাকে এমনই ছুঁয়ে ফেলেল যে, একবার বলেই ফেলল, চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখানে থেকে যাই কী বলিস!

প্রকৃতি প্রেমের ঘোর কাটতে সময় লাগল না বেশি। স্টেডিয়ামে গিয়েই ফের বিড়ম্বনা। বাংলাদেশের খেলা তিনটি ম্যাচের সবগুলো ম্যাচেই দশ মিনিট পরপরই ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এত সুন্দর একটি স্টেডিয়াম। অথচ সেবা এত নিম্নমানের। যার সঙ্গে বাংলাদেশি সাংবাদিকরা খুব বেশি পরিচিত নন।

শুধু কি তাই? ছোট্ট এই প্রেসবক্সে খাওয়ার বন্দোবস্তও সীমিত। দাঁড়িয়ে খাওয়ার কালচারটা না হয় মেনে নেওয়া যাচ্ছে। কিন্তু খাবার নিয়ে যেখানে দাঁড়ানোই যায় না, সেখানে খাওয়া কিভাবে সম্ভব? অবশ্য প্রথমদিন শেষে বাইরে চেয়ারের ব্যবস্থা করেন আয়োজকরা।

১৩ তারিখ ওমানের বিপক্ষে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচ শেষ করে পরের দিন আমরা রওয়ানা হই কলকাতার উদ্দেশে। এর আগে আমাদের অবশ্য বাসযোগে দিল্লি আসতে হয়েছে। ওখানে বাস কনডাক্টর অভিনব প্রতারণার চেষ্টা করলেন। জানালেন লাগেজের জন্য আলাদা অর্থ দেওয়া লাগবে। বেশ কিছুক্ষণ তর্ক-বিতর্কের পর অবশ্য সে ঝামেলা এড়ানো গেল।

কলকাতায় পাকিস্তানের বিপক্ষে  বাংলাদেশের খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে ঢুকতেই ফের হতাশা। এটা ঐতিহ্যবাহী ইডেন গার্ডেন! আমাদের জহুর আহমেদ স্টেডিয়ামের চেয়ে এখানের সুযোগ-সুবিধার করুণ দশা!

স্টেডিয়ামে ঢুকেই আমরা লিফট খুঁজছি প্রেসবক্সে যাওয়ার। জিজ্ঞেস করব, তেমন কেউ নেই।  মজার ব্যাপার ৬ তলায় উঠতেও সংবাদকর্মীরে জন্য কোনও লিফটের ব্যবস্থা নেই। সিঁড়িও বের করতে ঘুরতে হলো মিনিট কয়েক। ভাবতে অবাক লাগে, এমন একটি ঐতিহ্যবাহী স্টেডিয়ামের ব্যবস্থাপনা এমন কী করে! শুধু তাই নয়, প্রেসবক্সে গিয়েতো চোখ ছানাবড়া। ছোট-ছোট খাপে দুটি করে চেয়ার-টেবিল ফিক্সড করা। লিখতে লিখতে চেয়ারটা একটু এগিয়ে বসারও ব্যবস্থা নেই। এর মধ্যে ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই নেট চলে যাওয়া এবং বিদ্যুতের বাতি নিভে যাওয়া যেন স্বাভাবিক ঘটনা!

ধর্মশালা স্টেডিয়ামের পেছনে মুগ্ধকর দৃশ্য

খেলার দিন সাংবাদিকদের ম্যাচ টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই আইসিসি ম্যাচ টিকিটের ব্যবস্থাটা স্টেডিয়ামের কাছাকাছি কোনও এক জায়গায় করে। কিন্তু এক্ষেত্রে টিকিটের ব্যবস্থা দূরে হওয়ায় বেগ পেতে হয়েছে সাংবাদিকদের। এর মধ্যে তিনস্তরের চেকিং ব্যবস্থাতো  ছিলই। সবমিলিয়ে ইডেনে অভিজ্ঞতা প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির যোগসূত্র হয়নি।

পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ শেষ করেই বেঙ্গালুরুর উদ্দেশে বিমানের টিকিট কাটলাম। সেখানে নেমে ইমিগ্রেশন পার হতে ফের বিড়ম্বনা।  আমার গায়ে গত অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপের জার্সি। ওই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের স্পন্সর ছিল সাহারা গ্রুপ।

ইমিগ্রেশনের এক কর্তা আমাকে বললেন, এখানে সাহারা নিষিদ্ধ। আপনার গায়ে সাহারার জার্সি কেন? বহুকষ্টে তাকে বুঝিয়ে ইমিগ্রেশন পেরিয়ে বিমানে চাপলাম।

টেক সিটি বেঙ্গালুরু শহরটা সাজানো-গোছানো। অন্যসব শহরের চেয়ে একটু আলাদা। পরদিন সকালে চেন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে গিয়ে আমরা মুগ্ধ। ছোট এই মাঠটি সাজানো-গোছানো হলুদ রংয়ের গ্যালারি। প্রেসবক্সে ৭টি সারি। অদ্ভুত হলেও প্রথম চার সারির পর বাকি তিন সারিতে বসা সাংবাদিকরা খেলা দেখতে পারছিলেন না। তাদের ভরসা টিভি স্ক্রিন! নন রাইটহোল্ডার টিভি সাংবাদিকদের জন্য ওই জায়গাটা বরাদ্দ করেছে আইসিসি!

অনেক বাংলাদেশি সাংবাদিক মুম্বাই যান ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার দ্বিতীয় সেমিফাইনাল কাভার করতে। সেখানে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে তাদের।  বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী হওয়ায় অনেক হোটেল থেকে তাদের ফিরেও আসতে হয়েছে!

/এমআর/এমএনএইচ/আপ-এমপি/

ULAB
Central_college
Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ