‘সাইটে ক্রেতা আনার চেয়ে ধরে রাখাটাই ই-কমার্সে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ২০:০০, জুলাই ০১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:২৩, জুলাই ০২, ২০১৬

ফাহিম মাশরুর

দেশে ই-কমার্স এখন বিকাশমান একটি খাত। যথেষ্ঠ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে খাতটি নিয়ে। বিশ্বের বড় বড় মার্কেটপ্লেসগুলো দেশে আসতে শুরু করেছে। দেশীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ আসতে শুরু করেছে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) থেকে। সম্প্রতি দেশীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আজকেরডিল ডট কমে বিনিয়োগ করেছে বিশ্বখ্যাত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি ফেনক্স।

আজকেরডিলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বিষয়টি ইতিবাচক অর্থে দেখতে চান। তিনি মনে করেন, এই ধরনের বিনিয়োগ দেশে বড় বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে সহযোগিতা করবে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে ই-কমার্সের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সাইটে ক্রেতা আনা নয়, ক্রেতা ধরে রাখা।

ই-কমার্সের ক্ষেত্রেও এমন কিছু হওয়ার ঝুঁকি আছে। ইতোমধ্যে অনেক উদ্যোক্তা চলে এসেছে। তবে এর জন্য যে পরিমাণ ‘সিরিয়াসনেস’ দরকার সেটা চোখে পড়ছে না। ই-কমার্সের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণটা এতো বড় লাগে যেটা স্থানীয়দের জন্য অনেক কঠিন ব্যাপার।

বাংলা ট্রিবিউন: আমাদের দেশীয় ই-কমার্সের বর্তমান অবস্থা কী?

ফাহিম মাশরুর: দেশীয় ই-কমার্স নিয়ে অনেক হাইপ হয়েছে। কিন্তু প্র্যাক্টিক্যালি এই বিষয়টি অনেক চ্যালেঞ্জিং। একটি ই-কমার্স সাইট বা ফেসবুক পেজ খোলা অনেক সহজ। কিন্তু এটাকে ই-কমার্স ব্যবসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা বা ব্র্যান্ড তৈরি করা অনেক চ্যালেঞ্জিং। বিষয়টি হচ্ছে, আমাদের এখানে যখন একটি হাইপ ওঠে তখন সবাই ওই দিকেই ঝুঁকে পড়ে। যেমন কল সেন্টার, মোবাইল অ্যাপ নিয়ে ইতোপূর্বে আমরা এমন অবস্থা দেখেছি। শেষ পর্যন্ত কোনওটিই সাফল্যের সঙ্গে দাঁড়াতে পারেনি।

ই-কমার্সের ক্ষেত্রেও এমন কিছু হওয়ার ঝুঁকি আছে। ইতোমধ্যে অনেক উদ্যোক্তা চলে এসেছে। তবে এর জন্য যে পরিমাণ ‘সিরিয়াসনেস’ দরকার সেটা চোখে পড়ছে না। ই-কমার্সের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণটা এতো বড় লাগে যেটা স্থানীয়দের জন্য অনেক কঠিন ব্যাপার।

বাংলা ট্রিবিউন: ই-কমার্সে যে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা আসছে, এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ফাহিম মাশরুর: ভারত যে ই-কমার্সে এতো সাফল্য পাচ্ছে এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের। ভারতের ই-কমার্সে বিনিয়োগের প্রায় ৯০ শতাংশই ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টদের টাকা। টাইগার গ্লোবাল, সফট ব্যাংক এখন আলিবাবা ভেঞ্চার ফান্ড নিয়ে আসছে দেশটিতে। এরা সবাই বিশ্বের ই-কমার্সের বাজার তৈরিতে বিনিয়োগ করছে। ফ্লিপকার্টকে কিন্তু ভারতের কোনও ব্যাংক টাকা দেয়নি। কোনও ভারতীয় ব্যবসায়ীও টাকা দেয়নি। তারা ব্যবসায়ের মডেল তৈরি করে সেটাকে দেখিয়ে বিদেশ থেকে টাকা নিয়ে এসেছে। সেটিকে কাজে লাগিয়ে তারা সার্ভিস তৈরি করেছে। ভারতের ই-কমার্স সেক্টরে গত কয়েক বছরে অন্তত ৮-১০ বিলিয়ন ডলার শুধু বিনিয়োগই হয়েছে। এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ দিয়ে সম্ভব ছিল না। এই মডেলটাই আমাদের দরকার, স্থানীয় উদ্যোক্তা ও বিদেশি বিনিয়োগ। এতে বড় কোনও ‘ব্রেক থ্রু আইডিয়ার’ দরকার নেই। নতুন সেবাখাতগুলোতে আরও ‘ইনক্রিমেন্টাল সাপোর্ট’ যোগ করে এটাকে ভালো করা যায়। যেমন এখন যদি ৬০ শতাংশ ভালো করে থাকি তাহলে সেটাকে ৮০ শতাংশে নেওয়াই হলো আমাদের লক্ষ্য।

একটি ই-কমার্স কোম্পানি একজন ক্রেতাকে কিভাবে আনলো এবং  তাকে ধরে রাখতে পারলো কি না এটা হচ্ছে মূল বিষয়। এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। কখন সে ধরে রাখতে পারবে? ক্রেতার অর্ডারের পরে যদি তার অভিজ্ঞতা ভালো হয় তাহলে সে আপনার কাছ থেকে আরও আরও পণ্য নেবে। এজন্য ই-কমার্সের ক্ষেত্রে কাস্টমার আনার থেকে ধরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা ট্রিবিউন: আমাদের দেশে উৎসব কেন্দ্রিক ই-কমার্সের গ্রাহক যে হারে বাড়ে সেটা উৎসব শেষে কোন অবস্থানে নেমে আসে?

ফাহিম মাশরুর: ই-কমার্সে আমরা বিভিন্ন ঋতুভিত্তিক পণ্য নিয়ে কাজ করি। যেমন এখন ঈদ, এখন বিক্রি হবে জামা-কাপড় এরপর আসবে বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিকস পণ্য। বৈশাখ এলে বৈশাখী পণ্য নিয়ে কাজ করি। শীতে শীতের পোশাক নিয়ে কাজ করা হয়। আবার যে সময়ে কোনও উৎসব থাকে না ওই সময়ে আমরা অন্যান্য সাধারণ পণ্য নিয়ে কাজ করি। যেমন, গৃহস্থালি পণ্য। যেহেতু আমারা ‘মার্কেটপ্লেস’ তাই আমাদের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো খুব বেশি ওঠানামা করে না। উৎসবের সময় অনেক বেশি বেড়ে যায় আবার উৎসব কমে গেলে একটু কমে। তবে বাড়তি ট্রেন্ড কিছুটা মার্কেট ধরে রাখে।

বাংলা ট্রিবিউন: ই-কমার্স ব্যবসার চ্যালেঞ্জগুলো কি?

ফাহিম মাশরুর: একটি ই-কমার্স কোম্পানি একজন ক্রেতাকে কিভাবে আনলো এবং  তাকে ধরে রাখতে পারলো কি না এটা হচ্ছে মূল বিষয়। এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। কখন সে ধরে রাখতে পারবে? ক্রেতার অর্ডারের পরে যদি তার অভিজ্ঞতা ভালো হয় তাহলে সে আপনার কাছ থেকে আরও আরও পণ্য নেবে। এজন্য ই-কমার্সের ক্ষেত্রে কাস্টমার আনার থেকে ধরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

আমি মনে করি সরকারের পলিসি থাকা দরকার। সাবসিডির দরকার নেই। আমরা চাই, আয়কর ও ভ্যাট পলিসি। আরেকটি হলো ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টদের জন্য ট্যাক্স পলিসি। বাংলাদেশে ‘ফরেন ইনভেস্টমেন্ট ইন ই-কমার্স’ -এর কোনও পলিসি নেই যা ভারতে ও ইন্দোনেশিয়ায় আছে। এজন্য ভারতে একটা কোম্পানি এসেই সারাদেশের মার্কেট দখল করে ফেলতে পারে না।

বাংলা ট্রিবিউন: ই-কমার্সকে যে করমুক্ত সীমার বাইরে আনা হলো। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ফাহিম মাশরুর: এটা খারাপ হলো। কারণ বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টদের জন্য ‘ট্যাক্স ফ্রি’ থাকাটা একটা উৎসাহ। বাজেটে এই সুবিধাটা তুলে নেওয়ার কোনও যুক্তি আছে বলে আমার মনে হয় না। আমি মনে করি আগে যেটা ছিলো সেটাই ভালো ছিলো। (২০২৪ সাল পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধার আওতায় ছিল)।

আজকেরডিলের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুরবাংলা ট্রিবিউন: ই-কমার্সের প্রসারে সরকারের সাবসিডি (ভর্তুকি) দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কি?

ফাহিম মাশরুর: আমি মনে করি সরকারের পলিসি থাকা দরকার। সাবসিডির দরকার নেই। আমরা চাই, আয়কর ও ভ্যাট পলিসি। আরেকটি হলো ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টদের জন্য ট্যাক্স পলিসি। বাংলাদেশে ‘ফরেন ইনভেস্টমেন্ট ইন ই-কমার্স’ -এর কোনও পলিসি নেই যা ভারতে ও ইন্দোনেশিয়ায় আছে। এজন্য ভারতে একটা কোম্পানি এসেই সারাদেশের মার্কেট দখল করে ফেলতে পারে না।

এক্ষেত্রে সরকার যদি ডাকবিভাগকে কাজে লাগাতে পারে তাহলে সে এখান থেকেই লাভ করতে পারে। ই-কমার্সের পণ্য ডেলিভারির সেবা দিয়ে সে নিজের লাভ নিক সমস্যা নেই।

বাংলা ট্রিবিউন: কোন মাধ্যমে বর্তমানে বেশি ই-কমার্স সম্পন্ন হচ্ছে?

ফাহিম মাশরুর:  ই-কমার্স সাইটগুলো বিজ্ঞাপনের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে। এরমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকও রয়েছে। তবে বেশির ভাগ গ্রাহক ফেসবুকে বিজ্ঞাপন এবং সাইটে পণ্য দেখে ফোনেই অর্ডার দেয়। 

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ফাহিম মাশরুর: বাংলা ট্রিবিউনকেও ধন্যবাদ বিষয়গুলো তুলে ধরার জন্য।

/এইচএএইচ/

লাইভ

টপ