‘আমরা একদিনেই গ্রাহকের দরজায় পৌঁছতে চাই’

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ২০:৪৩, জুলাই ১৯, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫১, জুলাই ১৯, ২০১৬

প্রিয়শপের প্রধান নির্বাহী আশিকুল আলম খান

একদিনের মধ্যে গ্রাহকের দরজায় পণ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্রত নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল দেশীয় ই-কমার্স সাইট প্রিয়শপ ডট কম। তবে সেই স্বপ্ন এখনও পূরণ না হলেও সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন প্রিয়শপ ডট কমের প্রধান নির্বাহী আশিকুল আলম খান

আশিকুল আলম খান বলেন, এই খাতে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা গেলে এ খাতে সাফল্য আসবেই। তিনি মনে করেন, ই-কমার্সে এফডিআই পলিসি থাকা, দীর্ঘমেয়াদে কর ও মূসক নীতিমালা থাকলে, ইন্টারনেট সহজলভ্য হলে এবং ই-কমার্সের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা গেলে আগামী দিনে তৈরি পোশাক শিল্পের পরেই জায়গা করে নেবে ই-কমার্স খাত।

বাংলা ট্রিবিউন: দেশে ই-কমার্সের সাম্প্রতিক খবর জানতে চাই।

আশিকুল আলম খান: আমাদের দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের একটা বড় অংশ ফেসবুক ব্যবহার করে। বেশিরভাগ ব্যবহারকারীর হাতে হাতে ফিরছে স্মার্টফোন। এই প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ার কারণে ই-কমার্সের একটা বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কারণ যারা ফেসবুক ব্যবহার করে তারা অনলাইনেই থাকে। আর অনলাইনে থাকা মানে সে তার সবকিছু অনলাইনেই চায়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম যাদের বয়স ১৮-৪০ বছরের মধ্যে, তারা তাদের ট্রেন্ডটা হলো- এখন আর শপিং মলে গিয়ে শপিং করায় না। তারা এখন চায় মোবাইলের সবকিছু।

বাংলা ট্রিবিউন: ঈদ ও ঈদ পরবর্তী ই-কমার্স কেমন হলো?

আশিকুল আলম খান: ঈদে আমাদের নিয়মিত বিক্রির চেয়ে ৪০% শতাংশ গ্রোথ (প্রবৃদ্ধি) হয়েছে।  আমি বলব এটা বড় একটা সম্ভাবনা আমাদের সেক্টরের (ই-কমার্সের) জন্য। আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা যদি বাড়ে, যদি আমরা ইন্টারনেট দেশের সব জায়গায় পৌঁছে দিতে পারি, যদি ইন্টারনেটের দামটাও সহনশীল পর্ায়ে নেমে অঅসে তাহলে ই-কমার্সকে আমরা অনেক উঁচুতে নিয়ে যেতে পারব। ই-কমার্স দিয়ে সরকারের জিডিপিতে অবদান রাখা সম্ভব।

ঈদের সময় আমাদের সাইটে বিক্রি বেড়ে গিয়েছিল ৪০ শতাংশ। গড়ে সব ই-কমার্স ব্যবসার ক্ষেত্রেই এবারের দৃশ্যটা এমন। ঈদের পর পর দেখা যায় মানুষের কাছে কিছু টাকা থাকে। তাই এই বৃদ্ধির ট্রেন্ডটা ঈদের পর এক দুই সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে। তারপর আবার রেগুলার স্টেজে চলে আসে। তবে লাভটা হচ্ছে, ঈদের কারণে অনেক নতুন ক্রেতা আসে যারা পরে আমাদের নিয়মিত ক্রেতা হয়ে যায়। ঈদ পরবর্তী কেনাকাটার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ফ্যাশন পণ্যগুলোতেই মানুষের বেশি আগ্রহ। ঘড়ি, জুয়েলারি, এসবের কেনাকাটা ঈদের পরে বেশি হচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউন: ই-কমার্স কেনাকাটায় দেশে বর্তমানে মূল্য পরিশোধের জনপ্রিয় মাধ্যম কোনটি?

আশিকুল আলম খান: সিওডি বা ক্যাশ অন ডেলিভারি কিন্তু সারা বিশ্বেই আছে। ভারতে এটি ব্যাপক জনপ্রিয় একটি মূল্য পরিশোধ মাধ্যম। অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে ক্রেতা কিন্তু পণ্য দেখছে না। পণ্যটা কেমন হবে এসব সম্পর্কে তার তেমন কোনও আইডিয়া থাকে না। তাই ক্যাশ অন ডেলিভারির বেলায়- ক্রেতার যদি পণ্য দেখে পছন্দ না হয় তাহলে তিনি তা বদলে নিতে পারেন। এতে ক্রেতার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আবার যদি আপনি ভেন্ডর আর ব্যবসায়ীর স্বার্থের কথা চিন্তা করেন তাহলে সেখানে ‘আগে পেমেন্ট’ করার সিস্টেমটা ভালো। আমাজন থেকে শুরু করে বাঘা বাঘা সব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো এই পদ্ধতিই অনুসরণ করে। এখন আমরা যদি এই পদ্ধতিতে যেতে চাই তাহলে আমাদের মোবাইল ক্যাশে (মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস) যেতে হবে।  যেমন বিকাশ, শিওর ক্যাশসহ অন্যান্য প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে পেমেন্ট দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা উচিত। আমরা এগুলোকে ‘প্রমোট’ করতে পারলে অনলাইন পেমেন্ট পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দিতে পারব।

বাংলা ট্রিবিউন: ই-কমার্স সাইট থেকে গ্রাহক আসলে কী চায়?

আশিকুল আলম খান: ই-কমার্স সাইট থেকে গ্রাহক চায়, সে যা দেখছে তা যেন পায়। পছন্দ না হলে সে এটা ফেরত দিতে পারবে। আরেকটা হচ্ছে সে তার ক্রয়কৃত পণ্যের ‘ডেলিভারি’ চায় দ্রুত। অনলাইন থেকে মানুষ কেনাকাটা করে মার্কেটে যাওয়ার ঝামেলা এড়ানোর জন্য। তাই অনলাইনে কেনার পর সে চটজলদি পণ্যটা হাতে পেতে চায়। এক্ষেত্রে আমরা ক্রেতাদের কনফিডেন্স বাড়ানোর জন্য বড় বড় কোম্পানিগুলোকে আমাদের সঙ্গে সংযুক্ত করছি। সাধারণত ক্রেতারা যখন দেখে একটি প্রতিষ্ঠিত পণ্যও সংশ্লিষ্ট সাইটে পাওয়া যাচ্ছে তখন তারা কনফিডেন্স পায়। এতে অন্য কোম্পানির পণ্যগুলোও ‘ট্রাই’ করার জন্য কেনে মানুষ।

বাংলা ট্রিবিউন: দেশের অনেক পণ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠান নিজেরাই ই-কমার্স চালু করছে। বিষয়টিকে আপনারা কিভাবে দেখছেন?

আশিকুল আলম খান: আগামীতে সব রিটেইল (খুচরা বিক্রি) অনলাইনে চলে আসবে। আমাদের এই খাতে প্রবৃদ্ধি অনেক ভালো। গত বছর থেকে এই বছরে ই-কমার্সের প্রবৃদ্ধির হার ৩০০ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধির কারণে আর বাংলাদেশের বিশাল মার্কেটের সুযোগের ফলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউন: ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) কোম্পানিগুলোর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে ই-কমার্সের প্রতি।

প্রিয়শপের প্রধান নির্বাহী

আশিকুল আলম খান: ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) সব জায়গাতেই আছে। তারা সাধারণত ‘রেডি বিজনেস’ নিয়ে কাজ করছে। একটি ব্যবসা চলছে। যদি তারা সেটার ভালো সম্ভাবনা দেখে তাহলে তারা বিনিয়োগ করতে রাজি হয়।  ই-কমার্সের ব্যাপক সম্ভাবনার কারণে এদিকেই ভিসিরা ঝুঁকছে। ভিসিকে আসতেই হবে, কারণ ই-কমার্সের ব্যবসার জন্য অনেক টাকা লাগে। এক লাখ, দুই লাখ টাকায় ই-কমার্স বিজনেস হয় না। এখানে অনেক বিনিয়োগ দরকার। এখানে ক্রেতা তৈরি করতে হবে, ক্রেতাকে পণ্য সম্পর্কে শেখাতে হবে, পণ্য আনতে হবে অনেক, এরপর ডেলিভারি। সবগুলোতেই আপনার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

আমি ঢাকার বাইরে ডেলিভারি করি। ডেলিভারি খরচ আমি নিই ৪০ টাকা। যেখানে আমার খরচ হয় ১২০ টাকা। বাকিটা আমি ভর্তুকি দিচ্ছি। এই ভর্তুকি দেওয়ার জন্য আমার বিনিয়োগ দরকার। আর আমি যদি ভালো পণ্য দিতে চাই, তার জন্য আমার সবচেয়ে ভালো সোর্স দরকার হবে। আর সেই সোর্স তৈরিতে বিনিয়োগ দরকার। ভোক্তাকে সচেতন করতে হলে বিভিন্ন প্রোগ্রাম করতে হবে, যারা জন্যেও আমাদের বিনিয়োগ দরকার। একজন বা কয়েকজন মিলে এটা শুরু করা যাবে। কিন্তু গ্রোথ স্টেজে গেলে এটার জন্য অবশ্যই বড় বিনিয়োগ দরকার হবে। অন্যথায় টিকে থাকা যাবে না।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রিয়শপ ডট কমের বিজনেস মডেলটা কি?

আশিকুল আলম খান: আমরা (প্রিয়শপ ডট কম) ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু করি। তখন ৬টার মতো কোম্পানি ছিলো। আমাদের মডেলটা ছিলো, আমাদের অনেক ভেন্ডর থাকবে যারা তাদের পণ্যগুলো আমাদের ওয়েবসাইটে দেবে। আমাদের ওয়্যারহাউসে পণ্য রাখবে। আর অর্ডার এলে  আমরা ক্রেতাকে ডেলিভারি দেব। এটাই হচ্ছে আমাদের বিজনেস মডেল। বাংলাদেশের ই-কমার্সে দুই ধরণের ব্যবসা কাজ করে। একটা হচ্ছে ভেন্ডর নিজেই পণ্য ডেলিভারি দেয়। আরেকটা হচ্ছে ওয়্যার হাউজভিত্তিক। আমরা ওয়্যার হাউজভিত্তিক।

বাংলাদেশে বর্তমানে ‘সিঙ্গেল’ ফ্যামিলির সংখ্যা বেশি। দেখা যায় যে, স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই চাকরি করছে। তাই বাসার প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো কেনার সময় কারোই থাকে না। অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমে বাসায় বা অফিসে বসে পণ্য ডেলিভারি নেয়ে নেওয়া যায়। এজন্য আমরা নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো বিক্রি করছি।

আশিকুল আলম খান

বাংলা ট্রিবিউন: সাধারণত গড়ে একজন ক্রেতা ই-কমার্স সাইট থেকে কত টাকার পণ্য কিনে থাকেন?

আশিকুল আলম খান: বাংলাদেশে সাধারণত ই-কমার্সের বাস্কেট সাইজ এক হাজার টাকার মতো। এই ঈদে আমরা দেখেছি তিন থেকে চার হাজার টাকার মতোও অর্ডার পড়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রিয়শপ ডট কমের ভবিষ্যত লক্ষ্য কি?

আশিকুল আলম খান: আমাদের টার্গেট হচ্ছে একই দিনে ডেলিভারি নিশ্চিত করা। আমরা একদিনেই গ্রাহকের দরজায় পৌঁছতে চাই। আমরা চাই যে টাইম-পেস ডেলিভারি আনতে। প্রতিদিন আমরা একই সময়ে আমাদের সব ডেলিভারি দিয়ে দেব। আমরা সারা বাংলাদেশেই ক্যাশ অন ডেলিভারি এনশিওর করতে চাই। আমাদের ক্রেতার অভিজ্ঞতায় বিনিয়োগ করার ইচ্ছা আছে। আমরা চাই ক্রেতারা সন্তুষ্ট থাকুক। একবার শপিং করলে যেন দ্বিতীয়বার শপিং করতে আসে। আমরা ওয়্যারহাউস ব্যবহার করছি যাতে আমরা কোয়ালিটি পণ্য ও সেবার মান নিশ্চিত করতে পারি। ওয়্যারহাউস করার জন্য আমাদের খরচ বাড়ছে, কিন্তু ক্রেতারা ঝামেলামুক্ত ভালো পণ্য পাচ্ছে।

অমরা যখন শুরু করেছিলাম, তখন কেউ আগ্রহী ছিলো না। শুরুর দিকে তরুণ উদ্যোক্তা যারা নিজেরা ডিজাইন করে পণ্য তৈরি করেছে তারাই আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আমরা এখন দেখছি এফএমসিজি (ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গ্রুপ)-সহ অন্য বড় বড় কোম্পানিগুলো ই-কমার্সের জন্য আলাদা অফিসার নিয়োগ করছে। যারা শুধু ই-কমার্স কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। এমনকি তারা এখন এই খাতে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে। ই কমার্স জনপ্রিয় হলে তো ‘মিডলম্যান কনসেপ্ট’ থাকবে না। তাহলে তারা আরও কমে পণ্য বিক্রি করতে পারবে।

বাংলা ট্রিবিউন: দেশে ই-কমার্সের চ্যালেঞ্জগুলো কী?

আশিকুল আলম খান: প্রথমত: সাইটে ক্রেতা পাওয়াই প্রথম চ্যালেঞ্জ। ক্রেতারা এখন এক জায়গায় থাকছে না। তাকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। আজ এখান থেকে তো কাল আরেক জায়গা থেকে শপিং করছে। দ্বিতীয়ত: সঠিক সময়ে ডেলিভারি করা। তৃতীয়: প্রোডাক্ট ফটোগ্রাফি। সাপোর্ট ইন্ডাস্ট্রি তেমন একটা নেই। চতুর্থত: কুরিয়ার সেবা। ঢাকার বাইরে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনও কুরিয়ার কোম্পানি আমাদের সেভাবে সাপোর্ট দিতে পারছে না।

বাংলা ট্রিবিউন:আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আশিকুল আলম খান: বাংলা ট্রিবিউনকেও অনেক ধন্যবাদ।

/এইচএএইচ/ 

আরও পড়তে পারেন: হোয়াটসঅ্যাপে নতুন ফন্ট দিয়ে চ্যাট করতে হলে

লাইভ

টপ