আইটির জগতে জীবন ইন্টারনেটের বাইরের মানুষকে ই-কমার্স সেবা দিতে চান ফাহিম মাশরুর

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ২১:৪৪, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৮, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৬

দেশের ই-কমার্স উদ্যোক্তারা যখন ইন্টারনেটের আওতায় থাকা মানুষগুলোকে ই-কমার্স সেবা দিচ্ছেন, তখন ফাহিম মাশরুর ‘নন-ইন্টারনেট পিপল’ তথা ইন্টারনেট সুবিধার বাইরের জনসাধারণকে ই-কমার্সের আওতায় আনতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন। এজেন্টদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে দিতে শুরু করেছেন ই-কমার্স সেবা।

ফাহিম মাশরুরযে সময়ে দেশে ইন্টারনেট জনপ্রিয় হয়নি, সে সময়ে তিনি ইন্টারনেটে চাকরির খবর প্রকাশ শুরু করেন। অনলাইনগুলোতে যখন ইংরেজিতে (যদিও কিছু সাইটে বাংলায় প্রকাশের ব্যবস্থা রয়েছে) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সরব উপস্থিতি, তখন তিনি বাংলা ভাষায় তৈরি করেন সম্পূর্ণ দেশীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম; ইন্টারনেটই হয়ে উঠেছে যার ব্যবসায়ের প্ল্যাটফর্ম। আইটির জগতে তার জীবনটা প্রযুক্তিময়।

ফাহিম মাশরুরের বাংলা ভাষার ‘আজকেরডিল’ (ajkerdeal) (http://www.ajkerdeal.com/) ই-কমার্স সাইটটি হলো মার্চেন্টভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের, যাকে ‘মার্কেট প্লেস’ও বলা যেতে পারে। ঢাকার বাইরে যেসব এলাকায় ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে, অথচ সেই এলাকার যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে না অথচ ই-কমার্সের সম্ভাব্য ক্রেতা, তাদেরকে এই সেবার আওতায় আনতে তিনিই চালু করেছেন এজেন্ট প্রথা। এই সেবার আওতায় সংশ্লিষ্ট এলাকার এজেন্টদের হাতে থাকবে একটা ট্যাব। ওই ট্যাব নিয়ে এজেন্ট সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে গিয়ে ট্যাবে পণ্য দেখাবেন। ক্রেতা পণ্য পছন্দ করলে এজেন্ট ওই ক্রেতার পণ্য ‘আজকের ডিল’-এ অর্ডার করবেন। পণ্য এজেন্টের কাছে পৌঁছালে তিনি ক্রেতাকে দিয়ে পণ্যের মূল্য সংগ্রহ করবেন।

ফাহিম মাশরুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই পদ্ধতি চালু করে আমি বেশ সাড়া পেয়েছি। সম্প্রতি, সারাদেশের এজেন্টদের নিয়ে একটি সভাও করেছি। সেই সভা থেকে উঠে এসেছে এজেন্ট পদ্ধতিতে ই-কমার্স সেবা চালুর সুবিধা, অসুবিধাগুলোও। সমস্যাগুলোর সমাধান করে এ পদ্ধতিটিকে আরও জনপ্রিয় করতে চাই।’ 

আজকের ডিলবেসরকারি সংস্থা ডি.নেটের তথ্যকল্যাণীকে এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে আলোচনা চলছে জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে সরকারও উদ্যোগ নিতে পারে জানিয়ে ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘সরকারের ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) এই উদ্যোগটি নিতে পারে।’

সারাক্ষণ প্রযুক্তি নিয়ে থাকলেও ‘আজকেরডিল’র কর্ণধার মাশরুর মনে করেন, একদিনে ৪/৫ ঘণ্টার বেশি ইন্টারনেটে বা প্রযুক্তির সংশ্লিষ্টতায় থাকা উচিত নয়। নিজে দিনের অনেকটা সময় অনলাইনে থাকেন বলেই তিনি বোঝেন একজন স্বাস্থ্যসচেতন সুস্থ মানুষের পক্ষে এর চেয়ে বেশি সময় অনলাইনে থাকা উচিত নয়।

এ বিষয়ে ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘আইটি নিয়ে কাজ করলে আইটির জগতে জীবনটাই আইটিকেন্দ্রিক হয়ে যায়। ফলে যা-ই করতে যাই না কেন, তাতে আইটি থাকবেই। এ কারণে আমার মনে হয়, প্রযুক্তি যেন কখনও জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে! যতক্ষণ আমি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো, ততক্ষণ এর থেকে উৎপাদনমুখী, সৃজনশীল কিছু করা সম্ভব।’

দেশের প্রথম চাকরির ওয়েব পোর্টাল ‘বিডিজবস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বিডিজবস শুরু করি ২০০০ সালে। সেই সময়ে বাংলাদেশে ইন্টারনেটকেন্দ্রিক যা কিছুই করি না কেন, তা ছিল নতুন। শুরুর দিকে ঢাকার কিছু মানুষ ডায়াল-আপ দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন। ব্রডব্যান্ড ছিল না। মোবাইল ইন্টারনেটও ছিল না। আমরা ভাবলাম, বাংলাদেশে ‘টু-ডে অর টুমরো’ ইন্টারনেট হবেই, তখন অনেক নতুন সেবা, ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি হবে। সে সময় দেশের বাজার ই-কমার্স বা ইন্টারনেটের জন্য প্রস্তুত ছিল না।’

বিডিজবসব্যবসা শুরুর দিকটার পরিস্থিতি উল্লেখ করে ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘আমরা জানার চেষ্টা করলাম দেশে ইন্টারনেট কারা বেশি ব্যবহার করেন। দেখলাম, তরুণ প্রজন্মের বেশি আগ্রহ ইন্টারনেট নিয়ে। তখন তরুণদের ইন্টারনেট চাহিদা বিবেচনা করে আমরা দেখলাম চাকরি খোঁজা তাদের অন্যতম বড় ডিমান্ড (চাহিদা)। চাকরি খোঁজা আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য একটা বড় সমস্যা। তখন আমাদের মাথায় এলো ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান বের করা।’

ইন্টারনেটকেন্দ্রিক চিন্তার ফাহিম মাশরুর ইন্টারনেট দিয়েই বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলার স্বপ্ন দেখতেন। ইন্টারনেটকে ব্যবহার করে সেবা দেওয়ার চিন্তা থেকেই তিনি ইন্টারনেটকে পণ্য তথা ইন্টারনেট সেবাপণ্য ‘বিডিজবস’ তৈরি করেন। তিনি বলেন, ‘শুরুর দিকে কেউ টাকা দিয়ে চাকরির খবর নেবে বা পয়সা খরচ করে সাইটে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রার্থী খুঁজবেন, এমন সংস্কৃতির সঙ্গে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম না। আস্তে আস্তে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। আমদের মডেলটা ছিল এখানে পেমেন্ট করবে মূলত যারা চাকরি দেবেন তারা। শুরুর দিকে যেহেতু মার্কেটে খুব পরিচিত ছিলাম না, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীও কম ছিলেন, সে কারণে আমরা প্ল্যান করলাম পত্রিকায় যত ধরনের চাকরির বিজ্ঞপ্তি আছে, সেগুলো সংগ্রহ করে সাইটে আপ করা। তখন পত্রিকার সংখ্যা অবশ্য কম ছিল। আমরা সব পত্রিকা থেকে চাকরির খবর বিডিজবসে প্রকাশ করতে লাগলাম। এভাবেই দাঁড়িয়ে গেল ‘বিডিজবস’।

প্রযুক্তি নিয়ে থাকলেও ফাহিম মাশরুর এখনও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া, গল্প করা, খেতে যাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান। তিনি বলেন, ‘এসব করলে চিন্তার দুয়ার খোলে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো উচিত।’

‘এই প্রযুক্তিই আবার মানুষের খারাপ করছে’ উল্লেখ করে আজকের ডিলের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘একজন মানুষের যে ব্যক্তিত্ব রয়েছে বা স্বতন্ত্র ইমেজ আছে, তিনি যে চিন্তা করতে পারেন, তা ফেসবুকের কারণে মানুষ ভুলে যাচ্ছে। আগে আমরা বই পড়তাম। এখন দেখা যায়, ফেসবুকে আমার বন্ধু কিছু পড়ে লাইক দিলো, সেটা আমার ফিডে চলে এলো। আমি অন্যকিছু না পড়ে বন্ধুর পড়াটা আমিও পড়লাম, কোনও কষ্ট না করে। আমি নিজে পছন্দ করে যে পড়তে পারি, সেটা করছি না। আমরা কোনও কিছু না পারলে, কোনও ধরনের চেষ্টা না করেই গুগলে সার্চ করছি। ফলে কী হচ্ছে, আমাদের ভাবনা, চিন্তার জগতটা বড় হচ্ছে না। ছোট হয়ে যাচ্ছে বা কমে যাচ্ছে। এসব হতে দেওয়া ঠিক নয়।’ 

বেশতো

ফাহিম মাশরুর চালু করেছেন বেশতোডটকম (http://www.beshto.com/) নামের একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সাইটটি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ বাংলায় একটা সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট তৈরি করা এবং বাংলায় লোকাল ইনফরমেশন সোর্সকে (স্থানীয় কনটেন্ট) সমৃদ্ধ করা। “বেশতো” এমন একটা সাইট হবে, যেখানে বাংলায় সব তথ্য পাওয়া যাবে। কিছুটা উইকিপিডিয়া টাইপের। “বেশতো” যারা ব্যবহার করেন, তারাই কনটেন্ট কন্ট্রিবিউট করেন। এটা একটা ক্রাউড সোর্স এবং একই সঙ্গে সোস্যাল মিডিয়াও।
“বেশতো”তে সব কনটেন্ট সার্চ করা যায় এবং সব কনটেন্ট পাবলিক। ফেসবুকে কেউ কিছু পোস্ট করলে তার বন্ধুরা সেটা দেখতে পারেন। সার্চ করতে পারেন। কিন্তু “বেশতো” একটা পাবলিক প্ল্যাটফর্ম। এখানে যে পোস্টই দেওয়া হোক না কেন যে কেউই তা বিশ্বের যেকোনও জায়গা থেকে সার্চ করতে পারেন। এখানে রয়েছে প্রশ্ন-উত্তরের ব্যবস্থাও। যাদের আইডি আছে, তারাই এখানে প্রশ্ন করবেন; আবার তারাই উত্তর দেবেন।’

/এইচএএইচ/এবি/

আরও পড়ুন: ই-কমার্স সেবার চমক 

 

লাইভ

টপ