ইন্টারনেটের দাম কত হওয়া উচিত?

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ১৫:১৯, মার্চ ১৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৬, মার্চ ১৪, ২০১৭

ইন্টারনেট সেবা

ইন্টারনেটের দাম নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মত আছে। এ সেবা পণ্যর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পক্ষ এর দরদাম নিয়ে কথা বললেও দাম কত হওয়া উচিত-সে বিষয়ে কেউই সমঝোতায় আসতে পারেননি। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, মোবাইলফোন অপারেটর, ব্রডব্যান্ড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন ভিন্ন দামে ইন্টারনেট বিক্রি করে। ফলে ভোগান্তি গ্রাহকদের। তাদের মতে, দেশে ইন্টারনেটের দাম বেশি।

সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য, তারা ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়েছে। সমালোচকরা বলছেন,  ব্যান্ডউইথের এর দামের সঙ্গে ইন্টারনেটের দাম কমার সম্পর্ক খুবই কম। কারণ ব্যান্ডউইথ কিনতে তাদের যে টাকা খরচ হয় তা ইন্টারনেট সেবাদানের মোট খরচের মাত্র ৫-৮ শতাংশ। ফলে ব্যান্ডউইথ ফ্রি করে দিলেও তা ইন্টারনেটের দামের ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলবে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ব্যান্ডউইথ এবং এর পরিবহনের (ট্রান্সমিশন) সঙ্গে যেসব পক্ষ জড়িত সেসব পক্ষ যদি তাদের সেবার দাম না কমায়, মার্জিন কম না রাখে, তাহলে ব্যান্ডউইডথ ফ্রি করে দিলেও ইন্টারনেট ব্যবহার খরচ কমবে না।’

ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ আমদানি করতে অন্তত ১৬টি পক্ষ জড়িত থাকে। এদের মধ্যে রয়েছে- ইন্টারনেট ট্রানজিট (আইপি ক্লাউড), বিদেশি ডাটা সেন্টারের ভাড়া, দেশি-বিদেশি ব্যাকহল চার্জ, ল্যান্ডিং স্টেশন ভাড়া, কেন্দ্রীয় সার্ভারের পরিবহন খরচ, গেটওয়ে ভাড়া, আইএসপি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা, এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ভাড়া, ইন্টারনেট যন্ত্রাংশের ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ধার্য করা ভ্যাট ও শুল্ক, বিটিআরসির রাজস্ব ভাগাভাগি ইত্যাদি।

শুধু ব্যান্ডউইথ নয়, এসব পক্ষগুলোর সেবাচার্জ আনুপাতিক হারে কমালেই কেবল ইন্টারনেটের দাম বর্তমানের চেয়ে আরও কমানো সম্ভব বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, শিগগিরই ইন্টারনেটের দাম কমানো হবে।

গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম জানান,  ‘গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের মূল্য কমিয়ে সাধারণ জনগণের নাগালে নিয়ে আসাই আমার লক্ষ্য। শিগগিরই আমরা ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমাতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবো।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ২০১৫ সালে একটি অনুষ্ঠানে জানান, ‘ইন্টারনেটের দাম সরকার বেঁধে দেবে। কিন্তু এখনও দাম বাঁধা হয়নি। দেশে মোবাইলফোনের ভয়েস কলের উচ্চসীমা ও নিম্নসীমা বেঁধে দেওয়া হলেও ইন্টারনেটের দাম কখনও বিটিআরসি বেঁধে দেয়নি। দাম বেঁধে দিলে গ্রাহকরা কম দামে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন।’

২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ইন্টারনেটের দাম সহনীয় পর্যায়ে’ আনতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। দুই বছর পার হয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি হয়নি।

সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা ইন্টারনেটের ‘কস্ট মডেলিং’-এর উদ্যোগ নিয়েছি। শিগগিরই এ বিষয়ে একজন পরামর্শক নিয়োগ করা হবে। পরামর্শকের কাজ হবে, বাস্তবতার আলোকে ইন্টারনেটের যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করা।’ এ বিষয়েও কোনও অগ্রগগির খবর পাওয়া যায়নি। 

ব্যান্ডউইথের দাম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০০৭ সালে প্রতি মেগা ব্যান্ডউইথ বিক্রি হতো ৭২ হাজার টাকায়, ২০০৯ সালে ১২ হাজার টাকা, ২০১১ সালে ১০ হাজার টাকা, ২০১২ সালে ৮ হাজার টাকা এবং বর্তমানে ৬২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত ১০ বছরে প্রতি মেগা ব্যান্ডইউথে দাম কমেছে ৭১ হাজার ৩৭৫ টাকা। সেই তুলনায় ইন্টারনেটের দাম কত কমেছে। আর এখন ইন্টারনেটের দাম কত হওয়া উচিত?

এ বিষয়ে শ্রীলঙ্কা ভিত্তিক টেলিযোগাযোগ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র ফেলো আবু সায়ীদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাজারই ঠিক করে দেবে ইন্টারনেটের দাম কত হওয়া উচিত। সরকার বা অন্য কেউ এটা ঠিক করে দিতে পারে না। প্রতিযোগিতাই এখানে চূড়ান্ত নির্ধারক, মূল খেলোয়াড়।’

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও রোবটিকস এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম বিশেষজ্ঞ রোকন-উজ-জামান বলেন, ‘সার্বিক বিবেচনায় প্রতি জিবি (গিগাবাইট) ইন্টারনেটের দাম ৫ টাকায় নেমে আসা উচিত বা ৫ টাকা হওয়া উচিত।’

এদিকে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থাতে একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে। প্রস্তাবিত ইন্টারনেটের মূল্যসীমা কার্যকর হলে ঢাকায় ইন্টারনেটের দাম না কমলেও গতি বাড়বে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও কমবে। ঢাকায় বর্তমানের চেয়ে গতি দ্বিগুণের বেশি বাড়তে পারে। আর ঢাকার বাইরে বর্তমানের অর্ধেক দামে মিলতে পারে ইন্টারনেট।

আইএসপিএবির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) ও এনটিটিএনগুলোর ব্যান্ডউইথ, পরিবহন ও সেবাচার্জে সিলিং করে না দিলে গ্রাহকপর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমানো যাবে না। এ কারণে সংগঠনটি তাদের প্রস্তাবনায় আইআইজি ও এনটিটিএন-এর চার্জের ওপর সিলিং করার প্রস্তাব দিয়েছে।

জানতে চাইলে সংগঠনটির সভাপতি আমিনুল হাকিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঢাকায় ইন্টারনেটের যা দাম হওয়া উচিত তার চেয়ে কমই আছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ঢাকার বাইরে ইন্টারনেটের দাম বেশ চড়া। কারণ, ট্রান্সমিশন চার্জ (ব্যান্ডউইথের পরিবহন খরচ) বেশি। তাই শুধু ট্রান্সমিশন খরচ কমানো গেলেই ইন্টারনেটের দাম কমানো সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখনই যদি ট্রান্সমিশন চার্জ ৫০ শতাংশ কমানো হয় তাহলে ইন্টারনেটের দাম ২০/২৫ ভাগ কমানো সম্ভব হবে। তবে দাম ৫০ ভাগ কমানো সম্ভব হবে না কারণ ইন্টারনেট সেবাদানের সঙ্গে অনেকগুলো পক্ষ (ওপরে উল্লেখিত ১৬টি পক্ষ) জড়িত। সব পক্ষ যদি সেবাচার্জ আনুপাতিক হারে কমায় তাহলে ঢাকা কেন, সারাদেশেই কম খরচে ইন্টারনেট সেবা দেওয়া সম্ভব।’

আমিনুল হাকিম বলেন, ‘আমরা ব্যান্ডউইথ কিনতেই মোট ব্যযের ৫/৮ ভাগ খরচ হয়। এছাড়া অফিস ভাড়া, কর্মীদের বেতনসহ বিভিন্ন ধরনের খরচ এতে যুক্ত হয়। ফলে ব্যান্ডউইথের দাম কমা মানেই কিন্তু ইন্টারনেটের দাম কমা নয়।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা (আইএসপিগুলো) বর্তমানে ১ মেগা গতির ইন্টারনেট বিক্রি করছি গড়ে ৫০০/৬০০ টাকায়। আর মোবাইলফোন অপারেটরগুলো ডাটা ক্যাপিং (ব্যবহারের সীমা বেঁধে দিয়ে) করে ব্যান্ডউইথ বিক্রি করে। আইএসপিগুলোর সঙ্গে মোবাইল অপারেটরগুলোর বাসাবাড়ির ইন্টারনেট সেবা বিক্রির অনুপাত ১:৫০ হলেও করপোরেট পর্যায়ে ১:১। আমরা ১০০ মেগাকে ৫০০ মেগা করে বিক্রি করলেও অপারেটররা ১ মেগাকে ৫০০ মেগা করে বিক্রি করে। এই অসম প্রতিযোগিতার কারণে গ্রাহকরা উন্নত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।’

জানা গেছে, মোবাইলফোন অপারেটরগুলো এক গিগা ডাটা বিক্রি করে (৭ দিনের প্যাকেজ) ৮৯/৯৪ টাকায়। একই পরিমাণ ডাটা (২৮ দিনের প্যাকেজ) বিক্রি করে ৩১৯/৩৫০ টাকায়। কোনও কোনও অপারেটর ২ গিগা ডাটা বিক্রি করে থাকে ১২৯ টাকায়। ফলে ইন্টারনেটের দাম কত হওয়া উচিত তা নিয়ন্ত্রক সংস্থারও জানা নেই!

 /এসএনএইচ/টিএন/

লাইভ

টপ