বিশ্বের তরুণদের জন্য বাংলাদেশি ‍দুই তরুণের ‘ইয়ুথ অপুরচুনিটিস’

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ২০:৫৫, জুন ১৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৬, জুন ১৯, ২০১৭

ইয়ুথ অপুরচুনিটিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন নূর (বায়ে) ও মাকুসুদুল মানিক (ডানে)ইয়ুথ অপুরচুনিটিস (ওয়াইও) হলো বাংলাদেশ দুই তরুণ ওসামা বিন নূর ও মাকসুদুল মানিক –এর তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম (ওয়েবসাইট) যা ব্যবহার করেন বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশের তরুণরা। তুমুল জনপ্রিয় এই সাইটে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের সুযোগ, বৃত্তি, সম্মেলন ইত্যাদির খবর পাওয়া যায়। অথচ এই প্ল্যাটফর্মটির জন্ম কোনও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস কক্ষে নয়। এর প্রতিষ্ঠাতারা এটি গড়ে তোলার জন্য কাজ করেছেন নিজের ঘরে বসে। মিটিং করেছেন পার্কে বসে, কখনও বন্ধুর বাড়ির ছাদে বসে, এমনকি বন্ধুর অফিসে বসেও তারা জরুরি কাজ সেরেছেন।

কাজ করার জন্য অফিস নেই এটা কোনও অজুহাত হতে পারে না। কাজের প্রতি যদি শতভাগ ‘ডেডিকেশন’ থাকে তাহলে যে কোনও জায়গায় বসে কাজ করা যায়।

বাংলা ট্রিবিউন: ইয়ুথ অপরচুনিটিস আসলে কী?

ওসামা বিন নূর ও মাকসুদুল মানিক: তরুণদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে তথ্য খুব সহজে পাওয়া যায় না। ইয়ুথ অপরচুনিটিসি সেই সমস্যাটির সমাধান করতে সুযোগ সন্ধানী ও সুযোগ দাতাদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। যেমন, স্কলারশিপ, ইন্টার্নশিপ, সেমিনার, কনফারেন্স ইত্যাদির সুযোগগুলো খুঁজে একটি প্ল্যাটফর্মে দেওয়া।

বাংলা ট্রিবিউন: ইয়ুথ অপরচুনিটিসের শুরুটা কিভাবে?

ওসামা বিন নূর ও মাকসুদুল মানিক: ২০১২ সালে আমরা ফেসবুক পাতার মাধ্যমে কিছু সুযোগের তথ্য দিতে শুরু করি। যেমন এখানে এই কনফারেন্স হচ্ছে, এই ইন্টার্নশিপের সুযোগ আছে। তখন দেখতাম আমাদের পোস্ট অনেক মানুষ শেয়ার করতো। প্রতিদিন আমাদের পেজে নতুন করে শত শত মানুষ যুক্ত হত। আমরা বুঝতে পারলাম এটার একটা বড় চাহিদা আছে। এরপর ২০১৪ সালে ওয়েবসাইট চালু করি। ওয়েবসাইট চালু হওয়ার প্রথম দিনেই আমাদের ওয়াবসাইট বন্ধ হয়ে যায় অতিরিক্ত ট্রাফিকের কারণে। এতো মানুষ ভিজিট করছিলেন সেদিন! ওই সময়ে আমাদের মন খারাপ হয়েছিলো, আবার খুশিও হয়েছিলো। মন খারাপ হয়েছিলো এই কারণে যে, ওয়েবসাইটটি বন্ধ হয়ে গেছে। ভালো লাগার কারণ ছিল, আমরা যে কাজটি করছি সেটি সঠিক কাজ। পরে আমরা এই লক্ষ্যে কাজ করতে আরও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই এবং একটা সার্ভার কিনি।

দেখুন তরুণদের অনেক যোগ্যতা আছে, তারা কেবল সেটি দেখানোর ফ্ল্যাটফর্ম পায় না। একটা ইন্টার্নশিপ, সেমিনার বা কনফারেন্স একজন তরুণের জীবন পরিবর্তন করে দিতে পারে। আর সেই তথ্যটিই আমরা দিয়ে থাকি। এটা তরুণরা কী পরিমাণে চায় সেটা বুঝতে পারি আমাদের সাইটের ভিজিটর দেখে। প্রতি মাসে আমাদের সাইটে বিভিন্ন সুযোগের খবর ১৩ লাখ বারের মতো দেখা হয়।

বাংলা ট্রিবিউন: এটাকে স্টার্টআপ করার পরিকল্পনা কখন করলেন? বিজনেস মডেলটাই বা কী ছিল?

ওসামা বিন নূর ও মাকসুদুল মানিক: আমরা যখন শুরু করি তখন আমরা আমাদের আশপাশের মানুষকে সহযোগিতা করার লক্ষ্যে শুরু করি। পরে যখন এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারি তখন চিন্তা করি, এটাকে নিয়ে যদি আমরা কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই তাহলে এটিকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। সেই মোটিভেশন থেকে আমরা ইয়ুথ অপরচুনিটিসকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিই। প্রতিনিয়ত আমরা আরও বেশি ‘রিসোর্সফুল’ করার চেষ্টা করছি। এখনও আমরা যে দাঁড়িয়ে গেছি এটা বলবো না, আমরা চেষ্টা করছি আরও উন্নয়ন করার। এতোদিন আমরা কিছুটা ফ্রিল্যান্সিং ভাবে ও পদ্ধতিতে কাজ করেছি। এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছি। সরকারের সঙ্গেও কাজ করার চেষ্টা করছি। বিদেশের সঙ্গে কাজের চেষ্টা করছি। নতুন নতুন মানুষকে যুক্ত করছি। তারা এতে নিজেদের অবদান রাখছে।

এখন পর্যন্ত আমরা আমাদের ভিজিটরদের কিভাবে আরও ভালো সেবা দেওয়া যায় সেই চেষ্টায় আছি। আমাদের ওয়েবসাইট যারা ব্যবহার করেন তারা যাতে আমাদের ওপর বিশ্বাসটা রাখতে পারেন। তবে এখনও আমরা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। এরপর চিন্তা করব কিভাবে আমরা প্রিমিয়াম সেবাগুলো দিতে পারি।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রাথমিক বিনিয়োগ কিভাবে পেলেন?

ওসামা বিন নূর ও মাকসুদুল মানিক: আমাদের বিনিয়োগটা এসেছে একেবারে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে। আমরা নিজেরা টাকা দিয়েছি ধার করেছি। ওয়েবসাইট যে বানিয়ে দিয়েছে সে নিজের পকেটের টাকা দিয়ে বানিয়ে দিয়েছে। আমরা পরে তাকে টাকা দিয়েছি। এখনও দিচ্ছি। এখন আমরা যেহেতু বড় হচ্ছি, এখন আমাদের কাছে আরও বড় সহায়তা আসছে।

শুরুটা আমরা দুজন মিলেই করি। আমরা দুজন এখনও স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছি। আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন ১২ জন, যাদের বেশিরভাগই স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। আসলে আমরা এখনও গবেষণা করছি, বাংলাদেশের ভিজিটরদের কাছে কিভাবে পৌঁছনো যায়। আমাদের সাইটে বাংলাদেশ থেকে বিদেশের ভিজিটর অনেক বেশি। আমরা কাজ করছি বাংলাদেশে কিভাবে আমাদের সেবাগুলো সম্পর্কে মানুষের কাছে আরও বেশি বেশি করে পৌঁছনো যায়।

দুই সহ-প্রতিষ্ঠাতা বলছেন তাদের স্বপ্নের কথা

বাংলা ট্রিবিউন: আমাদের জানা আছে যে, আপনাদের অফিস নেই। অন্যদের অফিস শেয়ার করে কাজ করেন। সম্প্রতি সেই কষ্টের অবসান হয়ছে।

ওসামা বিন নূর ও মাকসুদুল মানিক: অফিসের কথা বলতে গেলে শুরুর সাড়ে পাঁচ বছর আমরা পার্কে বসে, বন্ধুর অফিসে বসে, বাসার ছাদে বসে কাজ করেছি। অতিসম্প্রতি পলক ভাই (আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক) আমাদের এই অফিসটি (কাওরান বাজারের জনতা টাওয়ার সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে) দেন। এটা আমাদের জন্য একটা শিক্ষা ছিলো যে, কাজ করার জন্য অফিস নেই এটা কোনও অজুহাত হতে পারে না। কাজের প্রতি যদি শতভাগ ‘ডেডিকেশন’ থাকে তাহলে যে কোনও জায়গায় বসে কাজ করা যায়। এখন আমরা একটা অফিসের স্পেস শেয়ার করছি।

আমাদের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনটা সরকার করে দিয়েছে, অফিস স্পেসটাও দিয়েছে। আমরা আরও চেষ্টা করছি সরকারের সঙ্গে কোনও কাজ করা যায় কিনা সেসব নিয়ে। ইয়ুথ অপুরচুনিটিসকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া যায় কিনা তা নিয়ে আমরা ভাবছি। এখনও এসব আলোচনার মধ্যেই আছে। ইন্টার্নশিপ, কাজের স্বীকৃতি, সেমিনার, কনফারেন্সসহ আরও অনেক বিষয়ের খবর ও তথ্য পেতে চাইলে ইউথ অপুরচুনিটিসে আসুন।

আরেকটি ফ্ল্যাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা করছি যেটা বিভিন্ন ‘কিভাবে’র জবাব দেবে। যেমন কিভাবে আমি স্কলারশিপের জন্য আবেদন করবো, কিভাবে ‘কনফারেন্সে অ্যাটেন্ড’ করতে হয়- এটা এই মাসের মধ্যেই চলে আসবে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাদের আগামী দিনের পরিকল্পনা কী?

ওসামা বিন নূর ও মাকসুদুল মানিক: ইয়ুথ অপরচুনিটিস বাংলাদেশ নামে একটি সাইট নিয়ে আমরা কাজ করছি। কারণ বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ যেসব সুযোগ আছে সেগুলো আমাদের মেইন সাইটে তুলতে পারি না। কারণ গ্লোবাল পারসপেক্টিভে সেটি প্রাসঙ্গিক নয়। এই তথ্যগুলো দেশের সুযোগ সন্ধানী তথা তথ্য অনুসন্ধানীদের কাছে পৌঁছে দিতে এই সাইটটি করছি। আরেকটি ফ্ল্যাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা করছি যেটা বিভিন্ন ‘কিভাবে’র জবাব দেবে। যেমন কিভাবে আমি স্কলারশিপের জন্য আবেদন করবো, কিভাবে ‘কনফারেন্সে অ্যাটেন্ড’ করতে হয়- এটা এই মাসের মধ্যেই চলে আসবে।

বাংলা ট্রিবিউন: এরই মধ্যে আপনারা কিছু স্বীকৃতিও পেয়েছেন। এগিয়ে যাওয়ার জন্য এসব কিভাবে সাহায্য করছে?

ওসামা বিন নূর ও মাকসুদুল মানিক: ফোর্বস ম্যাগাজিনের একটি পুরস্কার পেয়েছিলো ওসামা, নিয়েছিল ব্রিটেনের রানীর কাজ থেকে। ব্র্যাক মন্থনের ২০১৬ (ঢাকা ও সাউথ এশিয়ার পুরস্কার), সম্প্রতি ন্যাশনাল মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছিলাম আইসিটি বিভাগ থেকে। এই পুরস্কার আমাদের কাজের একটি মোটিভেশনও। আমরা যে সঠিক কাজটি করছি তার একটা ইঙ্গিত এসব স্বীকৃতিতে পাওয়া যায়। তবে আমরা যখন শুরু করি তখন কেবল কাজের প্রতি ডিডিকেটেড ছিলাম। স্বীকৃতির কথা চিন্তা করিনি। যেসব স্বীকৃতি এখন পাচ্ছি সেগুলোর কথা আমরা স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। আমরা এই কাজ শুরু করি ২০১২ সালে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত কেউ জানতোও না যে এই ওয়েবসাইটটি বাংলাদেশের কেউ চালায়। এমনও হয়েছে আমাদের অনেক বন্ধু আমাদের বলেছে যে এই ওয়েবসাইটটি দেখিস, ভালো ওয়েবসাইট। আমরা কিছু বলিনি। আমরা কাজকে ফোকাস করে গেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ।

ওসামা বিন নূর ও মাকসুদুল মানিক:  ধন্যবাদ বাংলা ট্রিবিউনকেও।

শ্রুতি লিখন: এম এম রহমান

/এইচএএইচ/

 

লাইভ

টপ